- সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজের ভাইদের প্রতিষ্ঠানের মহাদুর্নীতি
- কাগজে ৯০-১০০ শতাংশ অগ্রগতি দেখিয়ে বিলও পরিশোধ
- তিন প্রকল্পের ১৩৭টি প্যাকেজ থেকে ৩৪৩ কোটি টাকার বেশি তুলে নেওয়া হয়
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় ব্রিজ-সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে অগ্রগতি, কিন্তু বাস্তবে কোনো সেতু নেই। নদমূল্লা ইউনিয়নের নদমূল্লা মাদরাসা হাট-চিংগুড়িয়া-কলোনি বাজার সড়কে ৩০ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের জন্য ৩.৭১ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছিল। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা পেয়েও সেতুটি নির্মাণ করেনি।
এই কাজ পেয়েছিল সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তিনি সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজের ভাই। একই সড়কের আরেকটি ৩০ মিটার সেতুর কাজ পান মহারাজের আরেক ভাই সালাউদ্দিনের প্রতিষ্ঠান। সেতুটি আজও হয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইএমইডির পরিদর্শনে শুধু এই দুই সেতুই নয়, আরও দুটি সেতুর অস্তিত্ব মেলেনি। অথচ কাগজে দেখানো হয়েছে ৯০-১০০ শতাংশ অগ্রগতি এবং কোটি কোটি টাকার বিলও পরিশোধ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কাজ না করেই তিন প্রকল্পের ১৩৭টি প্যাকেজ থেকে ৩৪৩ কোটি টাকার বেশি তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ভান্ডারিয়ায় বরাদ্দ পাওয়া প্রায় সব স্কিম পেয়েছে মহিউদ্দিন মহারাজের পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। কাজের অগ্রগতি শূন্য থাকলেও কাগজে ৯০-১০০ শতাংশ দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল দেওয়া হয়েছে। একাই আয়রন ব্রিজ পুনঃনির্মাণ প্রকল্পের ৯৩টি প্যাকেজে কাজ হয়নি, তবু বিল দেওয়া হয়েছে ২০৫ কোটি টাকার বেশি। আইএমইডি বলছে, এসব অনিয়মে এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক, জেলা এলজিইডি অফিস ও হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তারা জড়িত। এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার ও হিসাবরক্ষক মোজাম্মেল হক সরাসরি এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মোজাম্মেল হক দুর্নীতির মামলায় কারাগারে থাকাকালেই মারা গেছেন, আর সাত্তার আত্মগোপনে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অতিরিক্ত বরাদ্দ, কাজের আগ্রগতি ছাড়াই অর্থ ছাড় এবং প্রকল্প পরিচালকের নজরদারির অভাবেই এই দুর্নীতি সম্ভব হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের সুপারিশ করেছে আইএমইডি। স্থানীয়রা জানান, এলাকার উন্নয়ন হয়নি, বরং জনদুর্ভোগ বেড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির কর্মকর্তারা বলেছেন, মহিউদ্দিন মহারাজ ও তার ভাইদের প্রভাবের কারণে তারা কিছুই করতে পারেননি। এখন আবার আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে দুর্নীতির মামলায় ফাঁসানোর।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মিরাজুল ইসলাম গাঢাকা দিয়েছেন। ভা-ারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের এ সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে পিরোজপুর এলজিইডিতে ব্যাপক দুর্নীতি ও হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিরাজুল ইসলাম আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাজ শেষ না করেই বিলের টাকা তুলে নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘শুধু এই তিনটি সেতু নয়, পিরোজপুরে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেতুগুলো অসম্পূর্ণ থাকায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। বর্ষায় এই ভোগান্তি আরও বাড়ে। আমরা দ্রুত সেতুগুলোর কাজ সম্পন্নের দাবি জানাচ্ছি।’ পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম জানান, ‘ঊর্ধ্বতন র্কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সেতুগুলোর কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী লায়লা মিথুন বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন র্কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছি। তারা শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবে। কাজ শেষ হলে এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমবে। আইবিআরপি প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই তিনটি সেতুর কাজ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আংশিক কাজ করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে উধাও হয়েছে। এলজিইডি জানায়, শারিকতলা ইউনিয়ন পরিষদ সেতু ৭০ শতাংশ এবং কুমিরমারা আবাসন সেতু ৫০ শতাংশ সম্পন্ন, কিন্তু নলবুনিয়া বাজার সেতুর কাজ শুরুই হয়নি। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হলে অতিরিক্ত আড়াই কোটি টাকা এবং ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ হতে পারে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, এলজিইডি প্রকল্পে কঠোর তদারকি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা ইফতি ইটিসিএলের মতো প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে নজরদারি কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সেতুগুলোর কাজ শেষ না হলে এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
























