১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দখল ও দুষনে মৃত রহমতখালী খাল, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার শঙ্কায় জনমনে ফের আতংক

দখল ও ময়লার আবর্জনার বাঘাড়ে
পরিণত হয়ে লক্ষ্মীপুরে বিস্তীর্ন এলাকাজুড়ে প্রবাহিত রহমতখালী খাল এখন দিন
সংকুচিত ও মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। খালটি উপকুলীয় জনগনের রহমতের
পরিবর্তে অভিশাপে ভারি হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া খালটিকে ঘিরে এবং মারাত্নক
জলাবদ্ধতার কারণে গত বছরের বন্যায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন
এবং পার্শবর্তী নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ
দীর্ঘমেয়াদি পানিবন্দি অবস্থার মধ্যে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার প্রধান কারণ
ছিল রহমতখালী খালের পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা। অথচ খালের পাড়ের অব্যাহত দখল ও
ময়লা আবর্জনার বাঘাড়ে দুষন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দফতর সহ স্থানীয় প্রশাসন এর
প্রতি তেমন কোন নজর বা কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করায় এক সময়
আশীর্বাদস্বরূপ এ খালটি যেন এখন অভিশাপে রূপ নিয়েছে। ফলে জেলা জুড়ে এ
বছর আবারো বন্যার আতংকে সাধারন মানুষ ক্রমেই ফুঁসে উঠছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে,উজানের ফেনী নদীর পানি যখন বাড়ে, তখন তা
নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে রহমতখালী, ভূলুয়া ও ওয়াপদা খাল হয়ে মেঘনা
নদীতে গিয়ে পড়ে। তবে এসব খালে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে পানি
সঠিকভাবে নিষ্কাশন না হওয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। অতিবৃষ্টির পানি এতে
যোগ হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অবশ্য স্থানীয়রা বন্যার মূল কারণ
হিসেবে চিহ্নিত করেছে খালের গভীরতা কমে যাওয়া, দুই দখলে পাড় সংকুচিত
হওয়া, আবর্জনা স্তুপে দিন দিন খাল ভরাট ও দূষণ সৃষ্টি হওয়া, মাছ ধরার জন্য বাঁধ
নির্মাণ এবং সরু নিচু ব্রিজ তৈরীর কারণে যক্রতত্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় । এছাড়া
খালের সংযোগ খালগুলো দখল ও ভরাট এবং বাঁশ কিংবা বিভিন্ন দিয়ে যেখানে
সেখানে রাস্তার ধারে দোকান ঘর নির্মান হওয়াও এর অন্যতম কারণ বলে দাবী
সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে গত বন্যার পরে খাল দখলমুক্ত, খনন ও সংস্কারের দাবি উঠলেও মাঠপর্যায়ে তা
তেমন বাস্তবায়িত হয়নি। খালের প্রতিবন্ধকতা, নাব্যতা সংকট, বর্জ্য অপসারণ
এবং পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বিক্ষিপ্ত কিছু
উদ্দ্যেগ নিলে ও তা পর্যাপ্ত এবং কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে
দাবী ভুক্তভোগীদের। তাদের ধারনা বর্ষা মৌসুম আবারও আসছে, কিন্তু খালের সংকট
সেই আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। তবে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা

