০৪:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সোনারগাঁয়ে পক্ষকালব্যাপী বৈশাখী মেলায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে পহেলা বৈশাখ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ১৫ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।

গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ ফুটে উঠেছে বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে। পক্ষকালব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে চলছে এ মেলা। এবারের বৈশাখী মেলায় লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন রং-বেরংয়ের বাতি ও বিভিন্ন প্রাচীন মোটিভ দিয়ে সাজানো হয়েছে ফাউন্ডেশন চত্বর।প্রতিদিন মেলার লোকজ মঞ্চে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিনই চলছে বাউল গান ও লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুতুল নাচ, হালখাতা, বায়োস্কোপ, সাপ ও বানর খেলা, নাগরদোলাসহ গ্রামীণ বিনোদনের নানা আয়োজন। হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলা তিন গুটি, সাত গুটি, বাঘবন্দি, কানামাছি, গোল্লাছুট, বউচি ও কপাল টোক্কা প্রদর্শন। রসনা তৃপ্তির জন্য থাকছে মুখরোচক সব বাঙালি খাবার।

মেলায় ৬৫টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাতে তৈরি নকশীকাঁথা, মৃৎশিল্প, মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া এবং বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান।

জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, তাঁরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বৈশাখী মেলায় আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন এবং লোকজ সংস্কৃতির পরিবেশ উপভোগ করছেন।

এদিকে কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ জানান, মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

মেলা চত্বরে গিয়ে দেখা গেছে, বৈশাখী মেলা ও জাদুঘরের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের বৈচিত্র্যময় কারুপণ্যের সমাহার রাখা হয়েছে। লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কারুশিল্পীদের কেউ নিপুণ হাতের তৈরি কারুপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এ মেলায় এবার শুধু কারুপণ্যের শিল্পীরা স্থান পেয়েছেন। তারা তাদের বরাদ্দকৃত স্টলগুলোয় সাজিয়েছেন উৎপাদিত বিভিন্ন কারুপণ্য দিয়ে। সব স্টল সাজানো হয়েছে অতীতের শণ দিয়ে তৈরি ঘরে। সেখানে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে খুঁজে পাওয়া যায়। এ মেলা আমাদের নিয়ে যায় নিজেদের শিকড়ের কাছে। নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করে দিচ্ছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির সঙ্গে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জামদানি, শতরঞ্জি, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, পাঁটজাতশিল্প, নকশি হাতপাখা, কাঠখোদাইশিল্প, পটচিত্রশিল্প, ঝিনুকশিল্প, লোক বাদ্যযন্ত্রশিল্প, মণিপুরি তাঁতশিল্প, শোলাশিল্প, বাঁশ-বেতশিল্প এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারুশিল্পীদের সৃষ্টিশীল কর্মের উপস্থাপন এবং বিপণন করছেন শিল্পীরা। তারা এক স্টলে বসে তাদের কারুপণ্য তৈরি করছেন। একই নামে অপর স্টলে কারুপণ্য প্রদর্শন ও বিপণন করছেন। এখানে রয়েছেন রাজশাহীর শখের হাঁড়িশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল ও সঞ্জয় কুমার পাল, কুমিল্লার রিকশা পেইন্টিং শিল্পী মো. নুহু খন্দকার, রাজশাহীর মৃৎশিল্প টেপা পুতুল শিল্পী সুবোধ কুমার পাল, কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্প টেপা পুতুল শিল্পী সুনীল চন্দ্র পাল, নীলফামারীর পাঁটজাত কারুশিল্পী একাব্বর হোসেন, সোনারগাঁয়ের নকশি হাতপাখা শিল্পী বাসন্তী রানী সূত্রধর, কুমিল্লার রীতা রানী সূত্রধর, সোনারগাঁয়ের কাঠখোদাই শিল্পী আউয়াল মোল্লা ও রফিকুল ইসলাম, কাঠের চিত্রিত কারুশিল্পী বীরেন্দ্র চন্দ্র সূত্রধর ও আশুতোষ সূত্রধর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নকশিকাঁথা শিল্পী পারভীন আক্তার, রাঙামাটির আদিবাসী তাঁতশিল্পী মাচাচিং মারমা ও সীমা চাকমা, শতরঞ্জি শিল্পী আনোয়ার হোসেনসহ প্রথিতযশা কারুশিল্পীরা।

মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল জানান, তাদের স্টলে মেলায় আসা দর্শনার্থী ভিড় করছেন। তাদের হাতের তৈরি শখের হাঁড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। বেচাবিক্রিও ভালো হচ্ছে। একটি স্টলে কারুপণ্য তৈরি করছেন আর অন্য স্টলে প্রদর্শন ও বিপণন হচ্ছে।

