০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দালালের হাতে জিম্মি বিআরটিএ

  • কাগজপত্র ঠিক থাকলেও হয়রানি, দালালের কাছে গেলেই ‘অগ্রাধিকার’
  • কর্মকর্তাদের নীরবতা ও যোগসাজশে দুর্নীতির স্থায়ী আসন
  • ডিজিটাল সেবা আসলেও নেই বাস্তব কার্যকারিতা

‘দালাল চক্রের উপস্থিতি পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটদেরও বলা হয়েছে যে তারা যেকোনো সময় ঝটিকা ভিজিট করবেন। আমরা সর্বদা দালাল নির্মূলের চেষ্টা চালাচ্ছি’-আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান, বিআরটিএ

 

রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কার্যালয়ের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বেড়ে চলছে। যেখানে সঠিক সময়ে সেবা পাওয়ার কথা, সেখানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং কর্মকর্তাদের অসাধু কাজের কারণে কার্যকরী সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে, নিয়ম মেনে কাজ করলেও সময় লাগে দীর্ঘদিন। আর ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের সহযোগিতা নিচ্ছেন। বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে এর আশেপাশে দালালদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। যাঁরা অফিসে আসেন, তাঁরা বিভিন্ন দালালের প্রস্তাব পেয়ে থাকেন, যারা দ্রুত সেবা দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করেন। ভুক্তভোগীরা জানান, কার্যালয়ে নিয়মিত কাজ করালে সময় অনেক বেশি লাগে এবং নানা ধরনের কাগজপত্রের ঝামেলা থাকে। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে এবং দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য দালালদের সহায়তা নিতে হয়।
বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবা নিতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। এই জনগণের অধিকাংশই জানেন না, সেবা পাওয়ার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হয়। ফলে, দালালরা তাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেন। অফিসের ভিতর ও বাইরে দালাল চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা প্রায়শই “লাইসেন্স করতে চান?” বা “কোনো কাগজ দরকার?” বলে গ্রাহকদের টার্গেট করে। একজন ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম জানান, তিনি লাইসেন্স করার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু একটি কাগজের মূল কপি বাসায় রেখে এসেছিলেন। অফিস থেকে তাঁকে জানানো হয় যে মূল কপি ছাড়া কাজ হবে না। এই সুযোগে এক দালাল তাঁকে লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন দুই হাজার টাকায়। নজরুল সেটি নিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমি মূল কপি ছাড়া লাইসেন্স হবার কথা শুনিনি, কিন্তু দালাল বলল, দুই হাজার টাকা দিলে করা যাবে।”
অন্য এক ব্যক্তি জানান, তিনি দালালের কাছ থেকে শোনেন যে, সাধারণ নিয়মে লাইসেন্স করতে দুই মাস সময় লাগে, কিন্তু দালালের মাধ্যমে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। তারা নিজেদের অফিসারের সঙ্গে যোগসাজশ দেখান বলে দাবি করেন অনেকেই। এদিকে, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের মধ্যেও দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ধরনের কাজের কারণে সঠিক নিয়ম মেনে লাইসেন্স বা অন্যান্য সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পরীক্ষার সময় ছোটখাট ভুল তুলে ধরে ফেল করানো হয়, এতে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়, যা ভোগান্তি আরও বাড়ায়। অন্যদিকে, দালালরা টাকা নিয়ে এসব ফাঁকফোকর পেরিয়ে সহজেই কাজ সম্পন্ন করে দেয়।
অধিকাংশ সেবাগ্রহীতা জানায়, তারা নিয়ম মেনে কাজ করলে সপ্তাহখানেক থেকে মাস পেরিয়ে যায়, কিন্তু দালালের মাধ্যমে কাজ করালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ হয়ে যায়। এই বাস্তবতা অনেককেই দালালের হাতে কাজ দেওয়ার জন্য বাধ্য করে। এই দালাল সিন্ডিকেট বন্ধ করার জন্য সরকারের সংশি¬ষ্ট সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঝে মাঝে অভিযান চালায়। কিন্তু, অভিযান শেষ হতেই আবার দালালরা নিজেদের অবস্থান পায়। এভাবে সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু অভিযান করলেই হবে না, দালাল নির্মূলের জন্য পুরো সিস্টেমকে ডিজিটাল করতে হবে। তখনই দালালদের ভূমিকা শূন্যে পরিণত হবে। ডিজিটাল সেবা চালু থাকলে দরকার হবে না দালালের, আর সেবা নিতে আসা মানুষও মুক্তি পাবে নানা ভোগান্তি থেকে।
বর্তমানে মিরপুর বিআরটিএ অফিসে ডিজিটালাইজেশনের কাজ শুরু হলেও সেভাবে তা কার্যকর হয়নি। কাজের ধারা এখনও অনেক জটিল এবং অধিকাংশ কাজে ব্যস্ততার জন্য সময় বেশি লাগে। সেই সুযোগটাই দালালরা কাজে লাগাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশি¬ষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কাছ থেকে কোনও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। অনেকেই এই ধরনের অভিযোগের বিষয়টি জানেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতে আগ্রহী নন। সাধারণ মানুষ মনে করেন, সেবা দিতে হলে প্রকৃত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হতে হবে, দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও সহজ করতে হবে। তা না হলে, দালালরা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হবে।
এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যে কোনো অফিসে আমরা উইদাউট নোটিশে ভিজিট করছি। দালাল চক্রের উপস্থিতি পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটদেরও বলা হয়েছে যে তারা যেকোনো সময় ঝটিকা ভিজিট করবেন। আমরা সর্বদা দালাল নির্মূলের চেষ্টা চালাচ্ছি।

