০৩:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংগীত ও শরীরচর্চার পদ আছে, ইসলাম শিক্ষার নেই কেন?

বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদে বলা
হয়েছে—“রাষ্ট্রের মূলনীতি হবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও
ধর্মনিরপেক্ষতা।” কিন্তু এর সাথে সাথেই ২(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ
আছে—“রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।” অর্থাৎ ইসলাম এ দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক
ভিত্তি।

প্রশ্ন হলো: সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য যখন আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি
করা হলো, তখন কেন ইসলাম শিক্ষার জন্য কোন মৌলভী শিক্ষক পদ রাখা হয়নি?

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি ও বাস্তবতা
শিক্ষা শুধু পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানবিকতা, নৈতিকতা ও
চরিত্র গঠনের প্রধান উপায়। প্রাথমিক স্তরে যদি শিশুরা সহীহভাবে কুরআন
পড়তে না শেখে, নামাজ-রোজার মৌলিক জ্ঞান না পায়, তবে ভবিষ্যতে তারা কীভাবে
ইসলামি মূল্যবোধে বেড়ে উঠবে?

বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি মানুষ (UNICEF, 2023) প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ের
সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা গেছে—প্রাথমিক
স্তরের প্রায় ৩৮% শিক্ষার্থী কুরআন সহীহভাবে পড়তে পারে না। এর প্রধান
কারণ, বিদ্যালয়ে আলাদা ধর্মীয় শিক্ষকের অভাব।

সংগীত-শরীরচর্চার পদ থাকলে ইসলাম শিক্ষায় কেন নয়?
সংগীত মননকে সমৃদ্ধ করে, শরীরচর্চা স্বাস্থ্য রক্ষা করে—এ বিষয়ে সন্দেহ
নেই। তাই এই বিষয়গুলোতে আলাদা শিক্ষক নিয়োগ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু
যখন তুলনা আসে, তখন ইসলাম শিক্ষার অবস্থা গভীর প্রশ্ন তোলে।

একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শিশুরা সংগীত ও শরীরচর্চার সুযোগ পাচ্ছে,
অথচ সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত বা ইসলামি নৈতিক শিক্ষা অর্জনের জন্য
প্রশিক্ষিত মৌলভি শিক্ষক পাচ্ছে না। এটি নীতি ও বাস্তবতার এক ধরনের
বৈপরীত্য।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ
ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশে প্রতিটি সরকারি স্কুলে আলাদা
ইসলামিক স্টাডিজ শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক।

মালয়েশিয়া: জাতীয় পাঠ্যক্রমে ইসলাম শিক্ষা পড়াতে হলে বিশেষ
সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ইসলামিক এডুকেশন শিক্ষক হতে হয়।

পাকিস্তান: প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি স্কুলে কোরআন শিক্ষা একজন আলাদা
ধর্মীয় শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হয়।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দাঁড়িয়ে ইসলামকে
রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছে, সেখানে কেন এখনো মৌলভী শিক্ষক পদ সৃষ্টিতে
অনীহা?

মৌলভী শিক্ষক নিয়োগের যৌক্তিকতা
১. সহীহ কুরআন শিক্ষা নিশ্চিতকরণ: একজন মৌলভি শিক্ষক থাকলে শিশু
বিদ্যালয়েই কুরআন তিলাওয়াত, কালেমা, ফরজ-ওয়াজিব ও মৌলিক ফিকহ শিখে নিতে
পারবে।
২. নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গঠন: ইসলাম শিক্ষা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং
সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার শিক্ষা।
৩. শিক্ষায় ভারসাম্য: বিজ্ঞান, সংগীত, শরীরচর্চা যতটা জরুরি, ইসলাম
শিক্ষাও ততটাই অপরিহার্য। একপেশে শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করতে পারে
না।
৪. আন্তঃধর্মীয় ভারসাম্য:  সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নিজ
ধর্ম শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান
শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক থাকতে পারে, তবে মুসলিম
শিশুদের জন্য মৌলভী শিক্ষক না থাকা বৈষম্যমূলক।

সংগীত ও শরীরচর্চার জন্য আলাদা শিক্ষক পদ থাকা প্রশংসনীয়। কিন্তু ইসলাম
শিক্ষার জন্য মৌলভী শিক্ষক পদ না থাকা শুধু এক ধরনের বৈপরীত্য নয়, বরং
প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার শামিল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
প্রজন্মকে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই? কেবল পেশাদার না, নাকি
নৈতিক, সৎ ও মানবিক নাগরিক? যদি দ্বিতীয়টিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তবে এখনই
সিদ্ধান্ত নিতে হবে—প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌলভি শিক্ষক নিয়োগ করতে
হবে।

আজকের শিশু আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক। যদি তারা সহীহ কুরআন শিক্ষা, মৌলিক
ইসলামি জ্ঞান ও নৈতিকতা অর্জন না করে, তবে ভবিষ্যতে সমাজ কেমন হবে—সেটি
আমাদের ভেবে দেখা উচিত। মৌলভী শিক্ষক পদ সৃষ্টি আর বিলম্ব নয়, এটি সময়ের
অপরিহার্য দাবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সংগীত ও শরীরচর্চার পদ আছে, ইসলাম শিক্ষার নেই কেন?

