ধর্ষণ শব্দটি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এটি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ষণ কি নতুন কিছু? না, এটি অনেক পুরোনো সামাজিক ব্যাধি। কিন্তু এখনকার ধর্ষণের ধরন, সংখ্যা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি একে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
একটা মেয়ের কাছে সব থেকে নিরাপদ জায়গায় কোথায়? নিঃসন্দেহে উত্তর হবে তার বাবা। কিন্তু আপনি জানেন কি মেয়ে আজ বাবার কাছেও নিরাপদ নয়! চট্টগ্রামে নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করে ধরা পড়লেন বাবা প্রদীপ বণিক।
কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা যা শুনেই গা শিউরে ওঠে। আট বছরের শিশুকে ধর্ষণ, ভাইয়ের হাতে বোন ধর্ষণ, শিক্ষকের হাতে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থী ধর্ষণ। এমন হাজারো ঘটনা ঘটে, যা খবরের কাগজেও আসে না।
শিশু ধর্ষণের চিত্র ও পরিসংখ্যান:
বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলুন কিছু পরিসংখ্যান দেখি: গত পাঁচ বছরে (২০২০-২০২৪) অন্তত ৬,৩০৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩,৪৭১ জন ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। ২০২১ সালে ৭৭৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৩১% বেশি। ২০২১ সালে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণের পরে হত্যা, অপহরণসহ বিভিন্ন কারণে অন্তত ৫৯৬ শিশু নিহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের ভয়াবহ বাস্তবতা:
বাংলাদেশে ধর্ষণের পরিসংখ্যান সত্যিই উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে প্রায় ২,০০০ ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৭০% ভুক্তভোগী ছিল শিশু ও কিশোরী। ২০২২ সালে শিশু ধর্ষণের হার ৩১% বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার শিশুরা মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে। এছাড়াও সাইবার ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে, যেখানে অপরাধীরা পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে শিকারদের ভয়ভীতি দেখায়।
এই ভয়ানক পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো অনলাইনে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। বাংলাদেশে পর্ন সাইট বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, ভিপিএন বা অন্য উপায়ে মানুষ এগুলো দেখছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম।
পর্নোগ্রাফির ভয়াবহতা: যৌন অপরাধের সূতিকাগার
একসময় পর্নোগ্রাফি ছিল নিষিদ্ধ ও সীমিত পরিসরের একটি বিষয়। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এটি এখন সবার হাতের মুঠোয়। মাত্র এক ক্লিকেই কিশোর থেকে যুবক—সবাই প্রবেশ করতে পারে এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়স থেকেই যারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়, তারা পরবর্তীতে বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা দেখায়। এটি তাদের বাস্তব জীবনের চিন্তা ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার চূড়ান্ত রূপ হতে পারে ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতা।
সন্তুষ্টি না পাওয়া ও বিকৃত মানসিকতা: সাধারণ পর্ন কন্টেন্টে অভ্যস্ত হওয়ার পর অনেকেই আরও চরম কিছু দেখতে চায়। ধীরে ধীরে তারা শিশু পর্নোগ্রাফি, ধর্ষণ বা নির্যাতনমূলক পর্নের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যা সমাজে শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের জন্ম দেয়।
সমাধান কী?
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ: সরকারকে কঠোরভাবে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং অবৈধ সাইটগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা বৃদ্ধি: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে যৌন শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তরুণরা বিকৃত মানসিকতা থেকে দূরে থাকে। সাইবার অপরাধ দমন: পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল ও শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি ও ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্ষণের দ্রুত বিচার: ধর্ষণের সাজা দ্রুত কার্যকর করতে হবে, যাতে অপরাধীরা শাস্তির ভয়ে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। সচেতনতা বৃদ্ধি: সমাজকে বুঝতে হবে যে ধর্ষণের পেছনে অন্যতম কারণ পর্নোগ্রাফির ভয়াল ছায়া। সামাজিকভাবে এটি রোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বন্ধ করতে হলে আমাদের পর্নোগ্রাফির ভয়াল দিককে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এটি শুধু একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি এক ধরনের মানসিক মাদক, যা মানুষকে বিকৃত করে তুলতে পারে। তাই, ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে, পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই ভয়াল ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, আমাদের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হবে।





















