উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী ঘর তৈরির অভিযোগ উঠেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মানুষের দাবি সম্প্রতি উখিয়া কুতুপালং এলাকায় অবস্থিত ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনের ব্লক-ই এলাকায় ইউএনএইচসিআর- এর তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় কেটে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। সেই সাথে সেখানে নতুন করে ৮৮৮টি শেল্টার নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব শেল্টারের মধ্যে কিছু স্থাপনা দ্বিতল বিশিষ্ট, যা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা ও এসিএফ শাহিনুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এটি কাঁটা তারের বেড়ার ভিতরে হওয়ায়, ক্যাম্প ইনচার্জ মহোদয়ের এক্তিয়ারাধীন। এই কাজ করার ক্ষেত্রে বা পাহাড় কাটার ব্যাপারে বনবিভাগের কোন অনুমোদন নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি নেননি বলে জানান। তাই এ ব্যাপারে তাদের তেমন কিছু করার নেই। বলেও জানান।
অন্যদিকে নতুন দীর্ঘস্থায়ী শেড বা শেল্টার নির্মান প্রসঙ্গে পালংখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পাহাড় কেটে এভাবে রাস্তা ও বসতি নির্মাণ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ভূমিধসের আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি অবশিষ্ট বন ও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এসব নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। তিনি যোগ করে আরো বলেন, তাছাড়া দ্বিতল লোহা দ্বারা নির্মিত শেডগুলো যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য করা হয়ে থাকে, তাহলে তা রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারের অস্থায়ী আবাস নির্মাণ মতামতের পরিপন্থী। এর ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাঁধা ও ষড়যন্ত্র। আইএমও, ইউএনএইচসিআর, আর আর আর সিসহ কিছু এনজিও, আইএনজিও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদানের জন্য এহেন আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড করছে বলে মনে করছি। তাছাড়া সংরক্ষিত বনভুমির উপর এসব শেড নির্মান হচ্ছে, তাই বনবিভাগের দায় তো রয়েছেই।
তিনি আরো সংযুক্ত করে বলেন, মাস দেড়েক পুর্বে মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে বের না হবার জন্য ও যে গাড়িতে রোহিঙ্গাদের পাওয়া যাবে সেই গাড়িকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বললেও তা কার্যত কোন কার্যকর ভুমিকা পালন করছে না- যা সিআইসি, এপিবিএন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি স্থাপনা গড়ে উঠলে তাদের স্থায়ীভাবে এ দেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা সরকারের ঘোষিত অস্থায়ী শেড স্থাপন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যরিস্টার সাফ্ফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, আমরা চাই রোহিঙ্গারা তাদের দেশে স্বসম্মানে ফেরত যাক। কিন্তু এর মধ্যে গত একবছরে আন্তর্জাতিক সংস্থা পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী ঘর তৈরি করে যাচ্ছে। এটা অন্যায়। এতে রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফেরত যেতে অনাগ্রহী হবে। স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। এটা বন্ধ করা জরুরি।
কুতুপালং এলাকার বাসিন্দা এবং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্ষার আগমূহুর্তে পাহাড় কাটার কারণে পরিবেশ ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে বিপর্যস্ত সৃষ্টির আশংকা তৈরি হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ঘর দেয়া হলে প্রত্যাবাসন জটিল হবে। মাদক ও মানবপাচার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটা দ্রুত বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সকল ঘর বাঁশ দিয়ে তৈরি। এর মধ্য ইট এবং লোহা ব্যবহার করে তৈরি করা ঘর স্থায়ী হিসেবে মনে করছেন সকলেই। এতে স্থানীয় জনগনের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা তৈরি হয়েছে। স্থায়ী ঘর পেলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের ফেরত যেতে চাইবে না। স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভ নিরসনে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব ঘর তৈরি এবং পাহাড় কাটা বন্ধ করা জরুরি।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মান্নান জানান, আওয়ামীলীগ সরকারের সময় রোহিঙ্গাদের ঢল নামলে এসব রোহিঙ্গা নাফনদীর কিনারের ক্যাম্প করে রাখার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু পার্বত্য এলাকার এমপি বীর বাহাদুর কৌশলে এসব রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের পশ্চিমের পাহাড়ে নিয়ে যায়। এখন লোহা-ইট দিয়ে ঘর তৈরি করে তাদের স্থায়ী করার পাঁয়তারা দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগতভাবে জানানো হয়েছে। এটা বন্ধ করা জরুরি। অন্যতায় স্থানীয়রা আন্দোলনে নামনে। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
বিষয়টি নিয়ে ইউএনএইচসিআর- এর জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোশারফ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বুদ্ধ পূর্নিমার ছুটি। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তহিক বন্ধ। রবিবার বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন।
এদিকে, সওয়াব নামক এনজিও গত বছর ১৫ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১০ (দশ) হাজার সমাজিক বনায়নের গাছ কেটে আই এম ওর অফিসে ইট ও খড়ের নিচে লুকিয়ে রাখা গাছ বন বিভাগ উদ্ধার করার পরও ক্ষতিকারক সওয়াব এন জি ওর বিচার না হওয়াতে এই জঘন্য ভাবে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করার পায়তারা চালাচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন সমাজের মতে, এনজিওরা বর্জ্য অপসারনের নাম দিয়ে বর্জ্য গুলো খাল ও ছড়ার পাশে স্তুপ করে রাখে বর্ষার বৃষ্টির সাথে সাথে সে বর্জ্য গুলো তাদের নিয়োগ কৃত কর্মী দিয়ে বর্ষার পানিতে ভাসিয়ে দেয়।(তার ভিডিও তাদের কাছে রয়েছে।) সে বর্জ্যগুলো নিম্নাঞ্চলে এসে পানি চলা চলের খাল/ছড়া বন্ধকরে দেওয়াতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কৃষকের ফসল ও বাড়ি/ঘর ভেসে যায়।
শীলের ছড়া এলাকায় বিরাট বনভুমি দখল করে করা হয়েছে আইএমও লজিস্টিক হাব। মধুরছড়ায় করা হয়েছে ডাব্লিউএফপি বিভিন্ন স্থাপনা। এমনই দৃশ্য পালংখালী, থাইংখালী, বালুখালী, কুতুপালং, ফলিয়াপাড়া ও হাজম রাস্তা, টিএন্ডটি, আমগাছতলাসহ বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও গড়ে উঠেছে বিশাল ওয়্যারহাউস, কোথাও অফিস, কোথাও আবার পশুখামারের আড়ালে প্রকল্প চালাচ্ছে আইএমও, ডাব্লিউএফপি, ইউএনএসসিআর, ব্রাক,সাওয়াব, হ্যান্ডিক্যাপ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। এসব সংস্থাসমুহ সরকারের আদেশ-নির্দেশও মানছে না। সরকারের নোটিশ অমান্যের পাশাপাশি তারা অহরহ আইন অমান্য করে দাপট দেখিয়ে সরকারের প্রশাসন ও বনবিভাগকে একপ্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে।
শু/সবা
কক্সবাজার প্রতিনিধি 



















