মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকেও রাষ্ট্রীয় ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) ও মায়ের ডাক যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
মির্জা ফখরুল বলেন, “যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে কেন ভাতা দেওয়া হবে না? অবশ্যই ভাতা দিতে হবে এবং আমরা এই বাজেটেই তার ব্যবস্থা করব।”
তিনি বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনোই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে, সাহস জোগাতে পারে এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
গুমের ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অপরাধের প্রকাশ্য বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে রাজনৈতিক ইস্যু না বানিয়ে সম্মিলিতভাবে বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা বিচার চাই, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে চাই এবং তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে চাই।”
গুম হওয়া বাবার জন্য বিচার চাইলেন লামিয়া
সংলাপে আবেগঘন বক্তব্য দেন ২০১৩ সালে গুম হওয়া চালক কাওসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম। তিনি বলেন, তিন বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন, আজও জানেন না তিনি জীবিত নাকি মৃত।
তিনি বলেন, “আমার বাবার কোনো কবরও নেই, যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারব—এটা আমার বাবার কবর। আমার কাছে আছে শুধু বাবার একটি ছবি। আমি শুধু বিচার চাই।”
আয়নাঘর পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লামিয়া বলেন, সেখানে থাকা ছোট ছোট ‘কবর সেল’-এর অবস্থা দেখে তিনি উপলব্ধি করেছেন, তাঁর বাবা ও অন্য গুম হওয়া ব্যক্তিরা কী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
গুমের শিকার পরিবারকে সহায়তার দাবি
সংলাপে বক্তব্য দেন গুমের শিকার ও বর্তমানে সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম। তিনি বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনো পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে তাদের অন্তত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি সরকারের কাছে তিনটি দাবি তুলে ধরেন—
- গুমের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার,
- ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা,
- ভবিষ্যতে গুম রোধে কার্যকর আইন ও ব্যবস্থা গ্রহণ।
তিনি আরও বলেন, “বাংলার মাটিতে আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেওয়া হবে না।”
ডিএনএ পরীক্ষা করে গুমের রহস্য উদঘাটনের দাবি
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, অতীতে বুড়িগঙ্গা হয়ে মুন্সীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত লাশগুলোর সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনার সঙ্গে এখনো নিখোঁজ গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা উচিত।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলামসহ মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও গুম-নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যরা।
সবুজ বাংলা অনলাইন 























