০১:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুর অঞ্চলে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন পেলেও আটকে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণে

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলন ও
সংগ্রামে রংপুর বিভাগের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছে।
একাত্তরের শুরুতে ৩ মার্চ শহীদ হন কিশোর শংকু সমজদার। তিনি দেশের প্রথম শহীদ। শহীদ শংকু
সমজদারের জন্মভূমি রংপুর। ২৪ মার্চ নিসবেতগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি জিপ
গাড়িতে হামলা করে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে আব্বাসী নামে এক সেনাসদস্যকে দা দিয়ে কুপিয়ে
হত্যা করেন স্থানীয় শাহেদ আলী নামে এক মাংস বিক্রেতা। এ নিয়ে গোটা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে
পড়ে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্রোধে ফেটে পড়ে। রংপুরের স্বাধীনতাকামী মানুষও ক্যান্টনমেন্ট
ঘেরাওয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৮ মার্চ বাঁশের লাঠি, তীর-ধনুক, দা-কুড়াল, বল্লম নিয়ে
ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করার নজির বিশ্বে আর কোনো দেশে নেই। এটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের
ইতিহাসে সাহসিকতার এক বিরল ঘটনা। ২৮ মার্চ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য বিভিন্ন হাট-
বাজার ও এলাকায় ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় দিনক্ষণ। বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের প্রচারে
মেলে অভূতপূর্ব সাড়া। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ রবিবার সকাল থেকে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ
সংগঠিত হতে থাকে। রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা
থেকে ছাত্র, কৃষক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশার মানুষ দা, কোদাল,
কুড়াল, বর্শা, বল্লম হাতে নিসবেতগঞ্জ এলাকায় একত্রিত হন। আদিবাসী সাঁওতালরা তীর-ধনুক
হাতে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে আসে। সকাল ১১টার দিকে হাজার হাজার মানুষ ক্যান্টনমেন্টের
দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মেশিনগান দিয়ে গুলি ছুড়ে। এতে মাত্র ৫
মিনিটে এলাকাটি স্তব্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার মরদেহ পড়ে থাকে মাঠে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা
মরদেহগুলো একখানে জড়ো করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তখনও যেসব মানুষ বেঁচে ছিলেন তাদের বেয়নেট
দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। অথচ সেই রংপুর অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত হয়েছে উন্নয়ন থেকে। হয়েছে
বৈষম্যের শিকার। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে উন্নয়নে এগিয়ে
যাবে রংপুর অঞ্চল, এমনটাই দাবি শহীদ আবু সাঈদের রংপুর বিভাগের মানুষের। গত ১৬ বছরে
কাক্সিক্ষত উন্নয়ন এবং বরাদ্দ থেকে বরাবরই বঞ্চিত ছিল এই অঞ্চল। এজন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালিন
সরকারের প্রতি এ অঞ্চলের দারিদ্রতা বিমোচনে থমকে থাকা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও শিল্পায়নে
গুরুত্বারোপ করার জোর দাবি উঠেছে। পিছিয়েপড়া রংপুরের মানুষ বলেন, বরাদ্দ বৈষম্যের শিকার হয়ে
রংপুর বিভাগে শুধু দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই বাড়েনি, বেড়েছে কর্মহীন মানুষও। দীর্ঘদিনেও হয়নি
কাক্সিক্ষত শিল্পায়ন। ফলে কৃষির ওপর নির্ভর করে চলছে উত্তরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি। বিগত সরকার
চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিলেও আটকে আছে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম।
অথচ একই সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ।
নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেড ছাড়া দীর্ঘ সময়ে রংপুর অঞ্চলে গড়ে উঠেনি ভারি কোনো শিল্প
কলকারখানা। এখনও এই অঞ্চলের শিল্প আটকে আছে কিছু চালকল, পাট ও ক্ষুদ্র শিল্পে। ফলে বিভাগের ৭০
শতাংশ মানুষকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জানা যায়,
দিনাজপুরে ৩০৮ একর জমির মধ্যে অধিগ্রহণ হয়েছে মাত্র ৮৭ একর। এছাড়া পঞ্চগড়ে ২৫০ একরের
মধ্যে ১৮৭ একর ও নীলফামারীতে ১০৬ একর জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজার কাছে
বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কুড়িগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১৪৯ একর জমি বরাদ্দ
