০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে ট্রেন চলাচল, পূর্বাঞ্চলেই ৫০৫টি

চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশ রেলওয়েতে যেসব রেলসেতু রয়েছে তার অধিকাংশই নির্মিত
হয়েছে ব্রিটিশ শাসন আমলে। এদের অনেকগুলোর আবার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বহু বছর
আগে। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ক্রমেই আরও বিপদজনক
হয়ে উঠছে। অবশ্য ঝুঁকি এড়াতে শতবর্ষী এসব সেতুতে অবলম্বন করা হচ্ছে বিভিন্ন
পন্থা। জোড়াতালি মেরামত কাজও হচ্ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলের
ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো পুনর্বাসনে পাঠানোর জন্য নতুন একটি প্রকল্প আশার আলো
দেখাচ্ছে। তবে তা বাস্তবায়ন হতে আরও সময় লেগে যেতে পারে আরও ৫ থেকে ৭
বছর।সূত্রমতে, রেলের পূর্বাঞ্চলের অর্থ্যাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ৯টি
সেকশনে (রুট) মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৫০৫টি। এর মধ্যে ৬টি
গুরুত্বপূর্ণ সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এছাড়া আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া বড়
সেতু রয়েছে ৪৮টি ও ছোট সেতু ৪৫১টি।ঝুঁকিপূর্ণ এসব সেতুতে ঢাকা-
সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার বড় দুর্ঘটনা
ঘটেছে। যার মধ্যে ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ-কুশিয়ারার মধ্যস্থলের
রেলসেতু ভেঙে দুই দিন ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। একই পথে ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ
মাধবপুরের ইটাখলা রেলসেতু ভেঙে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রেন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায়
সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ পাঁচ দিন বন্ধ ছিল।সংশ্লিষ্টরা জানান,
রেলের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়হীনতা, রেলপথ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ
না করা, আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে ট্রেন চালানো, দায়ী ব্যক্তিদের
বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেয়া, সংশ্লিষ্ট কারও তেমন কোনো জবাব দিহিতা না
থাকা এবং পদে পদে দুর্নীতির কারণেই মূলত গোটা রেলওয়েতে সৃষ্টি হয়েছে নাজুক
পরিস্থিতির।অবশ্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, রেল সেতুতে ঝুঁকি
এড়াতে নিয়মিত তদারক চলছে। স্লিপার-ফিটিংস সহ বিভিন্ন কাজও নিয়মিত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর ডিসেম্বরের দিকে সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া রেললাইনে
মোট ৫২টি সেতু স্লিপার ও ফিটিংসের কাজ করা হয়েছিল। ওই সময়ে ৫২ সেতুতে ৬৫
হাজার ক্লিপ লাগানো হয়েছিল। ক্লিপ চুরিরোধে ওয়েল্ডিং করে দেওয়া হয়েছিল এসব
ক্লিপ।রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবু জাফর মিঞা বলেন, রেল যাত্রা
নিরাপদ করতে বেশ কিছু প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে আমরা সংস্কারকাজ
অব্যাহত রেখেছি। তাছাড়া প্রতিনিয়ত পরিদর্শন অব্যহত আছে। সবমিলিয়ে রেল লাইন-
সেতু নিরাপদ রাখতে সব চেষ্টায় করছি।অন্যদিকে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া সেতুগুলোর
পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনে এবার দ্#ু৩৯;টি পৃথক প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। এর মধ্যে
মেজরগুলোর স্থলে গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। আর মাইনর সেতুগুলোর স্থলে নির্মাণ
করা হবে বক্স কালভার্ট। এজন্য পূর্বাঞ্চলের মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু পুনর্নির্মাণে ব্যয় ধরা
হয়েছে দুই হাজার ৫৮২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।পূর্বাঞ্চলে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলোর
মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে রয়েছে ১৬৪টি। এর মধ্যে ষোলশহর-

নাজিরহাট সেকশনে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া সেতু রয়েছে ৭৯টি। এ সেকশনটি
নির্মাণ করা হয়েছে ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে। অর্থাৎ ৯০ বছরের বেশি পুরোনো
এ সেকশনের সেতুগুলো। এর মধ্যে ৪টি মেজর ও ৭৫টি মাইনর সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ
অবস্থায় আছে।লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯০০ থেকে ১৯০৩
সালে। এ রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে মেজর সেতু ২টি ও মাইনর
৩৫টি। এছাড়া লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৯২ থেকে ১৮৯৫
সালে। এ সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৪৮টি। এর মধ্যে ৭টি মেজর ও ৪১টি
মাইনর।১০০ বছর বা তারও পুরোনো এসব সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও এগুলোর ওপর
দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া এসব সেতুর এক্সেল লোড ধরা আছে মাত্র ১১
দশমিক ৬ টন। তবে নতুন প্রকল্পে ২৫ টন এক্সেল লোড ধরে সেতুগুলোর ডিজাইন করা হবে
বলে জানা গেছে।বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মোঃ আফজাল হোসেন জানান, দুই
অঞ্চলে (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বেশকিছু রেল সেতু
পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বা চলমান আছে। বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলো
পুনর্নির্মাণে দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্প দুটি যাচাই-বাছাই
চলছে। এরপর প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর
যাবে পরিকল্পনা কমিশনে। তারপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে একনেকে (জাতীয়
অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে পাঁচ থেকে
সাত বছরের মধ্যে সেতুগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে ট্রেন চলাচল, পূর্বাঞ্চলেই ৫০৫টি

