- সরবরাহ থাকলেও নানা অজুহাতে বেড়েই চলেছে দাম
- বিগত সময়ের মতো আবার সক্রিয় হয়েছে অতি মুনাফাখোর সিন্ডিকেট
- বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ ভোক্তাদের
সারা দেশে নিত্যপণ্যের দাম হুহু করে বাড়ছে। কোনোভাবেই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এতে জীবিকানির্বাহে কষ্টে পড়েছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ফড়িয়াদের কারসাজি কিংবা সিন্ডিকেটের কারণে পণ্য উৎপাদনকারী বা কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করছে। এতে কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলেও ভোক্তাদের পকেট কাটছে সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট করে, বাজারে কৃত্রিম পণ্য সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করার সুযোগ বাড়ছে। এই কৃত্রিম সংকট নিরসনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশকিছু উদ্যোগ নিলেও কাজে আসছে না। দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন পর্যাপ্ত হয়েছে। কিন্তু বেশি মুনাফার আশায় পেঁয়াজ মজুত রেখে সংকট তৈরি করে বাজারকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আইপি) দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে পণ্যের দাম কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। নিয়ন্ত্রণের কার্যকর প্রচেষ্টাও কম। হঠাৎ হঠাৎ কোনো একটি বা একাধিক পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায়। বাজার ব্যবস্থায় খুচরা ও পাইকারি বাজারের মধ্যে পণ্যের দামের পার্থক্য থাকে অনেক বেশি।
গত মে মাস থেকে গ্রীষ্মকালীন সবজির উৎপাদন ভালো থাকায় বাজারে এসবের দাম ছিল সহনীয়, কিন্তু জুনের শেষ দিকে সরবরাহ ভালো থাকলেও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে সবজির দরদাম। এক্ষেত্রে বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি ও বন্যাসহ নানা কারণ সামনে আনছেন ব্যবসায়ী-বিক্রেতারা। দুই-চারটি ছাড়া বেশির ভাগ সবজির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে এখন ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবজির দামের এমন লাগামহীনতায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। তারা মনে করছেন, বিগত সময়ের মতো আবার সক্রিয় হয়েছে অতি মুনাফাখোর সিন্ডিকেট। তারা নানা ছুতোয় দাম বাড়িয়ে পকেটে মুনাফা পুরছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ক্রেতাসহ ভোক্তা সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকার সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম কারওয়ান বাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবজি সাধারণত এখানেই বেশি আসে। এখান থেকে পাইকারি দরে কিনে ঢাকার অন্যান্য বাজারে নিয়ে যান বিক্রেতারা। সরেজমিনে বাজারটি ঘুরে দেখা গেছে, এখানে প্রতি কেজি করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়, শসা ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০-৮০ টাকা, টমেটো ১৬০-১৮০, পটল ৮০, বরবটি ১০০, ঝিঙা ৮০, কচুর লতি ৮০-১০০, ধুন্দল ৮০, কাঁকরোল ৭০-৮০, বেগুন (গোল) ১৪০, বেগুন (লম্বা) ৮০, পেঁপে ৩০, চিচিঙ্গা ৮০ এবং কচুমুখী প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারে লাউ প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায় এবং কাঁচামরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৪০ টাকা। ঢাকার আরেক জমজমাট বাজার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট। সোমবার (২৫ আগস্ট) এখানকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, সব ধরনের শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। এই বাজারে উস্তার কেজি ১০০ টাকা, করলা ১২০, পটল ১০০, বেগুন ১৪০-১৬০, শসা ৭০, কচুরমুখী ৫০-৬০, ঢেঁড়স ৯০, ক্যাপসিকাম ৫০০, চাল কুমড়া ৬০, বরবটি ১০০, মুলা ৮০, গাজর ১২০, মিষ্টি কুমড়া ৬০, পেঁপে ৩০-৩৫, কচুর লতি ১০০, নতুন শিম ২৪০-২৫০, পাকা টমেটো ১৬০, কাঁচা মরিচ ২০০, ২০০ গ্রাম ওজনের ফুলকপি ৬০ টাকা এবং বাঁধাকপি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি আঁটি পুঁই শাকের দাম রাখা হচ্ছে ৪০ টাকা। মিরপুর ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়ান বউ বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি কাঁচা সবজি। দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। অনেকেই আবার হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে একে একে দোকান ঘুরছেন এবং দাম যাচাই করছেন। কাঁচা তরকারির দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার কারণে হিসাব মিলাতে কষ্ট হচ্ছে তাদের। এখানে টমেটোর কেজি ১৮০ টাকা, বেগুন (কালো) ২০০, বেগুন (সাদা) ১৪০, বেগুন (গোল) ১০০, পেঁপে ৩০, শিম ৩০০, কাকরোল ১০০, করলা ১২০, মিষ্টি কুমড়া ৬০, ঝিঙে ১০০, পটল ৮০-১২০, শসা ৬০-৮০, সজনে ডাঁটা ২০০, গাজর ১৪০, ঢেঁড়স ১০০-১২০, কচুর লতি ১০০, কচুরমুখী ৬০, মুলা ৮০, চিচিঙ্গা ৮০ এবং কাঁচা মরিচের কেজি ১৬০ টাকা ও ধনিয়া পাতা ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউ আকারভেদে প্রতি পিস ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বাঁধাকপি পিস ১২০ টাকা, ফুলকপি পিস ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং চাল কুমড়া ৬০ থেকে ৭০ টাকায় মিলছে। মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও পীরেরবাগ বাজার এবং সংলগ্ন বাজারেও শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। ৩০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে মিলছে কেবল চার ধরনের সবজি। বাকিগুলো বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। এসব বাজারে পেঁপে ৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা এবং কচুরমুখী ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে লেবুর হালি ১৫ থেকে ৩০ টাকা, কাঁচকলার হালি ৪০ টাকা এবং চাল কুমড়া ৬০ টাকা পিস করে বিক্রি হচ্ছে। এসব বাজারে বেশির ভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা দরে। এর মধ্যে বেগুন প্রকারভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, পটল ৮০-১০০, ধুন্দল ৮০, চিচিঙ্গা ৮০, কচুর লতি ৮০, ঢেঁড়স ৮০, কাকরোল ১২০, করলা ১০০-১২০, ঝিঙে ১০০, মুলা ৮০, শসা (দেশি) ১০০ টাকা এবং শসা (হাইব্রিড) ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব বাজারে লাউ প্রতি পিস মিলছে ৮০ টাকা দরে। অন্যদিকে ভারতীয় গাজর ১৪০ টাকা, টমেটো ১৮০ টাকা, সজনে ডাঁটা ২০০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, শীতকালীন সবজি শিম ২৪০ টাকা, ধনেপাতা ৪০০ টাকা এবং ক্যাপসিকাম ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ১৫ থেকে ৪০ টাকা আঁটিতে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাক। এর মধ্যে কলমি শাক ১৫ টাকা, ডাটা শাক ২০ টাকা, লাল শাক ২৫ টাকা, পুঁই শাক ৪০ টাকা এবং লাউ শাক ৫০ টাকা আঁটি বিক্রি হচ্ছে। খুলনা নগরের নিরালা কাঁচা বাজারে প্রতি কেজি করলা ১০০ টাকা, শসা ৬০, ঢেঁড়স ৮০, টমেটো ১৬০, পটল ৮০ টাকা, বরবটি ৭০ এবং ঝিঙে প্রতি কেজি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি ধুন্দল ৫০ টাকায়, কাঁকরোল ৮০, বেগুন (গোল) ১২০, বেগুন (লম্বা) ৮০, কচু ৮০, পেঁপে ৪০, চিচিঙ্গা ৮০ এবং কাঁচামরিচের কেজি ২০০ টাকায় মিলছে। এছাড়া লাউ প্রতি পিস ৫০-৬০ টাকা, আমড়া প্রতি কেজি ৩৫ টাকা, লাল শাক প্রতি কেজি ৪০ টাকা ও লাউ শাক প্রতি কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা ফরিদ মিঞা বলেন, বাজারের সব ধরনের সবজি সরবরাহ অনেক কম। বেশিরভাগ সবজির মৌসুম শেষ হওয়ার কারণে মূলত সরবরাহ কম হচ্ছে। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে, সেজন্য সবজি নষ্টও হচ্ছে। নতুনভাবে সবজি বাজারে উঠতে শুরু করলে দাম কমে আসবে। দাম বাড়ার পর থেকে সবজি বিক্রি অনেক কমে গেছে। মানুষ এখন কম পরিমাণে সবজি কিনছে। আগে এক কেজি সবজি কিনলে এখন আধা কেজি কিনছে। সবমিলিয়ে সবজির দাম বাড়ার কারণে আমাদের ব্যবসাও কমে গেছে।