নকশিকাঁথা শিল্পী হোসনে আরা জানান, তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রি, বিপণন ও জাতীয় পর্যায়ে সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে আমি এ মেলায় পণ্য নিয়ে আসছি। তবে অন্যবারের চেয়ে এবারের আয়োজন ছিল ভিন্ন। ক্রেতাও এসেছে অনেক। এখানে আমাদের তৈরি নকশিকাঁথা পেয়ে অনেকেই খুশি হয়েছেন।

রাঙামাটির তাঁতশিল্পী মাচাচিং মারমা ও সীমা চাকমা বলেন, ‘ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ আমাদের হাতের তৈরি পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আরও বেশি কারুপণ্যের মেলার আয়োজন করলে এসব পণ্যের প্রতি লোকজন আকৃষ্ট হবেন।’

মেলায় আগত কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, মেলায় এসে সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি, হাতের তৈরি কাঠ ও তাঁতের বিভিন্ন কারুপণ্য কিনেছি। এখানে ঐতিহাসিক বিভিন্ন পণ্যের স্টল বসানো হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখছি। সব কটি পণ্য আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে।’

আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘আমার কাছে বৈশাখী মেলা মানে হরেকরকম সুস্বাদু খাবারের সমাহার, যেসব খাবারের স্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই নিজে খাওয়ার পাশাপাশি মেলা থেকে বাসার জন্যও মুখরোচক কিছু খাবার কিনছি।’
মেলায় শিশু-কিশোরের সংখ্যাও ছিল বেশি। বেড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নাগরদোলা-চরকিতে চড়ে তারা আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।

উল্লেখ্য, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন; যা সোনারগাঁ জাদুঘর নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্পের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আমাদের দেশজ যে লোক ও কারুপণ্য, এগুলো বাজারজাতকরণের একটা বড় জায়গা এ ধরনের মেলায়। আমরা এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে দেশজ পণ্যের প্রচার ও প্রসারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি এ মেলায়। এবারের আয়োজনটি একটু ভিন্ন। আমাদের এ ফাউন্ডেশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের পাশাপাশি পক্ষকালব্যাপী ভিন্ন আঙ্গিকে এবার বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই এবার একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে থাকা লোকজ ও কারুশিল্পের শিল্পীদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী উৎপাদন, বিপণনসহ সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য এ বৈশাখী মেলার মূল উদ্দেশ্য। এ মেলার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশজ পণ্যের যে একটি বাজার গড়ে ওঠে, সেটি দেশের অর্থনীতিতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।’ ২৮শে এপ্রিল এ মেলার শেষ দিন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সোনারগাঁয়ে পক্ষকালব্যাপী বৈশাখী মেলায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

আপডেট সময় : ০৪:০৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৫

নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে পহেলা বৈশাখ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ১৫ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।

গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ ফুটে উঠেছে বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে। পক্ষকালব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে চলছে এ মেলা। এবারের বৈশাখী মেলায় লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন রং-বেরংয়ের বাতি ও বিভিন্ন প্রাচীন মোটিভ দিয়ে সাজানো হয়েছে ফাউন্ডেশন চত্বর।প্রতিদিন মেলার লোকজ মঞ্চে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিনই চলছে বাউল গান ও লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুতুল নাচ, হালখাতা, বায়োস্কোপ, সাপ ও বানর খেলা, নাগরদোলাসহ গ্রামীণ বিনোদনের নানা আয়োজন। হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলা তিন গুটি, সাত গুটি, বাঘবন্দি, কানামাছি, গোল্লাছুট, বউচি ও কপাল টোক্কা প্রদর্শন। রসনা তৃপ্তির জন্য থাকছে মুখরোচক সব বাঙালি খাবার।

মেলায় ৬৫টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাতে তৈরি নকশীকাঁথা, মৃৎশিল্প, মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া এবং বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান।

জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, তাঁরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বৈশাখী মেলায় আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন এবং লোকজ সংস্কৃতির পরিবেশ উপভোগ করছেন।

এদিকে কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ জানান, মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

