নগরীতে শিশু পার্কের অভাবে রেস্তোরাঁ ও সুপারশপে গড়ে উঠেছে শিশু জোন। সেখানে অতিরিক্ত ফি
দিয়ে সময় কাটায় শিশুরা নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের জনসংখ্যা
অনুপাতে পার্ক ও খেলার মাঠ থাকার কথা অন্তত ৭০০টি। বর্তমানে নগরে খেলার মাঠ ও পার্ক
আছে মাত্র ১৯৫টি। বিভিন্ন রেস্তোরাঁর কোণে কোণে গড়ে উঠছে শিশু জোন। উপায়ন্তর না দেখে
সেখানে শিশুদের নিয়ে যাচ্ছেন মা-বাবা। ক্রিকেট-ফুটবল ভুলে শিশুরা যন্ত্রনির্ভর বিনোদনে
অভ্যস্ত হচ্ছে। বাড়ছে মোবাইল আসক্তি। পাশপাশি শিশুরা ফাস্টফুডে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে
তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ নেই: ২০০৮ সালে সিডিএ প্রণীত চট্টগ্রাম নগরের বিশদ অঞ্চল
পরিকল্পনার (ড্যাপ) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার জন্য পাঁচ একরের একটি
পার্ক বা খেলার মাঠ রাখার কথা বলা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের
স্থায়ী ও অভিবাসী মিলে জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। সে হিসেবে চট্টগ্রাম নগরে খেলার মাঠ ও
পার্ক থাকার কথা প্রায় ৭০০টি। এ জন্য জায়গা সংরক্ষিত থাকার কথা ৩ হাজার ৫০০ একর।
বাস্তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ আছে ১৯০টি। পার্ক আছে
হাতেগোনা পাঁচটি। এর মধ্যে শিশুদের খেলাধুলার সামগ্রী সংবলিত পার্ক আছে দুটি। দুটিই এখন
বন্ধ রয়েছে। খেলার মাঠগুলোর মধ্যে অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় সেগুলোয় সাধারণের
প্রবেশাধিকার নেই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর লালখানবাজার ওয়ার্ডের জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।
এখানে মাঠ আছে আটটি। এর মধ্যে ছয়টিই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। একটি চট্টগ্রাম
মেট্রোপলিটন পুলিশের। এগুলোয় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। পুরো ওয়ার্ডে টাঙ্কির
পাহাড়ে ছোট একটি মাঠ আছে। সেটিতে যারা আগে যান শুধু তারা খেলতে পারেন। এ ছাড়া আর কোনো
মাঠ নেই।
শিশুদের দুই পার্কে ঝুলছে তালা: চট্টগ্রাম নগরে পার্ক আছে মাত্র পাঁচটি। এগুলো হলো নগরের
আগ্রাবাদে কর্ণফুলী শিশুপার্ক, জাম্বুরি পার্ক, পাঁচলাইশে জাতিসংঘ পার্ক, চান্দগাঁওয়ে
স্বাধীনতা কমপ্লেক্স ও বায়েজিদ বোস্তামীতে বায়েজিদ সবুজ উদ্যান। নগরের জাতিসংঘ
পার্কটিতে সংস্কার করছে গণপূর্ত বিভাগ, জাম্বুরি পার্ক ও বায়েজিদ সবুজ উদ্যানে শিশুদের
খেলাধুলার কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে বড়দের হাঁটার জন্য ওয়াকওয়ে রয়েছে।
কর্ণফুলী শিশু পার্কে ঝুলছে তালা। ১৯৯২ সালের ২১ মে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছ থেকে ৮
দশমিক ৮৬ একর জায়গা বরাদ্দ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। আট বছর পর ১৯৯৯ সালের
২০ ডিসেম্বর শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র তৈরির জন্য সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি
করে আনন্দ মেলা লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি নগরের আগ্রাবাদ জাম্বুরি
মাঠের পাশে কর্ণফুলী শিশু পার্ক নামে শিশুদের জন্য একটি বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলে। গত ৫
আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে পার্কটি বন্ধ রয়েছে। প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।
পার্কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জানিয়েছেন ইজারা পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে
পার্ক বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
এদিকে, নগরের চান্দগাঁও বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে অবস্থিত স্বাধীনতা
কমপ্লেক্সটিতেও তালা ঝুলছে। এটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের
সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনিও আত্মগোপনে থাকায়
পার্কটিতে তালা ঝুলছে। পার্কটিতে দেশের ঐতিহাসিক ভবনগুলোর রেপ্লিকার পাশাপাশি শিশুদের
বিনোদনের বিভিন্ন রাইড রয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘শিশুদের জন্য
খেলাধুলা ও বিনোদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় তারা এখন মোবাইলে
আসক্ত হচ্ছে। এতে শিশুদের নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সমাজের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ
নেই। ইদানীং কৃত্রিম ঘাসের কিছু খেলার মাঠ হচ্ছে। সেখানে একটা শ্রেণির পরিবারের শিশুরা
খেলতে পারে। এটার কারণে সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত
পরিবারের শিশুরা সেখানে খেলতে পারে না। এতে শিশুদের মানসিক বিষণ্নতা বাড়ছে। মানসিকভাবে
ভেঙে পড়ছে তারা। আমার দায়িত্ব পালনকালে বিষয়টিতে আমি নজর দেব। ৪১টি ওয়ার্ডে ৪১টি মাঠ
করে দেওয়ার পরিকল্পনা আমি নেব।’




















