চট্টগ্রামে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে যা যা চাইলেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা » দৈনিক সবুজ বাংলা
০২:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে যা যা চাইলেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা

বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের কাছে মহাসড়কে ওজন স্কেল স্থাপন, নিত্যপণ্যের উৎপাদন-চাহিদা ও আমদানির সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, আয়কর জটিলতা, চাঁদাবাজি ও ঘুষসহ নানা বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।

রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত পর্যালোচনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তারা এসব দাবি তুলে ধরেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবদুস সালাম সওদাগর বলেন, তারা চান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান হোক। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি মারাত্মক সংকটে পড়বে এবং অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। তিনি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে ভোগ্যপণ্যের ওপর ডিউটি কমানো এবং এলসি সুবিধা সহজীকরণ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক সুদ ও বিভিন্ন চার্জ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা যৌক্তিক মুনাফা করতে পারছেন না। খেলাপি ঋণ, মন্দ ঋণ ও ব্যাংক দেউলিয়াত্বের সংখ্যা বাড়ছে। তাই সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজার মূলত আমদানিনির্ভর। পাইকারি বাজারে নিয়ন্ত্রণ শব্দটি তেমন কার্যকর নয়, বরং খুচরা বাজারে সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে। মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ও মেয়াদ উল্লেখ থাকলে তদারকি সহজ হবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সীতাকুণ্ড মহাসড়কে ওজন স্কেল, সীমান্তে চোরাচালান, বন্দরের মাশুল আকস্মিক পরিবর্তনসহ নানা সমস্যার কথা বহুবার তুলে ধরা হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। আয়কর প্রদানেও নানা জটিলতা ও অডিট নিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেন তারা।

সহ-সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। খাতুনগঞ্জে যেখানে আদা ৯০ টাকায় বিক্রি হয়, বাইরে তা ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফল আমদানিতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৪০ টাকা ডিউটি পড়ে। এলসিতে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিতে হয়।

তিনি বলেন, ডলারের দামও বাড়ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম ১২২ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকা ২০ পয়সা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপরও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমদ রশীদ আমু বলেন, আয়কর ব্যবস্থার জটিলতায় ছোট, মাঝারি ও বড় সব ব্যবসায়ীই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে করের চেয়ে ঘুষের পরিমাণ বেশি হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা কর দিতে প্রস্তুত থাকলেও অযৌক্তিক চাপ দেওয়া হলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। সরবরাহ বেশি থাকলে দাম বাড়ার সুযোগ নেই, আর চাহিদা বেশি হলে দাম কমিয়ে রাখাও সম্ভব নয়—এটাই বাজারের বাস্তবতা।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু বশর চৌধুরী বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য বারবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দায়ী করা হয়। অথচ দেশের উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন গম এবং ১০ থেকে ২০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়। মসুর ডাল ও মটরশুঁটির চাহিদাও বছরে প্রায় ৫ লাখ টনের মতো।

তিনি জানান, ২০ থেকে ২৫ বছর আগে খাতুনগঞ্জ দিয়ে দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ আমদানি হতো, যা এখন কমে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। চট্টগ্রামে অনেক চিনি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অপরিশোধিত চিনি এনে উৎপাদন করতে হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রতি টন পণ্যের ফ্রেইট বা জাহাজ ভাড়া প্রায় ৩০ ডলার বেড়েছে বলেও জানান তিনি। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি মাদার ভেসেলে ৭ থেকে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ডেমারেজ দিতে হচ্ছে, যা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজন স্কেল সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রতি কেজি পণ্যে প্রায় ১ টাকা খরচ বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানালেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

সভায় আমিনুর রহমানের সঞ্চালনায় মীর মো. সাজ্জাদ উল্ল্যাহ, এসএম সেলিম, ফরিদুল আলম মহিউদ্দিন, রাশেদ আলী, আকবর আলী, রাইসুল ইসলাম, সাঈয়দে মুহাম্মদ আলী, রাশেদ পারভেজ, সালাউদ্দীন চৌধুরী, মো. শাহেদসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

