গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল একসময় ছিল অনিশ্চয়তার প্রতীক। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার ভাঙাগড়ার খেলায় গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ড দীর্ঘদিন নদীভাঙন, বন্যা ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগের কারণে উন্নয়নের বাইরে ছিল। বর্ষায় ডুবে যাওয়া আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলোমাখা বালুচর ছিল চেনা দৃশ্য।
তবে সময় বদলে গেছে। নদীর পলি জমে সৃষ্ট জমি এখন উর্বর কৃষিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। ভুট্টা, চীনা বাদাম, মরিচ, সরিষা, ডাল, কাউন ও ধানসহ নানা ফসল চরের চেহারা বদলে দিয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—চরের উৎপাদন কি শিল্পে রূপ পাচ্ছে, নাকি কাঁচামালের জোগানদার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকছে?
সাঘাটার চরগ্রাম হাসিলকান্দির কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, “ফসলের অভাব নেই। কিন্তু আমরা কাঁচা ভুট্টা বিক্রি করি। যদি এখানে পশুখাদ্য প্রস্তুত বা অন্য কোনো কারখানা থাকত, তা হলে আরও বেশি দাম পেতাম।”
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার চার উপজেলায় প্রায় ১৬৫টি চর জেগে উঠেছে। চলতি মৌসুমে দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। কম খরচে বেশি ফলন হওয়ায় ভুট্টা এখন চরের প্রধান অর্থকরী ফসল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চরের ফসল ও দুধ স্থানেই প্রক্রিয়াজাত হলে এটি দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের একটি মডেল হতে পারে। ভুট্টা থেকে পশুখাদ্য শিল্প, বাদাম ও সরিষা থেকে তেলকল, মরিচ থেকে মসলা প্রক্রিয়াজাত কারখানা এবং দুধ থেকে দুগ্ধজাত পণ্য—এই চারটি খাতকে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে চরাঞ্চলে একটি সমন্বিত কৃষি শিল্প ক্লাস্টার গড়ে উঠতে পারে।
ভুট্টাভিত্তিক পশুখাদ্য কারখানা, মরিচ প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং শিল্প, এবং দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠলে চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। এতে স্থানীয় কৃষক ও খামারির আয় বাড়বে, নারীদের শ্রমশক্তি ব্যবহার বাড়বে, এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আগ্রহী করা সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি মাঝারি পশুখাদ্য বা দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কারখানা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্যাকেটজাতকরণ ও বিপণনে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
চ্যালেঞ্জও কম নয়। নদীভাঙন ও বন্যা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে ঝুঁকি তৈরি করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষক ও খামারি অনেক সময় পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারেন না। স্থায়ী সংগ্রহ কেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট না থাকায় সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উঁচু স্থানে স্থাপনা, দুর্যোগসহনশীল নকশা ও সমবায়ভিত্তিক বিনিয়োগ মডেল গ্রহণ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্থানীয় কৃষকরা উৎপাদনে পিছিয়ে নেই, তবে শিল্পায়নে এখনও অনেক পথ বাকি। বাদাম চাষে চরের কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। প্রায় ২,০৭৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। প্রতি একরে খরচ ২৫-৩০ হাজার হলেও আয় প্রায় দ্বিগুণ। সরিষা চাষও বাড়ছে, আমন ধান কাটার পর স্বল্প সময়ে ফলন পাওয়ায় অনেক কৃষক সরিষা চাষে ঝুঁকছেন।
ফুলছড়ির মরিচ চাষিরা সপ্তাহে দুদিনের হাটে কোটি টাকার লাল মরিচ বিক্রি করেন, কিন্তু স্থানীয়ভাবে গুঁড়া বা প্যাকেটজাত করার সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ কাঁচামাল হিসেবে বাইরে যায়। গবাদিপশু পালনও চরাঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ৮ থেকে ২৫টি গরু, মহিষ, ছাগল বা ভেড়া পালনের কারণে স্থানীয়ভাবে পশুখাদ্যের খরচ কম।
কিন্তু দুধ উৎপাদন বাড়লেও সংগঠিত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ খামারি কাঁচা দুধ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। সংরক্ষণ ও কোল্ড চেইন না থাকায় ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। যদি চরাঞ্চলেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডেইরি প্রক্রিয়াজাত ইউনিট স্থাপন করা যায়, যেখানে প্যাকেটজাত দুধ, দই, ঘি, মাখন, পনির বা অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন হয়, তবে কাঁচা দুধের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে। এতে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।
শু/সবা
























