টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছর বন্যা আক্রান্ত হয় পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার এ অঞ্চলের অন্যতম দেশব্যাপী চাহিদা সম্পন্ন গবাদিপশু সমৃদ্ধ অঞ্চলটি।
বন্যা আক্রান্ত হয়েছে জেলার লংগদু, বাঘাইছড়ি, বরকল, নানিয়ারচর ও সদর উপজেলার শতাধিক এলাকা। এরমধ্যে শুধু লংগদুর ৭টি ইউনিয়নেই রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক এলাকা। ইতোমধ্যে উপজেলার বন্যা আক্রান্ত এলাকার প্রায় ১০ হাজার গবাদি পশু পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।
উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে প্রতিটি বাড়িতেই কিছু না কিছু গবাদি পশু রয়েছে। বন্যার পানিতে এ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক।
বন্যার্তরা নিজেদের সাথে সাথে গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন। কোনোভাবে গবাদি পশুগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে পারলেও পশুর মুখে চাহিদামত খাবার দিতে পারছে না খামারিরা।
সরেজমিনে বন্যা আক্রান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যা কবলিত প্রতিটি এলাকায় গবাদি পশু নিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কৃষকরা।
লংগদু উপজেলার কালাপাকুজ্জ্যা ইউনিয়নের শিবির বাজার এলাকার ইয়াসিন মিজি বলেন, প্রায় ১০ দিন ধরে তার বাড়িতে পানি। দুটি গরু আর তিনটি ছাগল নিয়ে গ্রামের একটি উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। নিজেরা আধা পেট খেয়ে কোনোভাবে দিন পার করলেও গবাদি পশুগুলোকে অনাহারেই রাখতে হচ্ছে বেশি সময়।
এ এলাকার অধিকাংশ স্থানে কোথাও শুকনো জায়গা নেই, কোথাও ঘাসের দেখা নেই। শুকনো খড়ের যোগান নেই। মজুদ থাকা কিছু শুকনো খড় গরুকে খেতে দিয়েছি, কলাগাছের কিছু পাতা খেতে দিয়েছি ছাগলকে। খাবার ইচ্ছা না থাকলেও ক্ষুধার্ত পশুরা এসব খেয়েই কোনোরকমে বেচে আছে।
গাউসপুর ফরেস্ট টিলা গ্রামের কৃষক দেলোয়ার বলেন, গবাদি পশু পালন করেই তার সংসার চলে। বন্যার কারণে বাড়িতে পানি ওঠায় গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র আশ্রয় নিয়েছি। নিজেদের সাথে বাড়ির গবাদি পশুগুলোকেও নিয়ে আসতে হয়েছে।
নিজে এক প্যাকেট ত্রান পেলেও গবাদি পশুর জন্য কিছু জোটেনি। বাড়িতে খরের স্তুপ থাকলেও বন্যা আক্রান্ত হওয়ায় খরের স্তুপ থেকে পর্যাপ্ত খড় নিয়ে আসা হয়নি। খাদ্যের অভাবে সংসারের আয়ের উৎস গবাদি পশুগুলোকেও অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্র জানা গেছে, উপজেলার ১৩টি খামার সহ ব্যক্তি মালিকানায় পালিত গরুর সংখ্যা ২৭ হাজার ৭শ ২৮টি, ছাগলের সংখ্যা ২৫ হাজার ৮শ ৭৫টি, ভেড়ার সংখ্যা ২শ ৮৫টি, শুকরের সংখ্যা ৮ হাজার ২শ ২৫টি, মুরগির সংখ্যা ৩ লক্ষ ২৫ হাজার, হাঁস ৪২ হাজার ৩শ ৬০টি এবং কবুতর ৩ হাজার ৬শ ৮৫টি। এসব লক্ষাধিক গবাদি পশুর মধ্যে হাজারো পশু খাদ্যের চরম অভাবে আছে। তবে খামার পর্যায়ে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
লংগদু উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সৌরভ সেন জানান, বন্যা আক্রান্ত এলাকগুলোতে গো-চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশুর খাদ্য সংকট হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার প্রায় শত হেক্টর জমির কাঁচা ঘাস পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে, খামারি খাদেমুল ইসলাম জানান, খামার পর্যায়ে গবাদি পশুগুলো শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় গবাদিপশু পালনে খরচ বেড়ে গেছে।
শুকনো খাবার এবং কেনা দানাদার খাবারের প্রতি নির্ভরশীল খামারে গবাদি পশুগুলোকে লালন পালন করতে হচ্ছে ফলে গবাদি পশু পালনের খরচ বেড়েছে, পাশাপাশি দুধের উৎপাদন কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘বন্যাদুর্গত কৃষকরা গবাদি পশু পালন নিয়ে মহাসংকটে আছেন। অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও নতুনভাবে ঘাস জন্মাতে অন্তত ২ মাস সময় লাগবে।’
এসএস/সবা




