আপডেট সময় : ০১:৫১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদে বলা
হয়েছে—“রাষ্ট্রের মূলনীতি হবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও
ধর্মনিরপেক্ষতা।” কিন্তু এর সাথে সাথেই ২(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ
আছে—“রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।” অর্থাৎ ইসলাম এ দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক
ভিত্তি।

প্রশ্ন হলো: সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য যখন আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি
করা হলো, তখন কেন ইসলাম শিক্ষার জন্য কোন মৌলভী শিক্ষক পদ রাখা হয়নি?

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি ও বাস্তবতা
শিক্ষা শুধু পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানবিকতা, নৈতিকতা ও
চরিত্র গঠনের প্রধান উপায়। প্রাথমিক স্তরে যদি শিশুরা সহীহভাবে কুরআন
পড়তে না শেখে, নামাজ-রোজার মৌলিক জ্ঞান না পায়, তবে ভবিষ্যতে তারা কীভাবে
ইসলামি মূল্যবোধে বেড়ে উঠবে?

বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি মানুষ (UNICEF, 2023) প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ের
সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা গেছে—প্রাথমিক
স্তরের প্রায় ৩৮% শিক্ষার্থী কুরআন সহীহভাবে পড়তে পারে না। এর প্রধান
কারণ, বিদ্যালয়ে আলাদা ধর্মীয় শিক্ষকের অভাব।

সংগীত-শরীরচর্চার পদ থাকলে ইসলাম শিক্ষায় কেন নয়?
সংগীত মননকে সমৃদ্ধ করে, শরীরচর্চা স্বাস্থ্য রক্ষা করে—এ বিষয়ে সন্দেহ
নেই। তাই এই বিষয়গুলোতে আলাদা শিক্ষক নিয়োগ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু
যখন তুলনা আসে, তখন ইসলাম শিক্ষার অবস্থা গভীর প্রশ্ন তোলে।

একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শিশুরা সংগীত ও শরীরচর্চার সুযোগ পাচ্ছে,
অথচ সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত বা ইসলামি নৈতিক শিক্ষা অর্জনের জন্য
প্রশিক্ষিত মৌলভি শিক্ষক পাচ্ছে না। এটি নীতি ও বাস্তবতার এক ধরনের
বৈপরীত্য।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ
ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশে প্রতিটি সরকারি স্কুলে আলাদা
ইসলামিক স্টাডিজ শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক।

মালয়েশিয়া: জাতীয় পাঠ্যক্রমে ইসলাম শিক্ষা পড়াতে হলে বিশেষ
সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ইসলামিক এডুকেশন শিক্ষক হতে হয়।

পাকিস্তান: প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি স্কুলে কোরআন শিক্ষা একজন আলাদা
ধর্মীয় শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হয়।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দাঁড়িয়ে ইসলামকে
রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছে, সেখানে কেন এখনো মৌলভী শিক্ষক পদ সৃষ্টিতে
অনীহা?

মৌলভী শিক্ষক নিয়োগের যৌক্তিকতা
১. সহীহ কুরআন শিক্ষা নিশ্চিতকরণ: একজন মৌলভি শিক্ষক থাকলে শিশু
বিদ্যালয়েই কুরআন তিলাওয়াত, কালেমা, ফরজ-ওয়াজিব ও মৌলিক ফিকহ শিখে নিতে
পারবে।
২. নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গঠন: ইসলাম শিক্ষা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং
সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার শিক্ষা।
৩. শিক্ষায় ভারসাম্য: বিজ্ঞান, সংগীত, শরীরচর্চা যতটা জরুরি, ইসলাম
শিক্ষাও ততটাই অপরিহার্য। একপেশে শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করতে পারে
না।
৪. আন্তঃধর্মীয় ভারসাম্য:  সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নিজ
ধর্ম শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান
শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক থাকতে পারে, তবে মুসলিম
শিশুদের জন্য মৌলভী শিক্ষক না থাকা বৈষম্যমূলক।

সংগীত ও শরীরচর্চার জন্য আলাদা শিক্ষক পদ থাকা প্রশংসনীয়। কিন্তু ইসলাম
শিক্ষার জন্য মৌলভী শিক্ষক পদ না থাকা শুধু এক ধরনের বৈপরীত্য নয়, বরং
প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার শামিল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
প্রজন্মকে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই? কেবল পেশাদার না, নাকি
নৈতিক, সৎ ও মানবিক নাগরিক? যদি দ্বিতীয়টিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তবে এখনই
সিদ্ধান্ত নিতে হবে—প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌলভি শিক্ষক নিয়োগ করতে
হবে।

আজকের শিশু আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক। যদি তারা সহীহ কুরআন শিক্ষা, মৌলিক
ইসলামি জ্ঞান ও নৈতিকতা অর্জন না করে, তবে ভবিষ্যতে সমাজ কেমন হবে—সেটি
আমাদের ভেবে দেখা উচিত। মৌলভী শিক্ষক পদ সৃষ্টি আর বিলম্ব নয়, এটি সময়ের
অপরিহার্য দাবি।