১১:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী, চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ

  • সবুজ বাংলা
  • আপডেট সময় : ১০:১৯:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 20

ছবি: পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন

বিএনপির নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়ি মন্ত্রীর সঙ্গে একজন অপাহাড়িকে প্রতিমন্ত্রী করার ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৮ বছর আগে মন্ত্রণালয়টি গঠনের পর নির্বাচিত সরকারের আমলে এই প্রথম এমন নিয়োগ হলো। চুক্তিকারী দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর নেতারা একে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান। তিনি চাকমা জাতিসত্তার প্রতিনিধি। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচিত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে, যিনি পাহাড়ি নন এবং পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দাও নন।

এর আগে নির্বাচিত সরকারের আমলে এ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা সবাই পাহাড়ি ছিলেন এবং একসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের নজির ছিল না।

চুক্তিতে যা বলা আছে

১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে জেএসএসের স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই এ মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, “উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।”

প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে চুক্তিতে সরাসরি কিছু উল্লেখ নেই। তবে অতীতে যারা প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা সবাই পাহাড়ি জাতিসত্তার ছিলেন।

চুক্তির আওতায় গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ-এর চেয়ারম্যান বর্তমানে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। তিনি চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারীও ছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান অবশ্যই ‘উপজাতীয়’ হতে হবে।

অতীতে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন

১৯৯৮ সালে মন্ত্রণালয় গঠনের পর প্রথম মন্ত্রী হন কল্পরঞ্জন চাকমা। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় উপমন্ত্রী ছিলেন মনি স্বপন দেওয়ান।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রতিমন্ত্রী হন দীপংকর তালুকদার। পরে বান্দরবান থেকে নির্বাচিত বীর বাহাদুর উশৈসিং প্রতিমন্ত্রী ও পরে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর প্রতিমন্ত্রী হন কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন সুপ্রদীপ চাকমা।

‘চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’

জেএসএস নেতা ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা বলেন, “এ উদ্যোগ পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো সরকারের আমলেই এমন হয়নি। এটি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”

বিশ্লেষকেরাও একই মত দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, পার্বত্য চুক্তির ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। এখন যেভাবে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার কোনো নজির নেই। এটি চুক্তির ব্যত্যয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আমেনা মোহসীনও বলেন, প্রতিমন্ত্রীও পার্বত্যাঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত ছিল।

রাঙামাটির এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই মন্ত্রিসভার সদস্য। সে বিবেচনায় দুজনই পাহাড়ি হওয়া উচিত ছিল। এখানে আইনের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, “এটা আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়। পরে জানাব।”

শু/সবা

সূত্র: প্রথম আলো

জনপ্রিয় সংবাদ

বাকৃবির সেরা ১০ গবেষকের সঙ্গে আইকিউএসি’র মতবিনিময় ও সংবর্ধনা

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী, চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ

আপডেট সময় : ১০:১৯:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিএনপির নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পাহাড়ি মন্ত্রীর সঙ্গে একজন অপাহাড়িকে প্রতিমন্ত্রী করার ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৮ বছর আগে মন্ত্রণালয়টি গঠনের পর নির্বাচিত সরকারের আমলে এই প্রথম এমন নিয়োগ হলো। চুক্তিকারী দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর নেতারা একে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান। তিনি চাকমা জাতিসত্তার প্রতিনিধি। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচিত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে, যিনি পাহাড়ি নন এবং পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দাও নন।

এর আগে নির্বাচিত সরকারের আমলে এ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা সবাই পাহাড়ি ছিলেন এবং একসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের নজির ছিল না।

চুক্তিতে যা বলা আছে

১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে জেএসএসের স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই এ মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, “উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।”

প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে চুক্তিতে সরাসরি কিছু উল্লেখ নেই। তবে অতীতে যারা প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা সবাই পাহাড়ি জাতিসত্তার ছিলেন।

চুক্তির আওতায় গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ-এর চেয়ারম্যান বর্তমানে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। তিনি চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারীও ছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান অবশ্যই ‘উপজাতীয়’ হতে হবে।

অতীতে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন

১৯৯৮ সালে মন্ত্রণালয় গঠনের পর প্রথম মন্ত্রী হন কল্পরঞ্জন চাকমা। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় উপমন্ত্রী ছিলেন মনি স্বপন দেওয়ান।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রতিমন্ত্রী হন দীপংকর তালুকদার। পরে বান্দরবান থেকে নির্বাচিত বীর বাহাদুর উশৈসিং প্রতিমন্ত্রী ও পরে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর প্রতিমন্ত্রী হন কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন সুপ্রদীপ চাকমা।

‘চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’

জেএসএস নেতা ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা বলেন, “এ উদ্যোগ পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো সরকারের আমলেই এমন হয়নি। এটি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”

বিশ্লেষকেরাও একই মত দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, পার্বত্য চুক্তির ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। এখন যেভাবে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার কোনো নজির নেই। এটি চুক্তির ব্যত্যয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আমেনা মোহসীনও বলেন, প্রতিমন্ত্রীও পার্বত্যাঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত ছিল।

রাঙামাটির এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই মন্ত্রিসভার সদস্য। সে বিবেচনায় দুজনই পাহাড়ি হওয়া উচিত ছিল। এখানে আইনের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, “এটা আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়। পরে জানাব।”

শু/সবা

সূত্র: প্রথম আলো