➢ মানা হচ্ছে না সড়ক খনন নীতিমালা
➢ দীর্ঘ দিনেও শেষ হয় না নির্মাণকাজ
➢ বৃষ্টি মৌসুমে জনভোগান্তি বাড়ার শঙ্কা
রাজধানীর ইত্তেফাক মোড়ে প্রায় আধাঘণ্টা ধরে যানজটে বসে ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা সাইদুর রহমান। ইত্তেফাক মোড় থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক সংযোগ বসানোর কাজের জন্য রাস্তা খুঁড়েছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। ফলে প্রতিদিনই যানজটে ভুগতে হচ্ছে সড়কটিতে যাতায়াতকারীদের। ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইদুর রহমান বলেন, কিছুদিন যেতে না যেতেই রাজধানীর সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা। আর দুর্ভোগে পড়তে হয় আমাদের মতো কর্মজীবী মানুষকে। কয়েক মাস আগেও এ সড়কটি খোঁড়া হয়েছে। আবার নতুন করে খুঁড়ল।
মতিঝিলের গুরত্বপূর্ণ সড়কটি ছাড়াও রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় চলছে বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি। টিকাটুলী, মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি কলোনি, কমলাপুর, সেগুনবাগিচা, মালিবাগ, বাসাবো, মিরপুরের কাজীপাঢ়া থেকে ৬০ ফিট সংযোগ সড়ক, মণিপুর, মোহাম্মদপুর, নয়াবাজারে রাস্তা কাটাকাটি ও খোঁড়াখুঁড়ির কাজ এখনও চলছে। এসব কাজে উপেক্ষিত ‘সড়ক খনন নীতিমালা ২০১৯’। দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে যার সুবিধামত খোঁড়াখুঁড়ি করছে। নীতিমালাতে মে থেকে সেপ্টম্বর বর্ষা মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না উল্লেখ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। শুধু এবারই নয় প্রতি বছরই বৃষ্টি মৌসুমে এমন খোঁড়াখুঁড়িতে বাড়ে জনদুর্ভোগ।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার শতাধিক স্থানে খোঁড়াখুঁড়ির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের অন্তত ১৩টি সংস্থা সড়ক খননের অনুমতি নিয়েছে। এসব কাজের অনেকগুলো এখনো চলমান। পাশাপাশি দুই সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন এলাকার সড়কে উন্নয়নকাজ করছে।

কাজ চলামান সড়কগুলোতে দেখা যায়, কোথাও ঢাকা ওয়াসার, কোথাও-বা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের কাজ, আবার কিছু সড়কে চলছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে নগর কর্তৃপক্ষের কাজ। এসব সড়কে যানবাহন যাতে গর্তে না পড়ে সেজন্য রাস্তার পাশে দেওয়া হয়েছে সর্তকতা মূলক ফিতা। শ্রমিকরা সেখানে পাইপ বসাচ্ছেন। আবার কোথাও কোথাও সড়কের উপরেই রাখা হয়েছে সুয়ারেজ পাইপ। যত্রতত্র রাখা পাইপ-বালু-ইট-সুরকি। খোঁড়াখুঁড়িতে অর্ধেক সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়া যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। মোড়গুলোতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। ফুটপাত দিয়েও চলাচল করা কষ্টকর। বিশেষ করে তাপপ্রবাহের দিনগুলোতে মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে।
নীতিমালাতে উল্লেখ রয়েছে, রাজধানীতে দিনে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। বর্ষা মৌসুমেও (১ মে থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর) সড়ক কাটাকাটি করা যাবে না। তবে জরুরি প্রয়োজনে খনন করতে হলে ক্ষতিপূরণসহ ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত ফি দিতে হবে। আর কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে খননকাজ শুরু করলে জরিমানা গুনতে হবে মূল খরচের পাঁচগুণ।

নীতিমালায় আরও বলা হয়, রাস্তা খোঁড়ার কাজ মাসের পর মাস ফেলে রাখা যাবে না। রাতে খননের পর রাতেই যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। আগের মতো উপযুক্ত ও ঝকঝকে-তকতকে করে রাস্তাটি তৈরি করতে হবে, যেন বোঝার উপায় না থাকে রাস্তাটি কাটাকাটি হয়েছে। আর যুক্তিসংগত কারণে কাজ শেষ করতে না পারলে কমপক্ষে পাঁচ দিন আগে সিটি করপোরেশনের ওয়ান স্টপ সেলকে জানাতে হবে।
এছাড়াও নীতিমালায় বলা হয়েছে, মাইকিং করে এলাকার মানুষকে খননকাজ সম্পর্কে জানাতে হবে। আগেই সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। পাশাপাশি সাইনবোর্ডে খননকাজ ও ঠিকাদার সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে হবে।
নীতিমালার কোনো অংশই মানছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজ শুরুর আগে কোনোরকম প্রচারণাই চালানো হয় না। আবার কোথাও কোথাও লাগানো হয়নি সর্তকতামূলক ফিতাও। কোন সংস্থা খোঁড়াখুঁড়ি করছে, সেটির কোনো বিজ্ঞপ্তি বা সাইনবোর্ড নেই। সড়ক খুঁড়ে ওঠানো মাটি পড়ে আছে সড়কে। আবার কোনো জায়গায় সড়ক মেরামতের জন্য আনা ইট-পাথর রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। অব্যবহৃত ও ভাঙা পাইপও পড়ে আছে সড়কে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নীতিমালার প্রতিপালন হলে সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে জনগণের যে ভোগান্তি, তা কমত। সড়ক খননে নৈরাজ্য বন্ধে কোনো প্রকল্প পরিচালক বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একটি শহরে আদর্শ খননকাজের মোটামুটি সবকিছুই নীতিমালায় রয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ কমাতে এটির দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।

এ বিষয়ে কথা বলা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করে বলেন, পূর্ব প্রস্তুতি থাকলে খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু তারা প্রস্তুতি নিতে বিলম্ব করে। তারা মে মাসের কথা বললেও আমরা বলেছি, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

























