পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিএনপি সরকারের আমলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বুধবার (১ জুলাই) জেএসএসের সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার স্বাক্ষরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব দাবি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
জেএসএসের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে পার্বত্য চুক্তির চেতনা অনুসরণ করা হয়নি। প্রথমে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী করা হলেও পরে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় পরিচালনাকে তারা চুক্তির মূল চেতনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে গত ১১ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের একটি বক্তব্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জেএসএসের মতে, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রশ্নে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়—এ ধরনের মন্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জেএসএসের দাবি, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৫৪ জন জুম্ম বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ২৪টি ঘটনায় ৪৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া ২১টি গ্রামে টহল অভিযান এবং নতুন ৩৪টি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া সেনা-সমর্থিত বলে দাবি করা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ১২টি ঘটনায় দুইজন নিহতসহ ২৭ জন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, গুলিবর্ষণ, তল্লাশি, হত্যার হুমকি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
মুসলিম বাঙালি সেটেলার, ভূমিদস্যু ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ১০টি ঘটনায় চারজন নিহত, ৪৩ জন আহতসহ মোট ৬৯ জন জুম্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় হামলার শিকার ম্রো গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়েরের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে ম্রো, ত্রিপুরা ও কিছু চাকমা পরিবারের সদস্যদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ছোট শিশুদের পড়াশোনার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে অভিভাবকদের অজান্তে ধর্মান্তর করা এবং তাদের নাম-পরিচয় পরিবর্তনের অভিযোগও উত্থাপন করেছে জেএসএস।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেএসএসের নেতা-কর্মী ও পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকজন শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও প্রতিবেদনে করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
শু/সবা
নিজস্ব প্রতিবেদক: 















