ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জের ৩৬ কিলোমিটার অংশকে ওই পথে যাতায়াতকারীরা ‘টিউমার সড়ক’ নামে ডাকেন। কারণ বারোবাড়িয়া থেকে আরিচা পর্যন্ত এলাকার অন্তত ১০/১৫টি স্পটে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে উঁচু-নিচু হয়ে গেছে। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্তের। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার গাড়ি চলাচল করে। সরকারি ছুটি ও উৎসবকে কেন্দ্র করে গাড়ির যাতায়াত আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু অভিযোগ আছে, মাটিবাহী,বালু বোঝাই দশচাকার ওভারলোডেড গাড়ির অবাধ বিচরণের কারণে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সাধারণ মানুষের ‘গলার কাঁটায়’ পরিণত হয়েছে। গাড়ির চালকরা সব সময়ে দুর্ঘটনার শঙ্কায় থাকেন। তবে আশার কথা শুনিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জুলাইয়ের মধ্যে সংস্কার করে সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
মানিকগঞ্জের বারোবাড়িয়া থেকে আরিচা পর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সড়কটি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে দ্বিতীয় গোলড়া মোড়, জাগীর পুলিশ ক্যাম্প, তরা সেতুর পশ্চিম পাড়, বানিয়াজুড়ি, পুখুরিয়া, জোকা, ফলসেটিয়া থেকে টেপড়া, বোয়ালিয়া ব্রিজ এলাকা, আরিচা,পাটুরিয়া, বাসস্ট্যান্ড এলাকার অবস্থা বেহাল। এসব এলাকার সড়কের পিচ উঠে এবং দেবে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে উঁচু-নিচু ও ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, যা যানবাহন চলাচলের জন্য বিপজ্জনক। এই সড়কটি দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আরিচা ঘাটে কথা হয় ট্রাকচালক শরীফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে এই সড়ক দিয়ে বিভিন্ন জেলায় মালামাল নিয়ে যাই। বর্তমানে এই সড়ক দিয়ে চলতে ভয় লাগে। বিশেষ করে রাতে সড়কের উঁচু-নিচু অবস্থা ও গর্তের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ আমাদের ট্রাক যখন লোড থাকে তখন একটু এদিকে-সেদিক হলেই উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
আরেক আরিচার ট্রাকচালক রাজু বলেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকে এই সড়কে চলাচল করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ বিকেলের পর থেকেই মাটিবাহী বড় বড় ডাম্পট্রাক চলাচল শুরু করে। পুলিশ আমাদের গাড়ি মাঝে মধ্যে চেক করে। কিন্তু মাটির ১০ চাকার ট্রাকগুলোকে অবাধে চলতে দিচ্ছে। সব নিয়ম আমাদের জন্য। রাস্তা নষ্টের জন্য মাটির গাড়িগুলোই দায়ী।’
মিনিবাস চালক লোকমান হোসেন বলেন, ‘সড়কটি এতটাই খারাপ যে যাত্রীরা পর্যন্ত অভিযোগ করেন। কিছু জায়গায় সড়কটি পুরোপুরি চলার অনুপযোগী হয়ে গেছে। এখানে গাড়ি চালানো খুবই কঠিন। আর রাতের বেলায় তো চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তাটি এখন আর আগের মতো নেই।’
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক বশির মিয়া বলেন, ‘এই সড়কে চলতে গিয়ে কখনো পেছনের টায়ার পাংচার, কখনো সাসপেনশন নষ্ট হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা থাকে অনেক। আমরা চাই সড়কটি দ্রুত মেরামত করা হোক।’
মোটরসাইকেল চালক লিটন আহমেদ বলেন, ‘এই সড়কটি এখন টিউমারের মতো হয়ে গেছে। যারা দীর্ঘ পথের যাত্রা করেন, তাদের মধ্যে সড়কটি নিয়ে উদ্বেগ কাজ করে। আর মোটরসাইকেলে যাতায়াত করা আরও কষ্টকর। প্রায় সময়ই মনে হয় এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল।’
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল কাদের জিলানী বলেন, ‘সড়ক বিভাগের পিরিওডিক মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গোলড়া থেকে উথলী পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি সড়কের যত সমস্যা আছে তা জুলাই মাসের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।’
যানবাহন চালকরা বলছেন, ওভারলোডেড গাড়িগুলোর জন্যই সড়কের বিভিন্ন অংশ দেবে উঁচু-নিচু কিংবা ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এমন প্রশ্নের উত্তরে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমাদের বাথুলীতে অবস্থিত এক্সেল লোড স্টেশনটি দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলে। সেখানে অতিরিক্ত ওজনের গাড়িগুলোকে জরিমানার আওতায় আনা হতো। কিন্তু এটি বন্ধ থাকার ফলে সেগুলোকে জরিমানা করা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে আমাদের অফিস থেকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াসমিন খাতুন বলেন, ‘এই রুটে চলাচলকারী অবৈধ গাড়িগুলোকে আমরা নিয়মিত আইনের আওতায় এনে মামলা দিচ্ছি।’
এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশের বেহালের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘সড়কপথে বালু কিংবা মাটি পরিবহনের জন্য আইন আছে। যারা এই আইন ভাঙছেন, আমরা তাদের জরিমানা করছি। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে বেহাল অংশগুলো মেরামত করতে বলা হয়েছে।





















