সকালের নরম রোদ উঠতেই রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভিড় জমতে শুরু করে। তবে এদিনের দৃশ্য ছিল একটু আলাদা—কেন্দ্রজুড়ে ছিল তরুণদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস যেন কেন্দ্রগুলোকে রূপ দেয় এক অনন্য উৎসবে। কারও হাতে জাতীয় পতাকার ব্যাজ, কারও চোখে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সেলফিতে ব্যস্ত, কেউ আবার পরিবারের হাত ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে—সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের এক প্রাণবন্ত সকাল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্জিতা রাজধানীর রামপুরার উলন খালেদ হায়দার মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। স্কুল শিক্ষক মা জয়া শহীদকে সঙ্গে নিয়েই ভোটকেন্দ্রে আসেন তিনি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে অর্জিতার চোখেমুখে ছিল উচ্ছ্বাসের ঝলক। তিনি বলেন, “প্রথম ভোট দিতে পারায় এক্সাইটমেন্টের সীমা নেই। মনে হচ্ছে বড় হয়ে যাওয়ার একটা স্বীকৃতি পেলাম। আশা করি, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। যারা নির্বাচিত হবেন, তারা জনগণের জন্য কাজ করবেন।”
মা জয়া শহীদ হাসিমুখে জানান, “মেয়েটি এক সপ্তাহ ধরে শুধু দিন গুনছিল—কখন ভোট দেবে! আজ নিজের ভোট নিজে দিতে পেরে সে দারুণ খুশি। নতুন প্রজন্মকে দেখে মনে হচ্ছে, তাদের কাছে এই দিনটা ঈদের চেয়েও আনন্দের।”

রামপুরা একরামুননেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রেও ছিল একই চিত্র। রাজশাহী বিদ্যাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্যা তাবাসসুম মা ও চাচীর সঙ্গে ভোট দিতে আসেন। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বলেন, “অনুভূতি অনেক ভালো। ঈদের মতো আনন্দ লাগছে। মনে হচ্ছে দেশের জন্য ছোট্ট হলেও একটা দায়িত্ব পালন করলাম।”
ব্রাইট স্টার মডেল স্কুল কেন্দ্রে দেখা যায় একরামুলকে। আগেই ভোটার হলেও এবারই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পান তিনি। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, “আগে সুযোগ হয়নি। এবার নিজের ভোট নিজে দিতে পারলাম—এটাই বড় কথা। পরিবেশ শান্তিপূর্ণ, খুব ভালো লাগছে।”
বাড্ডা আলাতুন্নেসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক আবেগঘন দৃশ্য। শিশু পুত্রকে কোলে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন লায়লা বেগম। প্রথমবার ভোট দিতে এসে তিনি বলেন, “ছেলেকে নিয়ে এসেছি যেন বড় হয়ে সে-ও বুঝতে পারে ভোট দেওয়া কত গুরুত্বপূর্ণ।” একই কেন্দ্রে প্রথম ভোট দিয়ে কানিজ ফাতেমা বলেন, “আজ মনে হচ্ছে দেশের একজন পূর্ণ নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলাম।”

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীজুড়ে এবার প্রায় দুই লক্ষ নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। সকাল থেকেই অনেক কেন্দ্রে তরুণদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণী ভোটারদের উপস্থিতি নারীর অংশগ্রহণকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কেন্দ্রগুলোতে আলাদা প্রাণ এনে দিয়েছে। তাদের উচ্ছ্বাস বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটারদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। অনেক কেন্দ্রে প্রথম ভোটদাতাদের জন্য স্বেচ্ছাসেবকরা আলাদা সহায়তাও প্রদান করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও সুদৃঢ় করবে। তরুণদের মধ্যে যে দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রচিন্তায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রথম ভোটের উচ্ছ্বাস কেবল একটি দিনের আবেগ নয়—এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। প্রতিটি ভোট যেন নতুন আস্থার প্রতীক, প্রতিটি হাসিমুখ যেন বলে দিচ্ছে—তরুণ প্রজন্ম প্রস্তুত, তারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে সক্রিয় অংশীদার হতে চায়। ভোটকেন্দ্রগুলো তাই শুধু ভোট দেওয়ার স্থান নয়, হয়ে উঠেছে গণতন্ত্রের এক প্রাণের উৎসব।
শু/সবা
























