9:57 pm, Saturday, 4 July 2026

জুলাই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার ও শহীদ পরিবারগুলোর সহায়তা চাইলেন স্বজনরা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার ছাড়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শহীদ জুলাই পরিবারের সদস্যরা। তারা বলেছেন, বিচারের দাবিতে আন্দোলন করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। একই সঙ্গে একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এসব দাবি তুলে ধরেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধারা। ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জুলাই এলেই তাদের চোখের পানির বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং এ হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো হয়নি। তিনি সব জুলাই শহীদের হত্যার বিচার দাবি করেন।

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তার সন্তানকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, তবে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি না হয়, সে জন্য দোষীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তার ভাইয়ের আত্মত্যাগ অনেককে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক শহীদ পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এসব পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা এবং জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, বড় ছেলেকে হারানোর পর ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে। সে সময় নানা জায়গায় গিয়েও সহায়তা পাননি। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা পাশে ছিলেন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদেশ থেকে তাদের খোঁজ নিয়েছিলেন। তিনি সব শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, দুই বছর পার হলেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্বে থাকায় এখন বিচার নিশ্চিত হবে।

দুই পা হারানো জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, নিজের অঙ্গ হারানোর কষ্টের চেয়েও বড় বিষয় হলো শহীদদের হত্যার বিচার দেখা। তিনি সবাইকে সরকারের পাশে থেকে বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

আহত জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা পাননি। পরে তার বাবা মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিনি বলেন, তারা শুধু জুলাই নয়, গত ১৭ বছরের আন্দোলনেরও যোদ্ধা এবং সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চান।

আহত সুজন মোল্লা বলেন, এক দফা আন্দোলনের সফলতার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন হলেও শহীদদের হত্যার বিচার এখনো হয়নি। তিনি দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান।

আহত আলামিন বলেন, হাত হারানোর পরও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তার মতো অনেক আহত যোদ্ধার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক আহত যোদ্ধা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, জাতীয় সংগীত এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

শু/সবা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

five × 2 =

About Author Information

Popular Post

যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

জুলাই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার ও শহীদ পরিবারগুলোর সহায়তা চাইলেন স্বজনরা

Update Time : ০৪:১৬:৩৬ pm, Saturday, ৪ জুলাই ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার ছাড়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শহীদ জুলাই পরিবারের সদস্যরা। তারা বলেছেন, বিচারের দাবিতে আন্দোলন করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। একই সঙ্গে একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এসব দাবি তুলে ধরেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধারা। ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জুলাই এলেই তাদের চোখের পানির বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং এ হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো হয়নি। তিনি সব জুলাই শহীদের হত্যার বিচার দাবি করেন।

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তার সন্তানকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, তবে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি না হয়, সে জন্য দোষীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তার ভাইয়ের আত্মত্যাগ অনেককে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক শহীদ পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এসব পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা এবং জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, বড় ছেলেকে হারানোর পর ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে। সে সময় নানা জায়গায় গিয়েও সহায়তা পাননি। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা পাশে ছিলেন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদেশ থেকে তাদের খোঁজ নিয়েছিলেন। তিনি সব শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, দুই বছর পার হলেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্বে থাকায় এখন বিচার নিশ্চিত হবে।

দুই পা হারানো জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, নিজের অঙ্গ হারানোর কষ্টের চেয়েও বড় বিষয় হলো শহীদদের হত্যার বিচার দেখা। তিনি সবাইকে সরকারের পাশে থেকে বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

আহত জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা পাননি। পরে তার বাবা মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিনি বলেন, তারা শুধু জুলাই নয়, গত ১৭ বছরের আন্দোলনেরও যোদ্ধা এবং সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চান।

আহত সুজন মোল্লা বলেন, এক দফা আন্দোলনের সফলতার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন হলেও শহীদদের হত্যার বিচার এখনো হয়নি। তিনি দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান।

আহত আলামিন বলেন, হাত হারানোর পরও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তার মতো অনেক আহত যোদ্ধার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক আহত যোদ্ধা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, জাতীয় সংগীত এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

শু/সবা