তিস্তার নদীর হারানো যৌবন ফিরে আনতে এবং ভারতের আগ্রাসনের কবল থেকে রংপুর
অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার উৎস তিস্তা নদীকে তার চিরচেনা রূপে ফিরে আনা ও নদীতে পাল
তোলা নৌকায় মাঝি ভাটিয়ালী গান এবং জীববৈচিত্র রক্ষা করতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন
করা জরুরি। ভারতের নদী আগ্রাসনে পানির অভাবে ধু ধু বালু চরে পরিণত হয়েছে সর্বগ্রাসী
খরস্রোতা তিস্তা। এতে করে তিস্তা তীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
পানির অভাবে ইতোমধ্যে লালমনিরহাট,কুড়িগ্রাম,নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর,দিনাজপুর,পঞ্চগড় ও
ঠাকুরগাঁও জেলা মরুভূমি হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। থমকে গেছে মাঝি-মাল্লার কর্ম
ব্যস্ততা। তিস্তার উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় তিস্তার এমন
দুরাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তা নদীতে পানি না থাকায় নদীর উপর নির্ভরশীল কয়েক লক্ষ মৎস্যজীবী ও
মাঝি কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দিন যতই যাচ্ছে ততই পরিস্থিতি খারাপের দিকে
যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনতিবিলম্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন নদী
বিশেষজ্ঞ ও তিস্তা পারের মানুষ। একসময় তিস্তায় ভরা যৌবন ছিল। সারা বছরই স্থানীয় জেলেরা মাছ
ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। শুধু তিস্তা নয়, উত্তরাঞ্চলের ছোট বড় অন্তত ১৬ থেকে
১৭টি নদী ছিল পানিতে ভরপুর। পানিতে টইটম্বুর ছিল এই অঞ্চলের খাল-বিল। রংপুর অঞ্চলের হাজার
হাজার জেলে এসব খাল ও বিলে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবন-যাপন করত। এখন নদীতে পানি নেই, খাল-
বিলেও পানি নেই। অনেক নদীর অস্তিত্বও নেই। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে এসব নদী। ফলে বেকার
হয়ে পড়েছে অসংখ্য জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের কেউ পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে
গেছে। কেউবা পূর্বের পেশাকেই আঁকড়ে ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভারতের সিকিম ও
পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর লালমনিহাট কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ
করেছে সর্বগ্রাসী এই তিস্তা নদী। যা লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম
জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫
কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার।প্রতিবেশী দেশ ভারত তিস্তার
১০০কিলোমিটার উজানে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে।
যার ব্যাপক প্রভাব পড়ছে আমাদের দেশের উত্তর জনপদের ৬টি জেলায়। ভারত তার নিজেদের চাহিদা
মিটিয়ে তারপর বাংলাদেশকে পানি দিচ্ছে। বর্ষাকালে ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশে
বন্যা হয়। পক্ষান্তরে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় আমাদের দেশে চাহিদা অনুযায়ী
পানি মেলে না। এভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত। তিস্তার
পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হলেও সুফল মেলেনি। তিস্তা নদীর করুণ দশার
জন্য দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকা পানি চুক্তিকে দায়ী করেছে সাধারণ মানুষ। ভারতের পানি প্রত্যাহারের
ফলে সমগ্র তিস্তা এবং তার শাখা-প্রশাখা খাল, বিলগুলো এবং জলাশয়গুলো শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত
হয়েছে। তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি কপাট এখন বন্ধ। ব্যারেজের উজানে যতটুকু পানি মিলছে তার
বেশিরভাগই সেচ কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ব্যারেজের ভাটি এলাকায় এখন পানি নেই। ফলে ভাটি
এলাকা এক প্রকার মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। গোটা নদীর বুকে শোভা পাচ্ছে ধু ধু বালুচর।
এসব চরে মানুষ কিছু রবিশস্য চাষ করলেও সেগুলোতেও পানির অভাবে ভালো ফলন পাচ্ছে না। তিস্তা
তীরবর্তী এলাকার মানুষ বলেন, আগে নদীতে সারা বছরই পানি থাকত, আমরা মাছ ধরতাম, ভালোভাবে
খেতে-চলতে পারতাম। হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরতো এ নদীতে। মানুষ পারাপার করে অনেক মাঝি
