১৯৭১ সালের ৩ মার্চ সারাদেশের ন্যায় উত্তাল ছিল রংপুর। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে ডাকা হরতালের সমর্থনে শহরে বের হওয়া বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কিশোর বীর মুক্তিযোদ্ধা শংকু সমজদার। স্বাধীনতা সংগ্রামে রংপুর অঞ্চলের প্রথম শহীদ তিনি। তার সাহস ও আত্মত্যাগ আজও রংপুরবাসীর স্মৃতিতে অমলিন।
শংকুর আত্মত্যাগ মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তার স্মরণে সরকারি উদ্যোগে দিনটি যথাযথভাবে পালিত না হওয়ায় আক্ষেপ রয়ে গেছে পরিবারটির। স্বজনদের দাবি—৩ মার্চ সরকারি উদ্যোগে পালন এবং তার স্মরণে একটি ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।
পরিবারের স্মৃতিচারণ
শংকুজননী দীপালী সমজদারের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র কন্যা ঝর্ণা ব্যানার্জি বর্তমানে জীবিত আছেন। তিনি রংপুর নগরীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। ঝর্ণা ব্যানার্জি জানান, ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বড় ভাইয়ের হাত ধরে মিছিলে যান শংকু। তখন তার বয়স ছিল মাত্র চার বা পাঁচ বছর।
তিনি বলেন, “সেদিন মিছিলে গিয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে আমার ভাই মারা যান। আমরা তার মরদেহও দেখতে পারিনি।”
শংকুর সঙ্গে মিছিলে যাওয়া বড় ভাই কুমারেশ সমজদার ২০২১ সালে এবং মা ২০২৩ সালে মারা যান। ঝর্ণা ব্যানার্জি জানান, তার মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৩ মার্চ সরকারি উদ্যোগে পালনের দাবি জানিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, “সরকার আমার ভাইকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছে, তবে কোনো ভাতা দেয়নি। জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছে।”
২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সরকারি নির্দেশে রংপুর জেলা প্রশাসন নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় ১০ শতক জমির দলিল শংকুর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। বাড়ির দেয়াল ও গেটে তার স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
সেদিনের মিছিলে অংশ নেওয়া কবি ও সাংবাদিক নজরুল মৃধা জানান, কিশোরদের দায়িত্ব ছিল উর্দু ও ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড অপসারণ করা। আলমনগর এলাকার অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাসার একটি উর্দু সাইনবোর্ড নামাতে গেলে বাসার ভেতর থেকে গুলি ছোড়া হয়। সেই গুলিতে শংকু গুরুতর আহত হন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু জানান, ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ব বাংলা। ৩ মার্চ রংপুরেও হরতাল পালিত হয়।
কাচারী বাজার এলাকা থেকে বের হওয়া মিছিল তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্বর) হয়ে স্টেশনমুখী হলে কলেজ রোড থেকে আরেকটি মিছিল এসে যুক্ত হয়। মিছিলটি আলমনগর এলাকায় পৌঁছালে সরফরাজ খানের বাসা থেকে গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শংকু সমজদার। মুসলিম উদ্দিন কমিশনার তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।
উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর
শংকুর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রংপুরে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত জনতা অবাঙালিদের দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়। যে বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল, সেখানে আগুন ধরানোর চেষ্টা হলে ইপিআর বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সেদিনের ঘটনায় আরও দুজন শহীদ হন—আবুল কালাম আজাদ ও ওমর আলী। গুলিবিদ্ধ শরিফুল ইসলাম মকবুল এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান। পায়ে গুলিবিদ্ধ মোহাম্মদ আলী বেঁচে যান। একই দিন ঢাকার মৌচাক মোড়ে শহীদ হন কলেজ ছাত্র ফারুক ইকবাল।
অপূর্ণ রয়ে গেছে স্বপ্ন
স্বাধীনতা সংগ্রামে রংপুরের প্রথম শহীদ কিশোর শংকু সমজদারের স্মরণে এখনো কোনো সরকারি ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি। তবে তার নামে রংপুরে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আজ ঐতিহাসিক ৩ মার্চ উপলক্ষে রংপুরের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মরণসভার আয়োজন করেছে।
শু/সবা

