বিভিন্ন হাতবদল হয়ে ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে এই বাজারের ব্যবসায়ী আসলাম রহমান বলেন, সবজি নিয়ে আসার পর ট্রাকে থাকা অবস্থাতেই বিক্রি হয়। আরেকজন কিনে নেন। এভাবে হাতবদলে দাম বাড়ে। কারওয়ান বাজারে রাতে পাইকারিভাবে যে দামে সবজি বিক্রি হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি দরে বিক্রি হয় খুচরা পর্যায়ে। হাত বদলায় আর দাম বাড়ে। এছাড়া এই সময় আবহাওয়ার কারণে জমিতে সবজি চাষ কম হয়, ফলে সরবরাহও কমে যায়। এ কারণে বর্তমানে বাজারে সবজির দাম বেশি। হঠাৎ সবজির বাজার অস্থির হয়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষেরা। তারা নিত্যপণ্যের দাম আগুন হয়ে যাওয়ার পেছনে মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, বাজারে সরকারের মনিটরিং নেই। এই অবস্থা চলতে থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-যাপন দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। এতে করে দেশে চুরি, ছিনতাই ও অরাজকতা বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। গত জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আগস্টে এটা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য ক্রেতারা মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখাই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ। মিরপুরের কাজীপাড়ায় বাজার করতে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শওকত ওসমান বলেন, এভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকলে আমাদের মত মানুষের জীবন চলা কষ্টকর হয়ে যাবে। নিজ ব্যবসায় চলছে মন্দা, অথচ প্রতিনিয়ত বাজারে এলে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। কোনো কিছুই স্থিতিশীল নয়। বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। যে যার মত করে নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে আমাদের মত নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন ধারণ করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস জানান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তাদের বাজার তদারকি চলমান। কারওয়ান বাজার সবজির বাজারে এবং তেজগাঁওয়ে ডিমের আড়তে তারা অভিযান চালিয়েছেন। আমরা ডিমের আড়তে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেছি। কারওয়ান বাজারে ১০ হাজার টাকা, মোহাম্মদপুর টাউন হলে সবজির বাজারে ১৭ হাজার টাকা এবং শান্তিনগর বাজারে ১৫ হাজার টাকা নানা অনিয়মের কারণে জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের কাজ চলমান রয়েছে, আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। বাজার নিয়ন্ত্রণে আরও কয়েকটি উইং রয়েছে। এক্ষেত্রে সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, সারাদেশে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে যে অভিযান পরিচালিত হতো সেটা অনেকটাই কমে গেছে। আইনের শক্ত প্রয়োগ না থাকার কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযান কমেছে। গত বছর ৫ আগস্টের পরে অসাধু ব্যবসায়ীদের মনে ভয় ছিল, কিন্তু এখন সেটা নেই, তারা আইনকে তোয়াক্কা করছে না। বরং তারা অসাধুভাবে ব্যবসা করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এতে বাজার লাগামহীন হয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ আইনের শক্ত প্রয়োগ। আইনের কঠোর প্রয়োগ হলেই নিত্যপণ্যের দাম কমে আসবে।
