দেয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা
পাড়ে ২৫৪ দশমিক ২৩ একর জমির উপর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হলেও শেষ
পর্যন্ত সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ২০২৪ সালে কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর
ইউনিয়নের হয়বৎ খাঁ মৌজায় ২৫৪ একর খাস জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ
নিয়েছিল বিগত সরকার। এজন্য জমি নির্বাচনের কাজ চূড়ান্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ সংক্রান্ত পত্র
প্রেরণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হোঁচট খেয়ে থমকে যায় লালফিতায় বাঁধা
অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্বপ্ন। শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিগত সরকার দ্রুত অর্থনৈতিক
উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও রংপুর অঞ্চলে সেই
দৃশ্য প্রতিফলিত হয়নি। এই অঞ্চলে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন পেলেও আটকে আছে ভূমি
অধিগ্রহণেই। শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে রংপুরে এসে পুত্রবধু পরিচয় দিলেও রংপুরের
মানুষের প্রতি ন্যায্যতা দেখাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে রংপুর
বিভাগের মানুষকে শুধু আশ্বাসের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা ছাড়া কিছুই হয়নি। অথচ একই
সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে চাঙ্গা করেছে বিগত সরকার। এই বৈষম্য দূর
করার জন্য বর্তমান অন্তবর্তীকালিন সরকারকে কাজ করতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে যাতে আবু
সাঈদের রংপুর বিভাগ আর পিছিয়ে না থাকে এবং বৈষম্যের ফাঁদে না পড়ে। আরিফা সুলতানা নামে

নারী বলেন, বিভাগীয় নগরী হিসেবে রংপুরে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন হয়নি। বাজেটগুলোতে
রংপুরের প্রতি যে বৈষম্য করা হয়েছে, তা ছিল চরম অবহেলার সামিল। আমরা ভেবেছিলাম
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে রংপুর বিভাগ বদলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতায় তা হয়ে উঠেনি,
বরং উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ মিললেও বিভিন্ন জটিলতা দেখিয়ে কাজ হয়নি। অন্তর্বর্তীকালিন সরকার
যদি রংপুরের প্রতি সুনজর দেয় তাহলে বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে। রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড
ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, রংপুরে অর্থনৈতিক জোন স্থাপন হলে এখানে
শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্র হবে প্রসারিত। সর্বোপরি এ অঞ্চলে নতুন
নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। আর উদ্যোক্তা সৃষ্টি হলে বাড়বে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান
হবে হাজার হাজার বেকার যুবকদের। দিনাজপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক
বলেন, গত সরকারের আমলে মন্ত্রী-এমপিরা উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শুধু
ফিতা কাটার মধ্যে তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। পঞ্চগড় চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির
সাবেক সহ-সভাপতি মেহেদী হাসান খান বলেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষি পণ্যের প্রসারে এখানে
অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত গড়ে তোলা দরকার।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির ২৫০ একর জমির মধ্যে ১৮৫
একর সরকারি খাস জমি। বাকি ৬৫ একর জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। যেগুলোর দাম নির্ধারণ করা
হয়েছে সরকারের নিয়মানুযায়ী। এই অর্থ সরকারের কাছ থেকে পাওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদগণ বলেন, শিল্পায়নে এগিয়ে নিতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অর্থনৈতিক
অঞ্চলগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
(বেরোবি) অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক
বলেন, বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য হয়েছে, তার শিকার হয়েছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ। রংপুরের
গঙ্গাচড়া এবং কাউনিয়াতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য বিগত সরকার স্বপ্ন দেখিয়েছে,
কিন্তু বাস্তবে তা অধরা ছিল। অজ্ঞাত কারণে এই অঞ্চলের মানুষ সুষম উন্নয়ন, বাজেটে কাক্সিক্ষত বরাদ্দ
