বোরো মৌসুমে মাঠজুড়ে কৃষকদের ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে গাইবান্ধার কৃষকরা পড়েছেন দ্বিমুখী সংকটে। সময়মতো সেচ দিতে না পারা ও বাড়তি খরচের চাপ মিলিয়ে বোরো উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চারা রোপণ শেষ হয়ে ধানের শীষ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে ফসল, যেখানে নিয়মিত সেচ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ঠিক এই সময়েই ডিজেল সংকট কৃষকদের বড় বিপাকে ফেলেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, আগে সহজেই পেট্রোল পাম্প বা ডিলারদের কাছ থেকে ডিজেল পাওয়া গেলেও এখন তা সীমিত হয়ে গেছে। অনেক স্থানে জনপ্রতি এক-দুই লিটারের বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না, আবার কোথাও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে সেচ পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাটি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে, যা ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কৃষি পুরোপুরি ডিজেলনির্ভর। জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষকদের ২০-৩০ কিলোমিটার দূরের শহরে গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, এতে সময় ও খরচ—দুটিই বাড়ছে।
এদিকে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে চলতি মৌসুমে বিঘাপ্রতি খরচ ১১ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যেখানে গত বছর বোরো চাষে খরচ ছিল ১২ থেকে ১২.৫ হাজার টাকা, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৫ থেকে ১৪.৫ হাজার টাকায়। ডিজেলের পাশাপাশি সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ।
সাঘাটা উপজেলার কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, শীষ আসার সময়ে সেচ না পেলে ফলন কমে যায়। একই সঙ্গে পাট চাষের জমি প্রস্তুত করতেও সমস্যা হচ্ছে। ফলে ধান ও পাট—দুই ফসলই ঝুঁকিতে পড়েছে। অন্যদিকে কৃষক আমিনুল হক জানান, অনেক সময় বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে, যা কৃষকদের আর্থিক চাপে ফেলছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ নয়; চরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়েছে এর প্রভাব। নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রোগী পরিবহনসহ জরুরি কাজে দুর্ভোগ বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সরবরাহ তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তবে সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী কৃষকদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত এই সংকট নিরসন না হলে বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে ধান ও চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে, যা ভোক্তা পর্যায়ে নতুন চাপ তৈরি করবে।
শু/সবা