জীবিকা নির্বাহ করত। এখন নদীতে পানি নেই, মাছও নেই। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা
যায়, কৃষি কাজের জন্য পানি সরাতে তিস্তা ব্যারেজ এর উজানে আরো দুটি খাল খননের উদ্দেশ্যে
প্রায় ১ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে কাজ শুরু করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এ প্রকল্প
বাস্তবায়ন হলে ভারতের জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলায় অধিক কৃষি জমি সেচের আওতায়
আসবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি আরও বেশি করে প্রত্যাহার
করবে। এতে করে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানি কতটুকু থাকবে তা সহজেই অনুমেয়। কারণ শুস্ক
মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে ৮ জেলায় এমনিতেই তিস্তা নদীতে পানি থাকে না। ভারতের এ প্রকল্পের কারণে
তিস্তায় পানি সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মরুভূমিতে
পরিণত হবে। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটে জীববৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গ সেচ বিভাগের
পরিকল্পনা অনুযায়ী তিস্তা থেকে পানি নিতে কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত ৩২
কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন ও তিস্তার বাম তীরে ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পৃথক অন্য ১টি খাল খনন
করা হচ্ছে। এ দু’টি খাল খনন হলে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১ লক্ষ কৃষক সেচের সুবিধা পাবেন। ভারতের
গজলডোবায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি চালু করা হয় ১৯৭৫ সালে। এ প্রকল্পের বিরূপ প্রতিক্রিয়া
হতে বাঁচতে বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধার দোয়ানিতে তিস্তা ব্যারেজ
সেচ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প চালু করে। কিন্তু ভারত কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে পশ্চিমবঙ্গের
সরকার আবার খাল খননের উদ্যোগ নেয়। এমনিতেই ভারতের পানি প্রত্যাহারের কারণে দোয়ানিতে
তিস্তা বারেজের ভাটিতে একদম পানি নেই। নদীর ভাটি এলাকা একেবারেই শুকিয়ে গেছে। এমন কী
তিস্তা সেচ প্রকল্পের পানির রিজার্ভেও তেমন পানি নেই। রিজার্ভ অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। এ
অবস্থায় আরও দুইটি নতুন খাল খনন করে পানি প্রত্যাহার করলে ভাটি অঞ্চলে তিস্তা নদী মানচিত্র
থেকেই হারিয়ে যাবে। রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম জেলার অন্তত ১৪৫ কিলোমিটার
এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। দেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের আশপাশের
এলাকায় ধু ধু বালুচরে পরিণত হবে এবং এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র ধ্বংসের মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে
পানি শুকিয়ে যাওয়ায় তিস্তা নদীর উপর নির্মিত তিস্তা রেল সেতু, তিস্তা সড়ক সেতু ও গঙ্গাচড়ার
মহিপুর সেতু সবটাই এখন দাঁড়িয়ে আছে ধু ধু বালুচরের উপর। ব্রীজ থাকলেও নিচে হেঁটেই
চলাচল করছে মানুষ। র্ব্রীজের নিচে বেড়াচ্ছে গরু-মহিষ। ছেলেরা ক্রিকেট ও ফুটবল খেলছে ব্রীজের
নিচে। বিভিন্ন স্থানে তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে বাদাম, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়া ও আলুসহ
বিভিন্ন সবজি চাষ হলেও সেচের অভাবে সেগুলো থেকে ভালো ফলন পাচ্ছে না কৃষকরা। তিস্তা
ব্যারেজের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, নদীতে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার কিউসেক পানি রয়েছে। যা
সিলড্রাপ ও ক্যানেলগুলো ভরে রাখা হয়েছে। পানি কম থাকায় ব্যারেজের সবগুলো গেট বন্ধ রাখা
হয়েছে। এর চেয়েও যদি পানি কমে যায় তবে সেচ প্রকল্প সচল রাখা কষ্টকর হয়ে যাবে।নদী বিশেষজ্ঞ,
তিস্তা তীরবর্তী উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার মানুষের দাবি, ভারতের নদী আগ্রাসন ও তিস্তা মরুকরণের হাত
থেকে বাঁচতে হলে অবিলম্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অন্যথায় উত্তরের পাঁচ জেলা
মরুভূমিতে পরিণত হবে এবং জীববৈচিত্র হারিয়ে যাবে।





