আপডেট সময় : ০৪:২৬:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫

চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশ রেলওয়েতে যেসব রেলসেতু রয়েছে তার অধিকাংশই নির্মিত
হয়েছে ব্রিটিশ শাসন আমলে। এদের অনেকগুলোর আবার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বহু বছর
আগে। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ক্রমেই আরও বিপদজনক
হয়ে উঠছে। অবশ্য ঝুঁকি এড়াতে শতবর্ষী এসব সেতুতে অবলম্বন করা হচ্ছে বিভিন্ন
পন্থা। জোড়াতালি মেরামত কাজও হচ্ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলের
ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো পুনর্বাসনে পাঠানোর জন্য নতুন একটি প্রকল্প আশার আলো
দেখাচ্ছে। তবে তা বাস্তবায়ন হতে আরও সময় লেগে যেতে পারে আরও ৫ থেকে ৭
বছর।সূত্রমতে, রেলের পূর্বাঞ্চলের অর্থ্যাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ৯টি
সেকশনে (রুট) মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৫০৫টি। এর মধ্যে ৬টি
গুরুত্বপূর্ণ সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এছাড়া আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া বড়
সেতু রয়েছে ৪৮টি ও ছোট সেতু ৪৫১টি।ঝুঁকিপূর্ণ এসব সেতুতে ঢাকা-
সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার বড় দুর্ঘটনা
ঘটেছে। যার মধ্যে ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ-কুশিয়ারার মধ্যস্থলের
রেলসেতু ভেঙে দুই দিন ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। একই পথে ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ
মাধবপুরের ইটাখলা রেলসেতু ভেঙে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রেন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায়
সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ পাঁচ দিন বন্ধ ছিল।সংশ্লিষ্টরা জানান,
রেলের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়হীনতা, রেলপথ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ
না করা, আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে ট্রেন চালানো, দায়ী ব্যক্তিদের
বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেয়া, সংশ্লিষ্ট কারও তেমন কোনো জবাব দিহিতা না
থাকা এবং পদে পদে দুর্নীতির কারণেই মূলত গোটা রেলওয়েতে সৃষ্টি হয়েছে নাজুক
পরিস্থিতির।অবশ্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, রেল সেতুতে ঝুঁকি
এড়াতে নিয়মিত তদারক চলছে। স্লিপার-ফিটিংস সহ বিভিন্ন কাজও নিয়মিত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর ডিসেম্বরের দিকে সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া রেললাইনে
মোট ৫২টি সেতু স্লিপার ও ফিটিংসের কাজ করা হয়েছিল। ওই সময়ে ৫২ সেতুতে ৬৫
হাজার ক্লিপ লাগানো হয়েছিল। ক্লিপ চুরিরোধে ওয়েল্ডিং করে দেওয়া হয়েছিল এসব
ক্লিপ।রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবু জাফর মিঞা বলেন, রেল যাত্রা
নিরাপদ করতে বেশ কিছু প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে আমরা সংস্কারকাজ
অব্যাহত রেখেছি। তাছাড়া প্রতিনিয়ত পরিদর্শন অব্যহত আছে। সবমিলিয়ে রেল লাইন-
সেতু নিরাপদ রাখতে সব চেষ্টায় করছি।অন্যদিকে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া সেতুগুলোর
পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনে এবার দ্#ু৩৯;টি পৃথক প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। এর মধ্যে
মেজরগুলোর স্থলে গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। আর মাইনর সেতুগুলোর স্থলে নির্মাণ
করা হবে বক্স কালভার্ট। এজন্য পূর্বাঞ্চলের মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু পুনর্নির্মাণে ব্যয় ধরা
হয়েছে দুই হাজার ৫৮২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।পূর্বাঞ্চলে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলোর
মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে রয়েছে ১৬৪টি। এর মধ্যে ষোলশহর-

নাজিরহাট সেকশনে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া সেতু রয়েছে ৭৯টি। এ সেকশনটি
নির্মাণ করা হয়েছে ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে। অর্থাৎ ৯০ বছরের বেশি পুরোনো
এ সেকশনের সেতুগুলো। এর মধ্যে ৪টি মেজর ও ৭৫টি মাইনর সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ
অবস্থায় আছে।লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯০০ থেকে ১৯০৩
সালে। এ রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে মেজর সেতু ২টি ও মাইনর
৩৫টি। এছাড়া লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৯২ থেকে ১৮৯৫
সালে। এ সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৪৮টি। এর মধ্যে ৭টি মেজর ও ৪১টি
মাইনর।১০০ বছর বা তারও পুরোনো এসব সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও এগুলোর ওপর
দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া এসব সেতুর এক্সেল লোড ধরা আছে মাত্র ১১
দশমিক ৬ টন। তবে নতুন প্রকল্পে ২৫ টন এক্সেল লোড ধরে সেতুগুলোর ডিজাইন করা হবে
বলে জানা গেছে।বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মোঃ আফজাল হোসেন জানান, দুই
অঞ্চলে (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বেশকিছু রেল সেতু
পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বা চলমান আছে। বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলো
পুনর্নির্মাণে দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্প দুটি যাচাই-বাছাই
চলছে। এরপর প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর
যাবে পরিকল্পনা কমিশনে। তারপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে একনেকে (জাতীয়
অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে পাঁচ থেকে
সাত বছরের মধ্যে সেতুগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হবে।