চিহ্নিত করে আগামী জুনের মধ্যে তা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান
তারা।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সবুজ বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. শাহীন আলম
জানান, রহমতখালী খাল দখল ও দূষণে প্রায় নিশ্চিহ্ন। বাজার ও বসতবাড়ির বর্জ্য এবং
পয়ঃবর্জ্য খালে ফেলা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় খালটির পানি
প্রবাহ বন্ধ হয়ে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। এ অবস্থায় এবারও বন্যার শঙ্কা
রয়েছে। ফলে তাদের আতংক এখন আগের তুলনায় অনেক বেশী বলে জানান।
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর ফরহাদ হোসেন সুমনের মতে,
প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্যে খালটি ভরে গেছে। এতে পানি দূষিত হচ্ছে এবং খাল
হারিয়েছে নাব্যতা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে খালটির
স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে খালপাড়ের বাসিন্দারা জানান, খালের
পানি কালো এবং দুর্গন্ধযুক্ত। এতে জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি ও বিভিন্ন
কীটপতঙ্গ, বাড়ছে রোগবালাই। স্থানীয় কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান
শিক্ষক আবু তাহের বলেন, এক সময় খালটিতে স্বচ্ছ পানি ও প্রচুর মাছ পাওয়া
যেত। চলত পণ্যবাহী নৌকা। এখন এসব কেবলমাত্র স্মৃতি।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, রহমতখালী এক সময় নদী
ছিল। এখন তা খালে রূপান্তরিত হয়েছে। ফেনী থেকে শুরু হয়ে এটি নোয়াখালী ও
লক্ষ্মীপুর হয়ে মজুচৌধুরীর হাটে মেঘনায় গিয়ে পড়ে। দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭
কিলোমিটার, প্রস্থ এক সময় ১২৮ মিটার থাকলেও দখল ও পলি ভরাটে এখন তা
সংকুচিত। লক্ষ্মীপুর অংশে প্রায় ৪০ কিলোমিটার, এর মধ্যে পৌরসভার অংশ ৮
কিলোমিটার। বর্ষায় পানি নিষ্কাশন এবং বোরো মৌসুমে কৃষিকাজে
খালটির গুরুত্ব অপরিসীম।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌর বাজার, মাদাম, ঝুমুর, জকসিন, মান্দারী,
বটতলী ও চন্দ্রগঞ্জ বাজার অংশে খালের দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা এবং প্লাস্টিক সহ
বিভিন্ন বর্জ্যের স্তূপ। খাল পাড়ে যে যার মতো দখল করে দোকান ঘর, বাড়ী কিংবা
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অনেকেই তা চড়া দামে বিক্রী করে রমরমা বানিজ্যে
মেতে উঠেছে। খালটিকে সংকুচিত করে মরার উপর খরারগা করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টর
এসব দেখে ও না দেখার বান করে সুযোগ বুঝে কেউ কেউ সুবিধা হাতিয়ে
নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে খাল দখলে যোগ সাজশের
অভিযোগ রয়েছে।
খালে আশপাশের বাসিন্ধাদের দাবী, গত বছরের বন্যার শুরুতে খাল দিয়ে পানি
প্রবাহের চাপ গেলেও সংকুচিত ও বর্জ্য-পলি জমে ভরাট খালটি সেই চাপ নিতে
পারেনি। ফলে খালসংলগ্ন বসতবাড়ি, ফসলি জমি, পুকুর ও রাস্তাঘাট পানিতে
তলিয়ে যায়। বিশেষ করে চন্দ্রগঞ্জ, হাজিরপাড়া, মান্দারী, বাঙাখাঁ ও পৌর এলাকায়
ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। বন্যার ঠিক আগে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি

হয়। কারণ হিসেবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব, পলি জমে খাল ভরাট, দখল এবং নিচু ও
সরু কালভার্টকে দায়ী করে তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন্যার পানি।
অপরদিকে জেলা প্রশাসন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে জলাবদ্ধতা নিরসনে
ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে
অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় নয়টি সমস্যা চিহ্নিত করে ১০টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে- খাল দখলমুক্তকরণ, আবর্জনা পরিষ্কার, বাঁধ ও জাল অপসারণ,
পরিকল্পিত কালভার্ট নির্মাণ, স্লুইস গেট রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা
বাড়ানো। সে লক্ষ্যে জেলা জুড়ে দখল ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে উপজেলা
ও জেলা প্রশাসন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথার্থ ও কার্যকর নয় বলে দাবী
রয়েছে।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. জসীম উদ্দিনের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে
কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সভা হয়েছে। কচুরিপানা, জলজ উদ্ভিদ ও ময়লা
পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। অবৈধ দখলদার চিহ্নিতকরণে কমিটি গঠন করা
হয়েছে। রিপোর্টের ভিত্তিতে উচ্ছেদ অভিযান ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুরো
জেলায় খাল দখল-দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, রহমতখালী খালের অস্তিত্ব রক্ষা শুধু পরিবেশ নয়, এই অঞ্চলের
জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রশ্ন। দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামনে আরও
ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দখল ও দুষনে মৃত রহমতখালী খাল, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার শঙ্কায় জনমনে ফের আতংক

