১১:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক পার্ক

  • নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য
  • নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড় কাটা
  • অন্তত ৫ হাজার গাছ কেটে পার্কটি স্থাপন
  • বন অধিদফতর থেকে নেয়া হয়নি কোনো প্রকার অনুমতি

বাঁশখালীতে পাহাড় কেটে প্রায় এক একর জায়গা জুড়ে স্থাপন করা হয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক পার্ক। বাঁশখালী পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের উত্তর জলদি এলাকায় স্থাপিত এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে আমানা পার্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড়ে থাকা অন্তত ৫ হাজার গাছ কেটে পার্কটি স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামশেদুল আলম বলেন, আমি বাঁশখালীতে আসার আগেই এটি তৈরি করা হয়েছে। পার্কটি সম্পর্কে আমি সদ্য অবগত হয়েছি। ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা হলেও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করলে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতির একটি ব্যাপার থাকে। আমি আরও খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, আমি বিষয়টি শুনেছি। জায়গা যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয় তবে এটি উপজেলা প্রশাসনের দেখার কথা। যদি বন বিভাগের জায়গা হয় সে ক্ষেত্রে বিষয়টি বন বিভাগ দেখবে।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জলদি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান শেখ বলেন, বন অধিদফতর থেকে কোনো প্রকার অনুমতি গ্রহণ করা হয়নি। ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্ষার পর জরিপ করে সীমানা চিহ্নিত করা হবে। সেখানে বন বিভাগের জায়গা থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে পার্কটির উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মুমিন বলেন, পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে আমি এই পার্ক স্থাপন করেছি। এটি আমার ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা। আমি গাছপালা ও পাহাড় কাটিনি। উপজেলা প্রশাসন কিংবা বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে এই স্থাপনা করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং কোনো ধরনের অনুমতিপত্রও দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট হাবীব আহসান বলেন, পাহাড় কেটে পার্ক তৈরি করা তো আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্থানীয় প্রশাসনকে হাইকোর্ট থেকেও নির্দেশ দেওয়া আছে পাহাড় ও গাছ কাটলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এরপরও যদি পাহাড় কাটা হয়, গাছ কাটা হয় তা হলে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হলো। এসব কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁশখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বনাঞ্চলের পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে লোকালয়ে হাতির আনাগোনা বেড়ে গেছে। অনেক প্রাণহানিরও ঘটনাও ঘটছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে বনাঞ্চলের পরিবেশ ধ্বংসের কার্যক্রম চলমান থাকলে সামনে আরও বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।
বাঁশখালী পৌরসভার মিয়ার বাজারের দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। মিয়ার বাজার থেকে দুর্গম পথ ধরে পৌঁছাতে হয় পার্কটিতে। বর্ষায় যাতায়াতের রাস্তা চলার অযোগ্য হয়ে ওঠায় দর্শনার্থী নেই বললেই চলে। হাতেগোনা যে কয়েকজন চোখে পড়ল তারা দম্পতি কিংবা জুটি বেঁধে আসা তরুণ-তরুণী। পার্কের প্রবেশ মুখেই টিকেট কাউন্টার। প্রতি টিকেটের প্রবেশমূল্য নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। টিলায় ওঠার জন্য দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। টিলার ওপরে বন্য পশুর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে ভাস্কর্য। দর্শনার্থীরা বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের আসন। আয়োজন বলতে এতটুকুই।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ওই স্থানে পাহাড় কেটে পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এক বছর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, চারপাশে বনাঞ্চলবেষ্টিত পার্কটির জায়গায় একসময় গাছ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারাও দাবি করেছেন, এই জায়গায় প্রায় ৫ হাজারের মতো বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালি ছিল। স্বাভাবিকভাবে এই পাহাড়ি টিলা বন বিভাগের জায়গা।
স্থানীয় কলেজছাত্র এনামুল হক বলেন, পার্কে ওঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের আনাগোনা বেশি। এ ছাড়া কিছু ইউটিউবার ও টিকটকার দেখা যায়। পার্ক হওয়ার মতো কিংবা অবলোকন করার মতো কিছুই তো নেই এখানে। শুধু শুধু টাকা নষ্ট আর পাহাড়ের পরিবেশ নষ্ট করার জন্য এটি করা হয়েছে। এমন একটা জায়গায় পার্ক করার অনুমতি কীভাবে পেল? পাহাড়ের মোহনীয়তা তো প্রকৃতির দান! এর বাইরে আর কিছু নেই।

জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক পার্ক

আপডেট সময় : ০৭:৩০:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ জুন ২০২৫
  • নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য
  • নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড় কাটা
  • অন্তত ৫ হাজার গাছ কেটে পার্কটি স্থাপন
  • বন অধিদফতর থেকে নেয়া হয়নি কোনো প্রকার অনুমতি

বাঁশখালীতে পাহাড় কেটে প্রায় এক একর জায়গা জুড়ে স্থাপন করা হয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক পার্ক। বাঁশখালী পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের উত্তর জলদি এলাকায় স্থাপিত এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে আমানা পার্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড়ে থাকা অন্তত ৫ হাজার গাছ কেটে পার্কটি স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামশেদুল আলম বলেন, আমি বাঁশখালীতে আসার আগেই এটি তৈরি করা হয়েছে। পার্কটি সম্পর্কে আমি সদ্য অবগত হয়েছি। ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা হলেও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করলে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতির একটি ব্যাপার থাকে। আমি আরও খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, আমি বিষয়টি শুনেছি। জায়গা যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয় তবে এটি উপজেলা প্রশাসনের দেখার কথা। যদি বন বিভাগের জায়গা হয় সে ক্ষেত্রে বিষয়টি বন বিভাগ দেখবে।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জলদি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান শেখ বলেন, বন অধিদফতর থেকে কোনো প্রকার অনুমতি গ্রহণ করা হয়নি। ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্ষার পর জরিপ করে সীমানা চিহ্নিত করা হবে। সেখানে বন বিভাগের জায়গা থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে পার্কটির উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মুমিন বলেন, পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে আমি এই পার্ক স্থাপন করেছি। এটি আমার ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা। আমি গাছপালা ও পাহাড় কাটিনি। উপজেলা প্রশাসন কিংবা বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে এই স্থাপনা করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং কোনো ধরনের অনুমতিপত্রও দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট হাবীব আহসান বলেন, পাহাড় কেটে পার্ক তৈরি করা তো আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্থানীয় প্রশাসনকে হাইকোর্ট থেকেও নির্দেশ দেওয়া আছে পাহাড় ও গাছ কাটলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এরপরও যদি পাহাড় কাটা হয়, গাছ কাটা হয় তা হলে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হলো। এসব কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁশখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বনাঞ্চলের পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে লোকালয়ে হাতির আনাগোনা বেড়ে গেছে। অনেক প্রাণহানিরও ঘটনাও ঘটছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে বনাঞ্চলের পরিবেশ ধ্বংসের কার্যক্রম চলমান থাকলে সামনে আরও বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।
বাঁশখালী পৌরসভার মিয়ার বাজারের দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। মিয়ার বাজার থেকে দুর্গম পথ ধরে পৌঁছাতে হয় পার্কটিতে। বর্ষায় যাতায়াতের রাস্তা চলার অযোগ্য হয়ে ওঠায় দর্শনার্থী নেই বললেই চলে। হাতেগোনা যে কয়েকজন চোখে পড়ল তারা দম্পতি কিংবা জুটি বেঁধে আসা তরুণ-তরুণী। পার্কের প্রবেশ মুখেই টিকেট কাউন্টার। প্রতি টিকেটের প্রবেশমূল্য নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। টিলায় ওঠার জন্য দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। টিলার ওপরে বন্য পশুর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে ভাস্কর্য। দর্শনার্থীরা বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের আসন। আয়োজন বলতে এতটুকুই।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ওই স্থানে পাহাড় কেটে পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এক বছর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, চারপাশে বনাঞ্চলবেষ্টিত পার্কটির জায়গায় একসময় গাছ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারাও দাবি করেছেন, এই জায়গায় প্রায় ৫ হাজারের মতো বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালি ছিল। স্বাভাবিকভাবে এই পাহাড়ি টিলা বন বিভাগের জায়গা।
স্থানীয় কলেজছাত্র এনামুল হক বলেন, পার্কে ওঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের আনাগোনা বেশি। এ ছাড়া কিছু ইউটিউবার ও টিকটকার দেখা যায়। পার্ক হওয়ার মতো কিংবা অবলোকন করার মতো কিছুই তো নেই এখানে। শুধু শুধু টাকা নষ্ট আর পাহাড়ের পরিবেশ নষ্ট করার জন্য এটি করা হয়েছে। এমন একটা জায়গায় পার্ক করার অনুমতি কীভাবে পেল? পাহাড়ের মোহনীয়তা তো প্রকৃতির দান! এর বাইরে আর কিছু নেই।