- অবৈধ তার ও অ্যালুমিনিয়াম ব্যবসার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো সোহাগ
- এসব নিয়েই মহিন ও টিটো গ্রুপের সঙ্গে ঝামেলা
- হত্যার তদন্তে বিচারিক কমিশন চেয়ে রিট কার্যতালিকা থেকে বাদ
মব ভায়োলেন্স কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ মব সৃষ্টি করতে চাইলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিন-জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
রাজধানীর মিটফোর্ডে হাসপাতালের সামনে হত্যাকাণ্ডে সিন্ডিকেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই লাশ হতে হয়েছে সোহাগকে। এমনটাই দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, অবৈধ তার ও অ্যালুমিনিয়াম ব্যবসার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো সোহাগ। পুরান ঢাকার চায়নাপট্টি ও রজনী বোস লেন ভাঙারি ব্যবসার সদর দপ্তর। এখানে সারাদেশ থেকে আসে নানা ভাঙারি পণ্য। আর সেই তালিকায় রয়েছে- তামা, পিতল, দস্তা, সীসা, প্লাস্টিকের মতো বৈধ পণ্য। আছে চোরাই তারসহ নানা অবৈধ অ্যালুমিনিয়াম পণ্য। এই অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই গত ৯ জুলাই ঘটে নৃশংসমত হত্যার ঘটনা।
এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, অতীতে মাদকের সঙ্গে জড়িত বড় গডফাদাররা ছাড় পেত। এখন থেকে কোনো অবস্থাতেই তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল কক্সবাজার বিয়াম ফাউন্ডেশন আঞ্চলিক কেন্দ্রে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও জেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, মব ভায়োলেন্স কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণ সচেতন হলে এটা বন্ধ হবে। কেউ মব সৃষ্টি করতে চাইলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিন। কারওই আইন নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার নেই। চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, চাঁদাবাজ যতই প্রভাবশালী হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজির একমাত্র পরিচয় হলো-সে চাঁদাবাজ। মাদক সমস্যা নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মাদক সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়েছে, যা মূলত কক্সবাজার দিয়ে প্রবেশ করছে। এ অবস্থা মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, লাল চাঁদ ওরফে মো. সোহাগ (৩৯) নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা তদন্তে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচারিক কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে রিট কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল সোমবার বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে রিটকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ নিজে শুনানিতে ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী। পরে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জানান, রিট শুনে আদালত বলেন, তদন্ত তো চলমান। আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। এরপর ডিলিট (কার্যতালিকা থেকে বাদ) করে দেন। এর আগে ইউনুছ আলী আকন্দ গত রোববার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট করেন। সোহাগ খুন হওয়ার পর প্রথমে চাঁদাবাজি এবং পরে বলা হয় এটি ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। চায়নাপট্টি ও রজনী লেনের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী সোহাগকে ব্যবসায়ী বলতেই রাজি নন। কারণ, অবৈধ তার ও অ্যালুমিনিয়াম ব্যবসার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো সোহাগ। আর এ নিয়েই মহিন ও টিটো গ্রুপের সঙ্গে এতো ঝামেলা। জানা গেছে, একসময় দলবল নিয়ে চলাফেরা করলেও ৫ আগস্টের পর দূরত্ব বেড়ে যায়। এই সিন্ডিকেটের হাতে মাঝেমধ্যেই নির্যাতনের শিকার হতেন ব্যবসায়ীরা। এমন একটি ভিডিওচিত্র দেখা গেছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, চেয়ার দিয়ে এক ব্যবসায়ীকে মারধর করছে সোহাগ। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। সেই ব্যবসায়ীর দোকানে গিয়ে তাকে না পাওয়া গেলেও ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। পাওনা ৪ লাখ টাকা চাওয়ায় সোহাগের রোষানলে পড়তে হয়েছিল ফরিদকে। এই সিন্ডিকেটের হাতে অনেকেই জীবন হারিয়েছে। তবে সোহাগের সাথে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার বিচার চায় মিটফোর্ড এলাকার ব্যবসায়ীরা। সেইসঙ্গে তারা চায় সিন্ডিকেটমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা।
দিবালোকে প্রকাশ্যে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত ১৩ জুলাই আরো দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। হত্যা মামলায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিটও করেছে এক আইনজীবী। পুলিশ ও র্যাব জানিয়েছে, সোহাগ হত্যার ঘটনাটি বুধবারের (৯ জুলাই) এবং এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে বৃহস্পতিবার। কিন্তু এর বীভৎসতার দিকটি সামনে আসে শুক্রবার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার মধ্য দিয়ে। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (যেটি মিটফোর্ড হাসপাতাল নামেও পরিচিত) একটি গেটের সামনে ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে সংঘটিত ঘটনায় যারা জড়িত ছিলেন তারা বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর সংগঠন তিনটি থেকে পাঁচ জনকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘটনার যে ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে আছে তাতে দেখা যায়, পিটিয়ে আঘাতের পর ওই ব্যক্তির বিবস্ত্র শরীরে পাথরখণ্ড দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। এক পর্যায়ে অন্তত দুই জনকে ওই ব্যক্তির শরীরের ওপর উঠে লাফাতে গেছে ভিডিও ফুটেজে। নিহত ব্যক্তির বোন মামলার এজাহারে জানান, তার ভাই ঢাকার রজনী বোস লেন এলাকায় অনেক দিন ধরেই ভাঙারি পণ্যের ব্যবসা করতেন। তার সঙ্গে ব্যবসায়িকসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মামলার আসামিদের বিরোধ চলছিল। আসামিরা ওই ব্যক্তির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গুদামে তালা দেওয়া ছাড়াও তাকে এলাকাছাড়া করতে বিভিন্ন সময় হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি জোনের এডিসি আমিনুল কবির তরফদার বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক এবং ভয়াবহ। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। আসামিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে।
নিহতের ভাগ্নি মীম আক্তার জানান, তার মামার পরিচিত লোকজনই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তার মামা স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মিটফোর্ড এলাকায় ব্যবসা করতেন। কিন্তু টিটু, মহিনসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন এ ব্যবসায় ভাগ বসাতে চাচ্ছিলেন। তারাও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। খুনিরা সোহাগের কাছে ব্যবসার ৫০ শতাংশ অংশীদার দাবি করেছিলেন। নাহলে লাভের ৫০ শতাংশ চাঁদা দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এনিয়ে ওই গ্রুপটি কয়েকদিন আগে তার মামাকে হত্যার হুমকিও দেন এবং তিন দিন দোকানও খুলতে দেয়নি।
নিহতের আরেক স্বজন জানান, বুধবার দুপুরে সোহাগের বাসায় খাওয়া-দাওয়া করেন টিটু। ভাত খাওয়ার সময় টিটু সোহাগকে বলেছিলেন, সব মিটমাট করে ফেলবেন। কোনো ঝামেলা ছাড়াই যেন ব্যবসা করা যায়, সেজন্য সবার সঙ্গে বসে একবার কথা বললেই হবে। টিটু এই কথা বলে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করা ৪০ থেকে ৫০ জন সোহাগকে হত্যা করে।
