আপডেট সময় : ০৩:০১:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৫

দখল ও ময়লার আবর্জনার বাঘাড়ে
পরিণত হয়ে লক্ষ্মীপুরে বিস্তীর্ন এলাকাজুড়ে প্রবাহিত রহমতখালী খাল এখন দিন
সংকুচিত ও মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। খালটি উপকুলীয় জনগনের রহমতের
পরিবর্তে অভিশাপে ভারি হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া খালটিকে ঘিরে এবং মারাত্নক
জলাবদ্ধতার কারণে গত বছরের বন্যায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন
এবং পার্শবর্তী নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ
দীর্ঘমেয়াদি পানিবন্দি অবস্থার মধ্যে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার প্রধান কারণ
ছিল রহমতখালী খালের পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা। অথচ খালের পাড়ের অব্যাহত দখল ও
ময়লা আবর্জনার বাঘাড়ে দুষন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দফতর সহ স্থানীয় প্রশাসন এর
প্রতি তেমন কোন নজর বা কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করায় এক সময়
আশীর্বাদস্বরূপ এ খালটি যেন এখন অভিশাপে রূপ নিয়েছে। ফলে জেলা জুড়ে এ
বছর আবারো বন্যার আতংকে সাধারন মানুষ ক্রমেই ফুঁসে উঠছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে,উজানের ফেনী নদীর পানি যখন বাড়ে, তখন তা
নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে রহমতখালী, ভূলুয়া ও ওয়াপদা খাল হয়ে মেঘনা
নদীতে গিয়ে পড়ে। তবে এসব খালে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে পানি
সঠিকভাবে নিষ্কাশন না হওয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। অতিবৃষ্টির পানি এতে
যোগ হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অবশ্য স্থানীয়রা বন্যার মূল কারণ
হিসেবে চিহ্নিত করেছে খালের গভীরতা কমে যাওয়া, দুই দখলে পাড় সংকুচিত
হওয়া, আবর্জনা স্তুপে দিন দিন খাল ভরাট ও দূষণ সৃষ্টি হওয়া, মাছ ধরার জন্য বাঁধ
নির্মাণ এবং সরু নিচু ব্রিজ তৈরীর কারণে যক্রতত্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় । এছাড়া
খালের সংযোগ খালগুলো দখল ও ভরাট এবং বাঁশ কিংবা বিভিন্ন দিয়ে যেখানে
সেখানে রাস্তার ধারে দোকান ঘর নির্মান হওয়াও এর অন্যতম কারণ বলে দাবী
সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে গত বন্যার পরে খাল দখলমুক্ত, খনন ও সংস্কারের দাবি উঠলেও মাঠপর্যায়ে তা
তেমন বাস্তবায়িত হয়নি। খালের প্রতিবন্ধকতা, নাব্যতা সংকট, বর্জ্য অপসারণ
এবং পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বিক্ষিপ্ত কিছু
উদ্দ্যেগ নিলে ও তা পর্যাপ্ত এবং কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে
দাবী ভুক্তভোগীদের। তাদের ধারনা বর্ষা মৌসুম আবারও আসছে, কিন্তু খালের সংকট
সেই আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। তবে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা

চিহ্নিত করে আগামী জুনের মধ্যে তা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান
তারা।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সবুজ বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. শাহীন আলম
জানান, রহমতখালী খাল দখল ও দূষণে প্রায় নিশ্চিহ্ন। বাজার ও বসতবাড়ির বর্জ্য এবং
পয়ঃবর্জ্য খালে ফেলা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় খালটির পানি
প্রবাহ বন্ধ হয়ে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। এ অবস্থায় এবারও বন্যার শঙ্কা
রয়েছে। ফলে তাদের আতংক এখন আগের তুলনায় অনেক বেশী বলে জানান।
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর ফরহাদ হোসেন সুমনের মতে,
প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্যে খালটি ভরে গেছে। এতে পানি দূষিত হচ্ছে এবং খাল
হারিয়েছে নাব্যতা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে খালটির
স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে খালপাড়ের বাসিন্দারা জানান, খালের
পানি কালো এবং দুর্গন্ধযুক্ত। এতে জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি ও বিভিন্ন
কীটপতঙ্গ, বাড়ছে রোগবালাই। স্থানীয় কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান
শিক্ষক আবু তাহের বলেন, এক সময় খালটিতে স্বচ্ছ পানি ও প্রচুর মাছ পাওয়া
যেত। চলত পণ্যবাহী নৌকা। এখন এসব কেবলমাত্র স্মৃতি।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, রহমতখালী এক সময় নদী
ছিল। এখন তা খালে রূপান্তরিত হয়েছে। ফেনী থেকে শুরু হয়ে এটি নোয়াখালী ও
লক্ষ্মীপুর হয়ে মজুচৌধুরীর হাটে মেঘনায় গিয়ে পড়ে। দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭
কিলোমিটার, প্রস্থ এক সময় ১২৮ মিটার থাকলেও দখল ও পলি ভরাটে এখন তা
সংকুচিত। লক্ষ্মীপুর অংশে প্রায় ৪০ কিলোমিটার, এর মধ্যে পৌরসভার অংশ ৮
কিলোমিটার। বর্ষায় পানি নিষ্কাশন এবং বোরো মৌসুমে কৃষিকাজে
খালটির গুরুত্ব অপরিসীম।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌর বাজার, মাদাম, ঝুমুর, জকসিন, মান্দারী,
বটতলী ও চন্দ্রগঞ্জ বাজার অংশে খালের দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা এবং প্লাস্টিক সহ
বিভিন্ন বর্জ্যের স্তূপ। খাল পাড়ে যে যার মতো দখল করে দোকান ঘর, বাড়ী কিংবা
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অনেকেই তা চড়া দামে বিক্রী করে রমরমা বানিজ্যে
মেতে উঠেছে। খালটিকে সংকুচিত করে মরার উপর খরারগা করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টর
এসব দেখে ও না দেখার বান করে সুযোগ বুঝে কেউ কেউ সুবিধা হাতিয়ে
নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে খাল দখলে যোগ সাজশের
অভিযোগ রয়েছে।
খালে আশপাশের বাসিন্ধাদের দাবী, গত বছরের বন্যার শুরুতে খাল দিয়ে পানি
প্রবাহের চাপ গেলেও সংকুচিত ও বর্জ্য-পলি জমে ভরাট খালটি সেই চাপ নিতে
পারেনি। ফলে খালসংলগ্ন বসতবাড়ি, ফসলি জমি, পুকুর ও রাস্তাঘাট পানিতে
তলিয়ে যায়। বিশেষ করে চন্দ্রগঞ্জ, হাজিরপাড়া, মান্দারী, বাঙাখাঁ ও পৌর এলাকায়
ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। বন্যার ঠিক আগে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি

হয়। কারণ হিসেবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব, পলি জমে খাল ভরাট, দখল এবং নিচু ও
সরু কালভার্টকে দায়ী করে তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন্যার পানি।
অপরদিকে জেলা প্রশাসন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে জলাবদ্ধতা নিরসনে
ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে
অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় নয়টি সমস্যা চিহ্নিত করে ১০টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে- খাল দখলমুক্তকরণ, আবর্জনা পরিষ্কার, বাঁধ ও জাল অপসারণ,
পরিকল্পিত কালভার্ট নির্মাণ, স্লুইস গেট রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা
বাড়ানো। সে লক্ষ্যে জেলা জুড়ে দখল ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে উপজেলা
ও জেলা প্রশাসন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথার্থ ও কার্যকর নয় বলে দাবী
রয়েছে।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. জসীম উদ্দিনের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে
কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সভা হয়েছে। কচুরিপানা, জলজ উদ্ভিদ ও ময়লা
পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। অবৈধ দখলদার চিহ্নিতকরণে কমিটি গঠন করা
হয়েছে। রিপোর্টের ভিত্তিতে উচ্ছেদ অভিযান ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুরো
জেলায় খাল দখল-দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, রহমতখালী খালের অস্তিত্ব রক্ষা শুধু পরিবেশ নয়, এই অঞ্চলের
জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রশ্ন। দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামনে আরও
ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।