ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের নামে থাকা ৫৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ৬৫ লাখ ৫০ হাজার ২৪৬ টাকা। সিআইডি পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল লতিফ আদালতে এসব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদসহ তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।
সিআইডির অনুসন্ধানকালে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা এসব ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে এসব লেনদেনের উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খুন, সন্ত্রাস, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থ জোগান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অপরাধ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫) অনুযায়ী সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ অবস্থায় আইনটির ১৪ ধারার বিধান অনুযায়ী হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করা এবং ১৭(২) ধারার বিধান অনুযায়ী হিসাবসমূহে থাকা অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই এসব অর্থ বেহাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সিআইডি উল্লেখ করেছে।
এদিকে শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিসহ মোট ১৭ জনকে আসামি করে মঙ্গলবার অভিযোগপত্র দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এ মামলায় বর্তমানে ১১ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী মুফতি মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, সহযোগী মো. কবির, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম, কাউন্সিলর বাপ্পির বোনজামাই আমিনুল ইসলাম রাজু এবং সিপুর ঘনিষ্ঠ মো. ফয়সাল (ফয়সাল করিম মাসুদ নন)।
অন্যদিকে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ, তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ, ফয়সালের বোন জেসমিন ও তার স্বামী মুফতি মাহমুদ এখনও পলাতক রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির পরিকল্পনাতেই শরীফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে হাদি সোচ্চার ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া শরীফ ওসমান বিন হাদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগের সময় তিনি হামলার শিকার হন। চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে একই রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর খবর আসে।
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা যুক্ত করা হয়। ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাকে সহায়তাকারী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করার কথা জানায় পুলিশ।
প্রথমদিকে তাদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না দিলেও গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ফয়সাল করিম মাসুদ ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন। মামলাটি ঘিরে হত্যা ও অর্থপাচার—দুই দিক থেকেই তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এমআর/সবা


