মেলা চত্বরে গিয়ে দেখা গেছে, বৈশাখী মেলা ও জাদুঘরের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের বৈচিত্র্যময় কারুপণ্যের সমাহার রাখা হয়েছে। লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কারুশিল্পীদের কেউ নিপুণ হাতের তৈরি কারুপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এ মেলায় এবার শুধু কারুপণ্যের শিল্পীরা স্থান পেয়েছেন। তারা তাদের বরাদ্দকৃত স্টলগুলোয় সাজিয়েছেন উৎপাদিত বিভিন্ন কারুপণ্য দিয়ে। সব স্টল সাজানো হয়েছে অতীতের শণ দিয়ে তৈরি ঘরে। সেখানে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে খুঁজে পাওয়া যায়। এ মেলা আমাদের নিয়ে যায় নিজেদের শিকড়ের কাছে। নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করে দিচ্ছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির সঙ্গে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জামদানি, শতরঞ্জি, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, পাঁটজাতশিল্প, নকশি হাতপাখা, কাঠখোদাইশিল্প, পটচিত্রশিল্প, ঝিনুকশিল্প, লোক বাদ্যযন্ত্রশিল্প, মণিপুরি তাঁতশিল্প, শোলাশিল্প, বাঁশ-বেতশিল্প এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারুশিল্পীদের সৃষ্টিশীল কর্মের উপস্থাপন এবং বিপণন করছেন শিল্পীরা। তারা এক স্টলে বসে তাদের কারুপণ্য তৈরি করছেন। একই নামে অপর স্টলে কারুপণ্য প্রদর্শন ও বিপণন করছেন। এখানে রয়েছেন রাজশাহীর শখের হাঁড়িশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল ও সঞ্জয় কুমার পাল, কুমিল্লার রিকশা পেইন্টিং শিল্পী মো. নুহু খন্দকার, রাজশাহীর মৃৎশিল্প টেপা পুতুল শিল্পী সুবোধ কুমার পাল, কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্প টেপা পুতুল শিল্পী সুনীল চন্দ্র পাল, নীলফামারীর পাঁটজাত কারুশিল্পী একাব্বর হোসেন, সোনারগাঁয়ের নকশি হাতপাখা শিল্পী বাসন্তী রানী সূত্রধর, কুমিল্লার রীতা রানী সূত্রধর, সোনারগাঁয়ের কাঠখোদাই শিল্পী আউয়াল মোল্লা ও রফিকুল ইসলাম, কাঠের চিত্রিত কারুশিল্পী বীরেন্দ্র চন্দ্র সূত্রধর ও আশুতোষ সূত্রধর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নকশিকাঁথা শিল্পী পারভীন আক্তার, রাঙামাটির আদিবাসী তাঁতশিল্পী মাচাচিং মারমা ও সীমা চাকমা, শতরঞ্জি শিল্পী আনোয়ার হোসেনসহ প্রথিতযশা কারুশিল্পীরা।

মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল জানান, তাদের স্টলে মেলায় আসা দর্শনার্থী ভিড় করছেন। তাদের হাতের তৈরি শখের হাঁড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। বেচাবিক্রিও ভালো হচ্ছে। একটি স্টলে কারুপণ্য তৈরি করছেন আর অন্য স্টলে প্রদর্শন ও বিপণন হচ্ছে।

নকশিকাঁথা শিল্পী হোসনে আরা জানান, তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রি, বিপণন ও জাতীয় পর্যায়ে সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে আমি এ মেলায় পণ্য নিয়ে আসছি। তবে অন্যবারের চেয়ে এবারের আয়োজন ছিল ভিন্ন। ক্রেতাও এসেছে অনেক। এখানে আমাদের তৈরি নকশিকাঁথা পেয়ে অনেকেই খুশি হয়েছেন।

রাঙামাটির তাঁতশিল্পী মাচাচিং মারমা ও সীমা চাকমা বলেন, ‘ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ আমাদের হাতের তৈরি পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আরও বেশি কারুপণ্যের মেলার আয়োজন করলে এসব পণ্যের প্রতি লোকজন আকৃষ্ট হবেন।’

মেলায় আগত কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, মেলায় এসে সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি, হাতের তৈরি কাঠ ও তাঁতের বিভিন্ন কারুপণ্য কিনেছি। এখানে ঐতিহাসিক বিভিন্ন পণ্যের স্টল বসানো হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখছি। সব কটি পণ্য আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে।’

আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘আমার কাছে বৈশাখী মেলা মানে হরেকরকম সুস্বাদু খাবারের সমাহার, যেসব খাবারের স্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই নিজে খাওয়ার পাশাপাশি মেলা থেকে বাসার জন্যও মুখরোচক কিছু খাবার কিনছি।’
মেলায় শিশু-কিশোরের সংখ্যাও ছিল বেশি। বেড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নাগরদোলা-চরকিতে চড়ে তারা আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।

উল্লেখ্য, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন; যা সোনারগাঁ জাদুঘর নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্পের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আমাদের দেশজ যে লোক ও কারুপণ্য, এগুলো বাজারজাতকরণের একটা বড় জায়গা এ ধরনের মেলায়। আমরা এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে দেশজ পণ্যের প্রচার ও প্রসারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি এ মেলায়। এবারের আয়োজনটি একটু ভিন্ন। আমাদের এ ফাউন্ডেশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের পাশাপাশি পক্ষকালব্যাপী ভিন্ন আঙ্গিকে এবার বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই এবার একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে থাকা লোকজ ও কারুশিল্পের শিল্পীদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী উৎপাদন, বিপণনসহ সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য এ বৈশাখী মেলার মূল উদ্দেশ্য। এ মেলার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশজ পণ্যের যে একটি বাজার গড়ে ওঠে, সেটি দেশের অর্থনীতিতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।’ ২৮শে এপ্রিল এ মেলার শেষ দিন।