ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগ ওঠার পরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় “গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি” রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ দিলেও পরবর্তী মাসগুলোতে ইসরায়েলের সামরিক আমদানি আরও বেড়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজেতে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করেছিল, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গণহত্যার শামিল। শুনানিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ বলেন, ইতিহাসে এই প্রথম গণহত্যার শিকার ব্যক্তিরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসযজ্ঞ সরাসরি সম্প্রচার করছেন, অথচ বিশ্ব কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
৫১ দেশ ও অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম
আল-জাজিরার অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, আইসিজের সতর্কবার্তার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও অঞ্চল থেকে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে।
ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সামরিক সরঞ্জামবাহী ২ হাজার ৬০৩টি চালান ইসরায়েলে পৌঁছায়। এসব চালানের মধ্যে গোলাবারুদ, বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও সাঁজোয়া যানের উপাদান ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময় মোট আমদানির মূল্য ছিল প্রায় ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল বা প্রায় ৮৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ৯১ শতাংশই এসেছে আইসিজের রায়ের পর।
শীর্ষ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ
অনুসন্ধানে ইসরায়েলের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে পাঁচটি দেশের নাম উঠে এসেছে—
- যুক্তরাষ্ট্র
- ভারত
- রোমানিয়া
- তাইওয়ান
- চেক প্রজাতন্ত্র
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই মোট ঘোষিত সামরিক আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি সরবরাহ করেছে। ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস, যার অংশ প্রায় ২৬ শতাংশ।
ভারতীয় অস্ত্র উপাদানের তথ্য
প্রতিবেদনে ভারতীয় কিছু প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির তথ্যও উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের কাছে যুদ্ধাস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান রপ্তানি করেছে।
এর মধ্যে ছিল—
- ফ্র্যাগমেন্টেশন উপাদান
- ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলার বডি
- বিস্ফোরক সক্রিয়করণে ব্যবহৃত বুস্টার পেলেট
- যুদ্ধাস্ত্রের ধাতব যন্ত্রাংশ
এসব সরঞ্জাম ইসরায়েলের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আইনি দায়ের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের সতর্কবার্তার পরও অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া দেশগুলো গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণহত্যা কনভেনশন অনুযায়ী রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব শুধু গণহত্যার শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তা প্রতিরোধ করাও। তাই গণহত্যার ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলতে পারে।
অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েও রপ্তানি
কিছু দেশ প্রকাশ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিলেও তাদের ভূখণ্ড থেকে সামরিক সরঞ্জাম প্রবেশ অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা।
উদাহরণ হিসেবে তুরস্ক, ব্রাজিল, চীন ও সিঙ্গাপুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তুরস্ক সরকার বলেছে, ২০২৪ সালের মে মাসের পর ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করা হয়েছে। তবে ইসরায়েলি শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের পরও কিছু সামরিক পণ্য দেশটিতে প্রবেশ করেছে।
যুদ্ধের সঙ্গে বেড়েছে অস্ত্র আমদানিও
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ইসরায়েলের সামরিক আমদানিও তত বেড়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের মার্চ ও মে মাসে অস্ত্র আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে গাজায় হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বাড়তে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান টিকিয়ে রাখতে বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শু/সবা
সবুজ বাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
























