বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ডাউকি ও মধুপুরের মতো সক্রিয় ফল্ট লাইনগুলো ঢাকাসহ সারা দেশের জন্য বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করছে। এই জীবনঘাতী ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ও অত্যাধুনিক ‘স্মার্ট আর্থকোয়েক আর্লি ওয়ার্নিং ডিভাইস’ উদ্ভাবন করেছেন তরুণ গবেষক মো. ইব্রাহিম মোল্লা।
ইব্রাহিম মোল্লা বর্তমানে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি (DIIT), ঢাকার একজন শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানটির আরঅ্যান্ডডি (R&D) বিভাগের ইন-চার্জ হিসেবে কর্মরত। এর আগে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP)-এর জন্য বহুল আলোচিত ‘বাজারদর অ্যাপ’ (Bazardor App) তৈরি করে তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। এবার তিনি সার্কিট ডিজাইন থেকে শুরু করে ফিনিশিং পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করেছেন এই ভূমিকম্প সতর্কীকরণ যন্ত্র।
যেভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি
ইব্রাহিম মোল্লার উদ্ভাবিত এই ডিভাইসটি মূলত ভূমিকম্পের তরঙ্গের গতির পার্থক্যকে কাজে লাগায়। ভূমিকম্পের সময় মাটি দিয়ে দুই ধরনের তরঙ্গ প্রবাহিত হয়:
পি-ওয়েভ (P-wave): এর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬.০ কিমি (6.0km/s)। এটি কোনো ক্ষতি করে না কিন্তু আগাম সংকেত দেয়।
এস-ওয়েভ (S-wave): এর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩.৫ কিমি (3.5km/s)। এটিই ঘরবাড়ি ধ্বংসের মূল কারণ।
ডিভাইসটি প্রাথমিক পি-ওয়েভ শনাক্ত করার সাথে সাথে টানা ৩০ সেকেন্ড উচ্চশব্দে সাইরেন বাজাতে শুরু করে। ফলে ধ্বংসাত্মক এস-ওয়েভ আসার আগেই মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মূল্যবান সময় পায়।
ফল্ট লাইন ও সতর্ক বার্তার সময়
ইব্রাহিম মোল্লার দেওয়া গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উৎসস্থল ঢাকা থেকে যত দূরে হবে, মানুষ তত বেশি সময় পাবে:
(ঢাকা থেকে দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে আগাম সতর্ক সময়)
📍 মধুপুর ফল্ট: (৫০ কিমি) -> সতর্ক সময়: ৬ সেকেন্ড
📍 ডাউকি ফল্ট: (১৬০ কিমি) -> সতর্ক সময়: ১৯ সেকেন্ড
📍 ইন্দো-বার্মা ফল্ট: (২০০ কিমি) -> সতর্ক সময়: ২৪ সেকেন্ড
📍 গ্রেট হিমালয়ান ফল্ট: (৭৫৬ কিমি) -> সতর্ক সময়: ৯০ সেকেন্ড (দেড় মিনিট)
হিমালয় অঞ্চলে বড় কোনো কম্পন হলে এই ডিভাইসটি ঢাকায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের প্রায় দেড় মিনিট (৯০ সেকেন্ড) আগে সতর্ক করতে সক্ষম, যা দুর্যোগ মোকাবিলায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
বিশ্ববাজারের তুলনায় অবিশ্বাস্য সাশ্রয়ী
জাপান বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের আর্লি ওয়ার্নিং ডিভাইসের দাম প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত (সূত্র: https://www.ebay.com/itm/387310554607 )। কিন্তু ইব্রাহিম মোল্লা এই প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছেন। তার উদ্ভাবিত এই ডিভাইসের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩,৫০০ টাকা—যা একটি সাধারণ গৃহস্থালি টেবিল ফ্যানের দামের চেয়েও কম।
বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ:
সম্পূর্ণ অফলাইন: ইন্টারনেট বা ওয়াইফাই ছাড়াই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে।
ভুল সংকেত মুক্ত: উন্নত ডিজিটাল প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে এটি সাধারণ যানবাহনের কম্পন এবং আসল ভূমিকম্পের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
টানা সাইরেন: ভূমিকম্প শনাক্ত হওয়া মাত্রই এটি ৩০ সেকেন্ড বিরতিহীন সাইরেন বাজায়, যা গভীর ঘুমে থাকা ব্যক্তি বা শিশুদের জাগিয়ে তুলতে কার্যকর।
উদ্ভাবকের বক্তব্য
উদ্ভাবক মো. ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এই জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তিকে প্রতিটি ঘরে, স্কুলে এবং হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় যদি মানুষ কয়েক সেকেন্ড সময়ও পায়, তবে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। সাশ্রয়ী মূল্য এবং ইন্টারনেট-হীন কার্যকারিতাই এই ডিভাইসটির মূল শক্তি।”
এই শিক্ষার্থীর এমন উদ্ভাবন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

