শু/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

সংসদে পাস ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ বিল-২০২৬

চট্টগ্রামে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে যা যা চাইলেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় : ০৯:২০:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের কাছে মহাসড়কে ওজন স্কেল স্থাপন, নিত্যপণ্যের উৎপাদন-চাহিদা ও আমদানির সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, আয়কর জটিলতা, চাঁদাবাজি ও ঘুষসহ নানা বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।

রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত পর্যালোচনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তারা এসব দাবি তুলে ধরেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবদুস সালাম সওদাগর বলেন, তারা চান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান হোক। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি মারাত্মক সংকটে পড়বে এবং অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। তিনি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে ভোগ্যপণ্যের ওপর ডিউটি কমানো এবং এলসি সুবিধা সহজীকরণ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক সুদ ও বিভিন্ন চার্জ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা যৌক্তিক মুনাফা করতে পারছেন না। খেলাপি ঋণ, মন্দ ঋণ ও ব্যাংক দেউলিয়াত্বের সংখ্যা বাড়ছে। তাই সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজার মূলত আমদানিনির্ভর। পাইকারি বাজারে নিয়ন্ত্রণ শব্দটি তেমন কার্যকর নয়, বরং খুচরা বাজারে সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে। মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ও মেয়াদ উল্লেখ থাকলে তদারকি সহজ হবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সীতাকুণ্ড মহাসড়কে ওজন স্কেল, সীমান্তে চোরাচালান, বন্দরের মাশুল আকস্মিক পরিবর্তনসহ নানা সমস্যার কথা বহুবার তুলে ধরা হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। আয়কর প্রদানেও নানা জটিলতা ও অডিট নিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেন তারা।

সহ-সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। খাতুনগঞ্জে যেখানে আদা ৯০ টাকায় বিক্রি হয়, বাইরে তা ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফল আমদানিতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৪০ টাকা ডিউটি পড়ে। এলসিতে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিতে হয়।

তিনি বলেন, ডলারের দামও বাড়ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম ১২২ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকা ২০ পয়সা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপরও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমদ রশীদ আমু বলেন, আয়কর ব্যবস্থার জটিলতায় ছোট, মাঝারি ও বড় সব ব্যবসায়ীই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে করের চেয়ে ঘুষের পরিমাণ বেশি হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা কর দিতে প্রস্তুত থাকলেও অযৌক্তিক চাপ দেওয়া হলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। সরবরাহ বেশি থাকলে দাম বাড়ার সুযোগ নেই, আর চাহিদা বেশি হলে দাম কমিয়ে রাখাও সম্ভব নয়—এটাই বাজারের বাস্তবতা।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু বশর চৌধুরী বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য বারবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দায়ী করা হয়। অথচ দেশের উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন গম এবং ১০ থেকে ২০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়। মসুর ডাল ও মটরশুঁটির চাহিদাও বছরে প্রায় ৫ লাখ টনের মতো।

তিনি জানান, ২০ থেকে ২৫ বছর আগে খাতুনগঞ্জ দিয়ে দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ আমদানি হতো, যা এখন কমে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। চট্টগ্রামে অনেক চিনি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অপরিশোধিত চিনি এনে উৎপাদন করতে হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রতি টন পণ্যের ফ্রেইট বা জাহাজ ভাড়া প্রায় ৩০ ডলার বেড়েছে বলেও জানান তিনি। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি মাদার ভেসেলে ৭ থেকে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ডেমারেজ দিতে হচ্ছে, যা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজন স্কেল সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রতি কেজি পণ্যে প্রায় ১ টাকা খরচ বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানালেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

সভায় আমিনুর রহমানের সঞ্চালনায় মীর মো. সাজ্জাদ উল্ল্যাহ, এসএম সেলিম, ফরিদুল আলম মহিউদ্দিন, রাশেদ আলী, আকবর আলী, রাইসুল ইসলাম, সাঈয়দে মুহাম্মদ আলী, রাশেদ পারভেজ, সালাউদ্দীন চৌধুরী, মো. শাহেদসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

শু/সবা