এবং ঘোষিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুর অঞ্চলে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন পেলেও আটকে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণে

আপডেট সময় : ০২:৪৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ মে ২০২৫

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলন ও
সংগ্রামে রংপুর বিভাগের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছে।
একাত্তরের শুরুতে ৩ মার্চ শহীদ হন কিশোর শংকু সমজদার। তিনি দেশের প্রথম শহীদ। শহীদ শংকু
সমজদারের জন্মভূমি রংপুর। ২৪ মার্চ নিসবেতগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি জিপ
গাড়িতে হামলা করে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে আব্বাসী নামে এক সেনাসদস্যকে দা দিয়ে কুপিয়ে
হত্যা করেন স্থানীয় শাহেদ আলী নামে এক মাংস বিক্রেতা। এ নিয়ে গোটা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে
পড়ে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্রোধে ফেটে পড়ে। রংপুরের স্বাধীনতাকামী মানুষও ক্যান্টনমেন্ট
ঘেরাওয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৮ মার্চ বাঁশের লাঠি, তীর-ধনুক, দা-কুড়াল, বল্লম নিয়ে
ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করার নজির বিশ্বে আর কোনো দেশে নেই। এটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের
ইতিহাসে সাহসিকতার এক বিরল ঘটনা। ২৮ মার্চ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য বিভিন্ন হাট-
বাজার ও এলাকায় ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় দিনক্ষণ। বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের প্রচারে
মেলে অভূতপূর্ব সাড়া। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ রবিবার সকাল থেকে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ
সংগঠিত হতে থাকে। রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা
থেকে ছাত্র, কৃষক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশার মানুষ দা, কোদাল,
কুড়াল, বর্শা, বল্লম হাতে নিসবেতগঞ্জ এলাকায় একত্রিত হন। আদিবাসী সাঁওতালরা তীর-ধনুক
হাতে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে আসে। সকাল ১১টার দিকে হাজার হাজার মানুষ ক্যান্টনমেন্টের
দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মেশিনগান দিয়ে গুলি ছুড়ে। এতে মাত্র ৫
মিনিটে এলাকাটি স্তব্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার মরদেহ পড়ে থাকে মাঠে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা
মরদেহগুলো একখানে জড়ো করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তখনও যেসব মানুষ বেঁচে ছিলেন তাদের বেয়নেট
দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। অথচ সেই রংপুর অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত হয়েছে উন্নয়ন থেকে। হয়েছে
বৈষম্যের শিকার। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে উন্নয়নে এগিয়ে
যাবে রংপুর অঞ্চল, এমনটাই দাবি শহীদ আবু সাঈদের রংপুর বিভাগের মানুষের। গত ১৬ বছরে
কাক্সিক্ষত উন্নয়ন এবং বরাদ্দ থেকে বরাবরই বঞ্চিত ছিল এই অঞ্চল। এজন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালিন
সরকারের প্রতি এ অঞ্চলের দারিদ্রতা বিমোচনে থমকে থাকা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও শিল্পায়নে
গুরুত্বারোপ করার জোর দাবি উঠেছে। পিছিয়েপড়া রংপুরের মানুষ বলেন, বরাদ্দ বৈষম্যের শিকার হয়ে
রংপুর বিভাগে শুধু দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই বাড়েনি, বেড়েছে কর্মহীন মানুষও। দীর্ঘদিনেও হয়নি
কাক্সিক্ষত শিল্পায়ন। ফলে কৃষির ওপর নির্ভর করে চলছে উত্তরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি। বিগত সরকার
চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিলেও আটকে আছে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম।
অথচ একই সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ।
নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেড ছাড়া দীর্ঘ সময়ে রংপুর অঞ্চলে গড়ে উঠেনি ভারি কোনো শিল্প
কলকারখানা। এখনও এই অঞ্চলের শিল্প আটকে আছে কিছু চালকল, পাট ও ক্ষুদ্র শিল্পে। ফলে বিভাগের ৭০
শতাংশ মানুষকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জানা যায়,
দিনাজপুরে ৩০৮ একর জমির মধ্যে অধিগ্রহণ হয়েছে মাত্র ৮৭ একর। এছাড়া পঞ্চগড়ে ২৫০ একরের
মধ্যে ১৮৭ একর ও নীলফামারীতে ১০৬ একর জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজার কাছে
বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কুড়িগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১৪৯ একর জমি বরাদ্দ
