রেলওয়েতে দুর্নীতি উন্মোচন: তদন্তে প্রমাণিত জালিয়াতি, শাস্তি দুইজনের » দৈনিক সবুজ বাংলা
০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেলওয়েতে দুর্নীতি উন্মোচন: তদন্তে প্রমাণিত জালিয়াতি, শাস্তি দুইজনের

পরস্পরের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে একই ঠিকাদারি কাজের বিল দুইবার উত্তোলন করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের দুই কর্মচারীকে চাকরিবিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিন। তারা দু’জনই লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) দপ্তরের অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শাস্তির অংশ হিসেবে তাদের দু’জনকেই পাঁচ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বদলি করা হয়েছে।

রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লালমনিরহাট স্টেশন থেকে আদিতমারী পর্যন্ত রেললাইনের প্রোটেকশন ওয়াল নির্মাণ কাজ পায় ‘মেসার্স রিচ ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কাজ শেষে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি অর্থনৈতিক কোড ৩২৫৮২০৬-এর মাধ্যমে ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫৫ টাকা ২৭ পয়সা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ভিন্ন অর্থনৈতিক কোড (৪১১১৫০১) ব্যবহার করে একই পরিমাণ অর্থ পুনরায় উত্তোলন করা হয়, যা গুরুতর অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির শামিল।
বিষয়টি উদঘাটন করেন লালমনিরহাটের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) মো. শিপন আলী। এরপর ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তের জন্য সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন)-কে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তার প্রতিনিধি দ্বিতীয়বার বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তারা জানান, তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিনের পরামর্শে প্রলুব্ধ হয়ে তারা এ কাজ করেছেন। তবে ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর দ্বিতীয়বার উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রথম বিল প্রক্রিয়াকরণে তারিকুল ইসলাম জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও দ্বিতীয়বার বিল প্রদানের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না বলে দাবি করেন। কিন্তু নথিপত্রে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার বিল প্রেরণের ক্ষেত্রেও তার স্বাক্ষর রয়েছে।
অন্যদিকে রইছ উদ্দিন নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও তদন্তে প্রমাণিত হয়, বিল প্রক্রিয়াকরণ, রেজিস্টার সংরক্ষণ, অগ্রায়ন পত্র প্রেরণ এবং হিসাব বিভাগের প্রত্যয়ন সংগ্রহসহ পুরো প্রক্রিয়ায় তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, রইছ উদ্দিন কর্মরত অবস্থায়ই নিজের ভাইয়ের নামে লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি কাজ করতেন এবং গত পাঁচ বছরে একাধিক টেন্ডার লাভ করেন। এসব কাজ তিনি অন্যের মাধ্যমে সম্পন্ন করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটি সাক্ষ্য, জবানবন্দি ও দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, একই কাজের বিল পুনরায় উত্তোলনের ক্ষেত্রে তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিনই মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফলে “রেলওয়ে কর্মচারী (দক্ষতা ও শৃঙ্খলা) বিধি, ১৯৬১” অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ‘গুরুদণ্ড’ প্রদানের সুপারিশ করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা প্রায় আটজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি। সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছি যে অভিযুক্তরা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শিপন আলী বলেন, “ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”

শু/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারকে আরেকটি ৩৬ জুলাইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে: আব্দুল্লাহ আল জাবের

রেলওয়েতে দুর্নীতি উন্মোচন: তদন্তে প্রমাণিত জালিয়াতি, শাস্তি দুইজনের

আপডেট সময় : ০৪:১৫:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

পরস্পরের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে একই ঠিকাদারি কাজের বিল দুইবার উত্তোলন করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের দুই কর্মচারীকে চাকরিবিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিন। তারা দু’জনই লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) দপ্তরের অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শাস্তির অংশ হিসেবে তাদের দু’জনকেই পাঁচ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বদলি করা হয়েছে।

রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লালমনিরহাট স্টেশন থেকে আদিতমারী পর্যন্ত রেললাইনের প্রোটেকশন ওয়াল নির্মাণ কাজ পায় ‘মেসার্স রিচ ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কাজ শেষে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি অর্থনৈতিক কোড ৩২৫৮২০৬-এর মাধ্যমে ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫৫ টাকা ২৭ পয়সা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ভিন্ন অর্থনৈতিক কোড (৪১১১৫০১) ব্যবহার করে একই পরিমাণ অর্থ পুনরায় উত্তোলন করা হয়, যা গুরুতর অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির শামিল।
বিষয়টি উদঘাটন করেন লালমনিরহাটের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) মো. শিপন আলী। এরপর ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তের জন্য সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন)-কে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তার প্রতিনিধি দ্বিতীয়বার বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তারা জানান, তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিনের পরামর্শে প্রলুব্ধ হয়ে তারা এ কাজ করেছেন। তবে ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর দ্বিতীয়বার উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রথম বিল প্রক্রিয়াকরণে তারিকুল ইসলাম জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও দ্বিতীয়বার বিল প্রদানের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না বলে দাবি করেন। কিন্তু নথিপত্রে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার বিল প্রেরণের ক্ষেত্রেও তার স্বাক্ষর রয়েছে।
অন্যদিকে রইছ উদ্দিন নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও তদন্তে প্রমাণিত হয়, বিল প্রক্রিয়াকরণ, রেজিস্টার সংরক্ষণ, অগ্রায়ন পত্র প্রেরণ এবং হিসাব বিভাগের প্রত্যয়ন সংগ্রহসহ পুরো প্রক্রিয়ায় তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, রইছ উদ্দিন কর্মরত অবস্থায়ই নিজের ভাইয়ের নামে লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি কাজ করতেন এবং গত পাঁচ বছরে একাধিক টেন্ডার লাভ করেন। এসব কাজ তিনি অন্যের মাধ্যমে সম্পন্ন করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটি সাক্ষ্য, জবানবন্দি ও দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, একই কাজের বিল পুনরায় উত্তোলনের ক্ষেত্রে তারিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিনই মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফলে “রেলওয়ে কর্মচারী (দক্ষতা ও শৃঙ্খলা) বিধি, ১৯৬১” অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ‘গুরুদণ্ড’ প্রদানের সুপারিশ করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা প্রায় আটজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি। সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছি যে অভিযুক্তরা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শিপন আলী বলেন, “ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”

শু/সবা