মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফের শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। এবার শুধু আরাকান আর্মি এবং জান্তা বাহিনীর লড়াই নয়, সেখানে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ত্রিমুখী এই লড়াই সীমান্তঘেঁষা এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই থেমে থেমে ভেসে আসে গোলাগুলির শব্দ।
সীমান্ত এলাকাজুড়ে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে গত আট বছরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫ বাংলাদেশি। পৃথক এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৭ জন। এর মধ্যে ৪৪ জন চিরতরে পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। অন্যদিকে নাফ নদী থেকেও বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গেল দশ মাসে ২২৮ জন জেলেকে অপহরণ করে নিজেদের আস্তানায় আটকে রাখে রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।
কক্সবাজার বিজিবি রামু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দীন আহমেদ জানান, দেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত টেকনাফের নাফ নদীতে আরাকান আর্মি কর্তৃক জেলে অপহরণের ঘটনা নিত্যদিনের। সীমান্ত সুরক্ষাসহ অনুপ্রবেশ ও অপরাধ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতায় কাজ করছে।
রোহিঙ্গাদের ভাগ্য নিয়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকার দীর্ঘদিন ধরেই ছিনিমিনি খেলা চালাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে অং সান ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলির মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হলে বার্মার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৪৮–৬২ পর্যন্ত চারটি বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার ছিল।
কিন্তু ১৯৬২ সালের ২ মার্চ সামরিক জান্তাপ্রধান নে উইন ক্ষমতা দখল করলে রোহিঙ্গাদের উপর চরম দুর্দশা নেমে আসে। নে উইনের শাসনামলে পরিচালিত ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ (অফিসিয়ালি অপারেশন নাগামিন) রোহিঙ্গা বিতাড়ন ও নিধনের গুরুতর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৭৮ সালে পুনরায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।
১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের বার্মা নাগরিকত্ব আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন। ১৯৯২ সালে আবারো সামরিক অভিযান চালানো হয়। ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে মুসলিম ও বৌদ্ধদের মধ্যে সংঘর্ষে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মমতা চালানো হয়। এই ধারাবাহিক সহিংসতা চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। তখন প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
বাংলাদেশ সরকারের মানবিক উদ্যোগে তাদের আশ্রয় দেওয়া হলেও কোনো রোহিঙ্গা দেশে ফেরেননি। ২০১৯ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ-মিয়ানমার মধ্যে ১৯ দফা সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। তবে বাস্তবায়ন কার্যক্রম অপ্রতুল ও ধীর। ২০২০ সালের নির্বাচনে সামরিক জান্তা আবারও ক্ষমতা দখল করে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেনারেল মিন অং হ্লাই ক্ষমতা দখল করলে রোহিঙ্গাদের ভাগ্য আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
প্রতিদিনই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে জান্তা বাহিনীর ত্রিমুখী সংঘর্ষ ঘটছে। রাখাইন রাজ্যের অনেক এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, যা জান্তা বাহিনী দখল করতে লড়াই চালাচ্ছে। ফলে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম এবং কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তবাসীরা গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
সীমান্তে জান্তা বাহিনীর পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণের সম্ভাবনা সীমান্তবাসীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আইনি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আট বছরে ত্রিমুখী সংঘর্ষ এবং স্থলমাইন বিস্ফোরণে অন্তত ৫ জন নিহত ও ৫৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪ জন পঙ্গু হয়েছেন। এছাড়া গত বছর ডিসেম্বর থেকে ১০ মাসে ২২৮ জন জেলেকে নাফ নদী ও সমুদ্র থেকে অপহরণ করে আরাকান আর্মি তাদের ডেরায় আটকে রাখছে।
কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, “সীমান্ত অতিক্রমের অধিকাংশ ঘটনায় জেলেরাও দায়ী। তবে বিজিবি সীমান্ত সুরক্ষা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, অস্ত্র-মাদক, মানবপাচারসহ অন্যান্য অপরাধ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।”
