দেয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা
পাড়ে ২৫৪ দশমিক ২৩ একর জমির উপর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হলেও শেষ
পর্যন্ত সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ২০২৪ সালে কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর
ইউনিয়নের হয়বৎ খাঁ মৌজায় ২৫৪ একর খাস জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ
নিয়েছিল বিগত সরকার। এজন্য জমি নির্বাচনের কাজ চূড়ান্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ সংক্রান্ত পত্র
প্রেরণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হোঁচট খেয়ে থমকে যায় লালফিতায় বাঁধা
অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্বপ্ন। শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিগত সরকার দ্রুত অর্থনৈতিক
উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও রংপুর অঞ্চলে সেই
দৃশ্য প্রতিফলিত হয়নি। এই অঞ্চলে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন পেলেও আটকে আছে ভূমি
অধিগ্রহণেই। শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে রংপুরে এসে পুত্রবধু পরিচয় দিলেও রংপুরের
মানুষের প্রতি ন্যায্যতা দেখাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে রংপুর
বিভাগের মানুষকে শুধু আশ্বাসের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা ছাড়া কিছুই হয়নি। অথচ একই
সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে চাঙ্গা করেছে বিগত সরকার। এই বৈষম্য দূর
করার জন্য বর্তমান অন্তবর্তীকালিন সরকারকে কাজ করতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে যাতে আবু
সাঈদের রংপুর বিভাগ আর পিছিয়ে না থাকে এবং বৈষম্যের ফাঁদে না পড়ে। আরিফা সুলতানা নামে

নারী বলেন, বিভাগীয় নগরী হিসেবে রংপুরে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন হয়নি। বাজেটগুলোতে
রংপুরের প্রতি যে বৈষম্য করা হয়েছে, তা ছিল চরম অবহেলার সামিল। আমরা ভেবেছিলাম
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে রংপুর বিভাগ বদলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতায় তা হয়ে উঠেনি,
বরং উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ মিললেও বিভিন্ন জটিলতা দেখিয়ে কাজ হয়নি। অন্তর্বর্তীকালিন সরকার
যদি রংপুরের প্রতি সুনজর দেয় তাহলে বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে। রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড
ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, রংপুরে অর্থনৈতিক জোন স্থাপন হলে এখানে
শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্র হবে প্রসারিত। সর্বোপরি এ অঞ্চলে নতুন
নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। আর উদ্যোক্তা সৃষ্টি হলে বাড়বে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান
হবে হাজার হাজার বেকার যুবকদের। দিনাজপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক
বলেন, গত সরকারের আমলে মন্ত্রী-এমপিরা উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শুধু
ফিতা কাটার মধ্যে তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। পঞ্চগড় চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির
সাবেক সহ-সভাপতি মেহেদী হাসান খান বলেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষি পণ্যের প্রসারে এখানে
অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত গড়ে তোলা দরকার।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির ২৫০ একর জমির মধ্যে ১৮৫
একর সরকারি খাস জমি। বাকি ৬৫ একর জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। যেগুলোর দাম নির্ধারণ করা
হয়েছে সরকারের নিয়মানুযায়ী। এই অর্থ সরকারের কাছ থেকে পাওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদগণ বলেন, শিল্পায়নে এগিয়ে নিতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অর্থনৈতিক
অঞ্চলগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
(বেরোবি) অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক
বলেন, বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য হয়েছে, তার শিকার হয়েছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ। রংপুরের
গঙ্গাচড়া এবং কাউনিয়াতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য বিগত সরকার স্বপ্ন দেখিয়েছে,
কিন্তু বাস্তবে তা অধরা ছিল। অজ্ঞাত কারণে এই অঞ্চলের মানুষ সুষম উন্নয়ন, বাজেটে কাক্সিক্ষত বরাদ্দ
এবং ঘোষিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে।