পিটার বাটলারের অধীনে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্তপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। অথচ সাবিনা, মাসুরা, কৃষ্ণা, সানজিদা এবং সুমাইয়ারা এই বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। বাটলার তাদেরকে আর দলেই নেননি। এখন পিটারের অধীনে বাংলাদেশ দল সাফল্য পাওয়ায় সাবিনাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার কি খতম হয়ে গেল?
বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক অর্জনের কাণ্ডারি ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার। তার অধীনে একঝাঁক তরুণী ফুটবলার আত্মবিশ্বাসী, একাগ্র ও সংঘবদ্ধ হয়ে খেলেছে, যার ফল এক অনন্য সাফল্য। কিন্তু এই জয়ের পেছনে একটি স্পষ্ট বাস্তবতা উঠে এসেছে; কেননা এই সাফল্যের অংশীদার ছিলেন না সাবেক অধিনায়ক-ফরোয়ার্ড সাবিনা খাতুন, ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন, আক্রমণভাগের মুখ কৃষ্ণা রানী সরকার, মিডফিল্ডার সানজিদা আক্তার ও মাতসুশিমা সুমাইয়া। তারা সবাই জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়েছেন। এরা সবাই সাবিনার নেতৃত্বে বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।
২০২৪ সালের মার্চে বাফুফে এলিট ফুটবল একাডেমি থেকে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বাটলারকে। তারপর মে মাসে ঢাকায় চাইনিজ তাইপের সঙ্গে কমলাপুর স্টেডিয়ামে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ, বাটলারের অধীনে। ম্যাচ দুটিতে তারা হেরে যায় যথাক্রমে ১-০ ও ৪-০ গোলে। ওই সময়েই গুঞ্জন ছড়ায়, জাতীয় দলে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। কেননা ম্যাচ দুটিতে বাটলার অধিনায়ক সাবিনাকে প্রথম একাদশে রাখেননি। আগের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনও কখনো এমনটা করেননি।
সাবিনাকে না রাখার কারণ হিসেবে বাটলারের ব্যাখ্যা ছিল-সাবিনার ফর্ম-ফিটনেসে ঘাটতি আছে, এজন্য তরুণ-সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের প্রথম একাদশে খেলিয়ে তাদের সুযোগ দিতে চান। সেই থেকেই মূলত গণ্ডগোলের সূত্রপাত।
এর চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সাফ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে, নেপালে। সাবিনাসহ কিছু অভিজ্ঞ খেলোয়াড় কোচের অনুশীলন পদ্ধতি, দল পরিচালনার ধরণ এবং আচরণগত নানা বিষয় নিয়ে সরব হয়ে উঠেছিলেন। সেই সময় সাবিনা-মাসুরা-কৃষ্ণারা পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে একপ্রকার ‘ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহ’ গড়ে তুলেছিলেন।
তারপরও এত সমস্যা নিয়েও বাটলার এই দলকেই সাফের শিরোপা এনে দেন ছোটনের মতো। কিন্তু তারপরও দলের ভেতরে কোন্দলের পরিসমাপ্তি ঘটেনি। দেশে ফিরে সাবিনারা বোমা ফাটান। তারা ১৮ জন মিলে গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন বাটলার তাদের বডি শেমিং করেছেন, খারাপ ব্যবহার করেছেন, ব্যক্তি স্বাধীনতায় বাধা দিয়েছেন। তারা কেউই এই কোচের অধীনে খেলতে চান না। হয় তারা থাকবেন, নয়তো কোচ থাকবেন!
কিন্তু বাফুফে কোচের পক্ষই নেয় এবং তার সঙ্গে চুক্তির নবায়ন করে। কোচও একপর্যায়ে কোচ কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সাবিনাসহ ১৮ ‘বিদ্রোহী’কে দল থেকে বাদ দেন! তিনি স্পষ্ট করে দেন, দল চাইলে তার নিয়মে খেলতে হবে। যারা মানতে পারবেন না, তারা বাইরে। পরে অবশ্য ১৩ জনকে দলে ফিরিয়ে নেন, যাদেরকে তিনি দলের মধ্যে ‘শৃঙ্খলার জন্য হুমকি’ মনে করেননি।
বাটলার পুরোপুরি বদলে দেন দলের কাঠামো। আনেন নতুন মুখ, তরুণ খেলোয়াড়দের। অভিজ্ঞতা নয়, গুরুত্ব দেন ফিটনেস, পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার ওপর। এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েই তিনি গড়েন এক নতুন বাংলাদেশ নারী দল। এই দলই আজ এশিয়ান কাপের মূলপর্বে জায়গা করে নিয়েছে, হারিয়েছে তুলনামূলক শক্তিশালী দলগুলোকেও।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-তাহলে সাবিনাসহ পাঁচ ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ? সন্দেহতীতভাবে সাবিনা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা, কৃষ্ণা, সানজিদা. মাসুরা, সুমাইয়া ছিলেন নারী সাফজয়ী দলের প্রধান মুখ। তাদের দক্ষতা ও অতীত অবদান নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু বাটলারের বর্তমান সাফল্য তাকে একটি শক্তিশালী অবস্থান এনে দিয়েছে। এখন তিনি নতুন স্কোয়াডে ভরসা করছেন। এবং তার দল যদি ধারাবাহিকতা ধরে রাখে, তাহলে সাবিনাদের ফেরার সম্ভাবনা হয়ে যাবে অত্যন্ত ক্ষীণ। এমনকি ভবিষ্যতের কোচরাও যদি সফল দল ভাঙার ঝুঁকি নিতে না চান, তাহলে সাবিনাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সময়সীমা এখানেই থেমে যেতে পারে।
তবে ফুটবলে সবকিছুই চূড়ান্ত নয়। যদি দল কখনও ব্যর্থ হয়, বা অভিজ্ঞতার অভাব টের পাওয়া যায়, তাহলে সাবিনারা আবার আলোচনায় আসতে পারেন। কিন্তু তা হবে দল বা ফেডারেশনের শর্তে, সাবিনাদের ব্যক্তিত্বের নয়।
ফুটবল শুধুই প্রতিভা বা অতীত অর্জনের খেলা নয়। এটি বর্তমান পারফরম্যান্স, শৃঙ্খলা ও টিম স্পিরিটের খেলা। বাটলার সেটাই প্রমাণ করেছেন। আর সাবিনা-মাসুরাদের পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফুটবলে কেউ অবিচ্ছেদ্য নয়। জাতীয় দলের জার্সি পেতে হলে নিয়ম, পরিশ্রম, শৃংখলা ও দলের প্রয়োজনে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। মোট কথা, সাবিনাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়তো শেষ হয়নি, কিন্তু নতুন করে শুরু করার পথটা এখন অনেক কঠিন।
রুমেল খান 
