জনপ্রিয় সংবাদ

আইসিবিতে শুরু হলো প্রাণিস্বাস্থ্য ও মৎস্য খাতের প্রদর্শনী

দালালের হাতে জিম্মি বিআরটিএ

আপডেট সময় : ০৭:২৫:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • কাগজপত্র ঠিক থাকলেও হয়রানি, দালালের কাছে গেলেই ‘অগ্রাধিকার’
  • কর্মকর্তাদের নীরবতা ও যোগসাজশে দুর্নীতির স্থায়ী আসন
  • ডিজিটাল সেবা আসলেও নেই বাস্তব কার্যকারিতা

‘দালাল চক্রের উপস্থিতি পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটদেরও বলা হয়েছে যে তারা যেকোনো সময় ঝটিকা ভিজিট করবেন। আমরা সর্বদা দালাল নির্মূলের চেষ্টা চালাচ্ছি’-আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান, বিআরটিএ

 

রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কার্যালয়ের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বেড়ে চলছে। যেখানে সঠিক সময়ে সেবা পাওয়ার কথা, সেখানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং কর্মকর্তাদের অসাধু কাজের কারণে কার্যকরী সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে, নিয়ম মেনে কাজ করলেও সময় লাগে দীর্ঘদিন। আর ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের সহযোগিতা নিচ্ছেন। বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে এর আশেপাশে দালালদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। যাঁরা অফিসে আসেন, তাঁরা বিভিন্ন দালালের প্রস্তাব পেয়ে থাকেন, যারা দ্রুত সেবা দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করেন। ভুক্তভোগীরা জানান, কার্যালয়ে নিয়মিত কাজ করালে সময় অনেক বেশি লাগে এবং নানা ধরনের কাগজপত্রের ঝামেলা থাকে। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে এবং দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য দালালদের সহায়তা নিতে হয়।
বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবা নিতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। এই জনগণের অধিকাংশই জানেন না, সেবা পাওয়ার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হয়। ফলে, দালালরা তাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেন। অফিসের ভিতর ও বাইরে দালাল চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা প্রায়শই “লাইসেন্স করতে চান?” বা “কোনো কাগজ দরকার?” বলে গ্রাহকদের টার্গেট করে। একজন ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম জানান, তিনি লাইসেন্স করার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু একটি কাগজের মূল কপি বাসায় রেখে এসেছিলেন। অফিস থেকে তাঁকে জানানো হয় যে মূল কপি ছাড়া কাজ হবে না। এই সুযোগে এক দালাল তাঁকে লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন দুই হাজার টাকায়। নজরুল সেটি নিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমি মূল কপি ছাড়া লাইসেন্স হবার কথা শুনিনি, কিন্তু দালাল বলল, দুই হাজার টাকা দিলে করা যাবে।”
অন্য এক ব্যক্তি জানান, তিনি দালালের কাছ থেকে শোনেন যে, সাধারণ নিয়মে লাইসেন্স করতে দুই মাস সময় লাগে, কিন্তু দালালের মাধ্যমে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। তারা নিজেদের অফিসারের সঙ্গে যোগসাজশ দেখান বলে দাবি করেন অনেকেই। এদিকে, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের মধ্যেও দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ধরনের কাজের কারণে সঠিক নিয়ম মেনে লাইসেন্স বা অন্যান্য সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পরীক্ষার সময় ছোটখাট ভুল তুলে ধরে ফেল করানো হয়, এতে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়, যা ভোগান্তি আরও বাড়ায়। অন্যদিকে, দালালরা টাকা নিয়ে এসব ফাঁকফোকর পেরিয়ে সহজেই কাজ সম্পন্ন করে দেয়।
অধিকাংশ সেবাগ্রহীতা জানায়, তারা নিয়ম মেনে কাজ করলে সপ্তাহখানেক থেকে মাস পেরিয়ে যায়, কিন্তু দালালের মাধ্যমে কাজ করালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ হয়ে যায়। এই বাস্তবতা অনেককেই দালালের হাতে কাজ দেওয়ার জন্য বাধ্য করে। এই দালাল সিন্ডিকেট বন্ধ করার জন্য সরকারের সংশি¬ষ্ট সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঝে মাঝে অভিযান চালায়। কিন্তু, অভিযান শেষ হতেই আবার দালালরা নিজেদের অবস্থান পায়। এভাবে সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু অভিযান করলেই হবে না, দালাল নির্মূলের জন্য পুরো সিস্টেমকে ডিজিটাল করতে হবে। তখনই দালালদের ভূমিকা শূন্যে পরিণত হবে। ডিজিটাল সেবা চালু থাকলে দরকার হবে না দালালের, আর সেবা নিতে আসা মানুষও মুক্তি পাবে নানা ভোগান্তি থেকে।
বর্তমানে মিরপুর বিআরটিএ অফিসে ডিজিটালাইজেশনের কাজ শুরু হলেও সেভাবে তা কার্যকর হয়নি। কাজের ধারা এখনও অনেক জটিল এবং অধিকাংশ কাজে ব্যস্ততার জন্য সময় বেশি লাগে। সেই সুযোগটাই দালালরা কাজে লাগাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশি¬ষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কাছ থেকে কোনও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। অনেকেই এই ধরনের অভিযোগের বিষয়টি জানেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতে আগ্রহী নন। সাধারণ মানুষ মনে করেন, সেবা দিতে হলে প্রকৃত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হতে হবে, দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও সহজ করতে হবে। তা না হলে, দালালরা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হবে।
এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যে কোনো অফিসে আমরা উইদাউট নোটিশে ভিজিট করছি। দালাল চক্রের উপস্থিতি পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটদেরও বলা হয়েছে যে তারা যেকোনো সময় ঝটিকা ভিজিট করবেন। আমরা সর্বদা দালাল নির্মূলের চেষ্টা চালাচ্ছি।