নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশি কূটনীতিককেন্দ্রিক তৎপরতা
কমিশনে গেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশকটি দেশের মিশন প্রধানরা
নিয়মিত বৈঠক করছেন বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গেও
অভ্যন্তরীন ইস্যুতে বিদেশের আগ্রহ ভালোভাবে নেয় না পশ্চিমারা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে চলছে বিদেশিদের দৌড়ঝাঁপ। রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশি কূটনীতিককেন্দ্রিক তৎপরতার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, এতে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়বে না কমবে। তারা বলেন, আমাদের গণতন্ত্র এবং নির্বাচন নিয়ে ঘাটতির যে জায়গায় তৈরি হয়েছে, বিদেশি কূটনীতিকরা এর সুযোগ নিচ্ছে। এই ঘাটতির জায়গাটা মূলত তৈরি করে দেন রাজনীতিবিদরাই।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিকভাবেও তৎপরতা বাড়িয়েছে বিএনপি। নির্বাচন, সংস্কারসহ নানা বিষয়ে দলীয় অবস্থান কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে বিএনপি’র তরফে। একইসঙ্গে এসব বিষয়ে বিএনপি’র দলীয় অবস্থান জানতে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে বিএনপি’র সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনা করা হচ্ছে। দলীয় সূত্রের দাবি সার্বিক বিষয়ে যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোচ্ছে তা দেশের মানুষের পাশাপাশি বিশ্ববাসীকে জানাতে চায় বিএনপি। বিভিন্ন দেশ ও কূটনীতিক পক্ষ থেকে যোগাযোগের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নেতারা।
দলীয় সূত্র জানায়, আগামীতে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিএনপি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে এবং করে যাচ্ছে বলে কূটনৈতিক বৈঠকগুলোতে জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বিএনপি রাষ্ট্র ও সরকার কাঠামোর সংস্কারে বদ্ধপরিকর বলেও জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে বলা হচ্ছে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে এই নীতি এবং অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।
লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কূটনৈতিক, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বৈঠক করছেন। সম্প্রতি লন্ডনে একটি অভিজাত হোটেলে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে দু’দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও বিএনপি’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রসঙ্গে জানতে চান রাষ্ট্রদূত। ওদিকে গত প্রায় এক বছরে বাংলাদেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আমেরিকা, ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং সৌদি আরবসহ ১৫টি দেশের কূটনৈতিকরা বৈঠক করেছেন। পৃথক বৈঠকে জাতীয় নির্বাচন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ৫ আগস্টের পর থেকে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ব্যবসায়ীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিএনপি’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নির্বাচন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। বৈঠকের শুরুতে তারেক রহমান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত কুশল বিনিময় করেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের উন্নয়নে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। এ ছাড়া বৈঠকে লন্ডনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায় বলেও সূত্রটি জানায়। এসব বৈঠকে তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বিএনপি বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করছে। বাংলাদেশের কূটনীতির যে মূলধারা, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল বিদায়ের পর বিএনপি প্রথম ডান-বাম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বিবেচনায় আগামীতেও আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাবো।
সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তাদের কাজের অংশ। ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। এরইমধ্যে কমিশনে গেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশকটি দেশের মিশন প্রধানরা। নিয়মিত বৈঠক করছেন বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গেও। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচন এলে বাংলাদেশে এমন দৃশ্য পুরনো। কিন্তু, গণঅভ্যুত্থানের পরও রাজনীতিতে এসব ঘটনা দুঃখজনক। আন্তর্জাতিক সর্ম্পক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এ দৌড়ঝাঁপ এখন না করে আপনার বরং অপেক্ষা করুন। নির্বাচন যখন হবে, নির্বাচিত সরকারের সাথে স্বাভাবিকভাবেই আপনারা তখন বসতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য, তাদের অভ্যন্তরীন ইস্যুতে বিদেশের আগ্রহ ভালোভাবে নেয় না পশ্চিমারা। কিন্তু বাংলাদেশে তাদেরই সেই সুযোগ করে দেন রাজনীতিবিদরা।
























