শাপলা আবাসিকে একশ ফুট উঁচু পাহাড়, কাটা হয়েছে অর্ধেকের বেশি পাহাড়ঘেরা নগরী পাহাড় শূন্য হচ্ছে
পাহাড় ঘেরা বন্দর নগরী চট্টগ্রাম পাহাড় শূন্য হয়ে পড়েছে। নগরীর বায়েজিদ, আকবর শাহ, পাহাড়তলী এলাকায় শত শত ছোট বড় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। রাত – দিন সমানে কাটা হচ্ছে পাহাড়। এসব পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে নানা নামে আবাসিক এলাকা। পাহাড় থেকে কাটা মাটি ও বালি বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ভূমির পেরেক খ্যাত ছোট বড় পাহাড় গুলো কেটে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকীর মুখে পড়েছে। প্রবল বর্ষণে কাটা পাহাড় গুলোর মাটি ও বালি ধসে পড়ে পরিবেশকে আরো বেশী হুমকীতে পেলে দেয় বলে ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ। প্রতিদিন নগরীর কোন কোন এলাকায় সমানে পাহাড় কাটা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বরাবরের মতো নীরব রয়েছেন। মাঝে মধ্যে ছোট খাট লোকজনের বিরুদ্ধে প্রশাসন দুই/ একটি মামলা করলেও প্রভাবশালী পাহাড় কাটা সিণ্ডিকেটের সদস্যরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। গত দুই দশকে চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে একাধিক আবাসিক এলাকা গড়ে তুলে বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে। এসব আবাসিক গুলোতে ওয়াসার পানি, পিডিবি’র বিদ্যুৎ সরবরাহসহ সকল প্রকার নাগরিক সুবিধাও মিলছে সহজে। অনেকটা কম দামে এসব এলাকায় প্লট কিনে রাতারাতি বহুতল ভবনসহ নানা ধরনের ভবন গড়ে উঠছে। প্রশাসনের কড়া নজরদারি না থাকায় নাগরিক সকল সুবিধা নিয়ে পাহাড় কাটা ভূমির উপর রাস্তাসহ সকল সুবিধা বিরাজমান থাকায় কোন ভাবেই চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিবেশবাদি সংগঠনের নেতারা।
নগরীর আকবর শাহ থানাধীন শাপলা আবাসিক এলাকার লইট্টা গোনা নামক স্থানে একটি একশত ফুটের অধিক উচ্চতার পাহাড় কাটছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এই বিশালাকৃতির পাহাড়টি পাহাড় খেকোরা দিনে রাতে সমানে কাটছে। একশত ফুটের অধিক উঁচু একটি পাহাড়ের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। জনৈক আবদুল মালেকের মালিকানাধীন এই পাহাড়টি গত বেশ কিছুদিন ধরে কাটা হচ্ছে বলে জানিয়ে স্থানীয়রা বলেছেন, পাহাড় কাটার পাশাপাশি পাহাড়ে ধস সৃষ্টির জন্য মোটর লাগিয়ে রাতে দিনে পানি দেয়া হচ্ছে কাটা অংশে। পানির সাথে যাতে সহজেই পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে সেই জন্য মোটর লাগিয়ে পানি দেয়ার কাজ চলছে।
আগে লুকোচুরি করে পাহাড় কাটা হলেও এখন প্রকাশ্যে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। পাহাড় খেকোদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে পাহাড়খেকোরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো সাবাড় হওয়ার শঙ্কা দিনে দিনে প্রকট হয়ে উঠছে। সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার মহোৎসব থামেনি। প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ দেখে কয়েক দিন বন্ধ থাকলেও নতুন করে শুরু হয়েছে পাহাড় কাটা। ফৌজদারহাট–বায়েজিদ লিংক রোডের সন্নিহিত এলাকার পাহাড়গুলো বেশ কিছু দিন ধরে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে। প্রভাবশালী একটি চক্র ফৌজদারহাট–বায়েজিদ লিংক রোড থেকে আড়াআড়িভাবে ভাটিয়ারী–বড়দীঘির পাড় লিংক রোড পর্যন্ত একটি রাস্তা করার জন্য পাহাড় কাটছে বেশ কিছুদিন ধরে। এই এলাকায় পাহাড় কাটা নিয়ে সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর একটি মামলাও রুজু করেছেন সংশ্লিষ্ট থানায়।
স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিণ্ডিকেট শত শত শ্রমিক লাগিয়ে রাতে–দিনে পাহাড় কাটছে। বায়েজিদ বোস্তামী থানায় রেকর্ডকৃত মামলায় অভিযুক্ত পাহাড়খেকোরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাওয়ায় এই এলাকায় পাহাড় কাটা থামছে না। উক্ত এলাকায় নতুন করে পাহাড়কাটা শুরু হয়েছে বলে জানিয়ে স্থানীয় সূত্র বলেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র নানা পন্থায় পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ পরিবেশ আন্দোলনে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। সংঘবদ্ধ চক্র পাহাড়ি ভূমিতে আবাসন এলাকা গড়ে তোলাসহ বড় ধরনের বাণিজ্যের লক্ষ্যে পাহাড় সাবাড় অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও বেলার নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার চট্টগ্রাম বিভাগীয় কোর্ডিনেটর মনিরা পারভিন সম্প্রতি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এই সময় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের সিনিয়র কেমিস্ট রুবাইয়াত স্বরূপ ও কাট্টলীর এসি (ল্যান্ড) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আবু ইউসুফ ইফতেখার উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের পক্ষ থেকে বিষয়টি চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাসকে জানিয়েছেন। হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, আমাদের অগোছরে পাহাড় কাটা হয়। আমরা যেখানে খবর পাই, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করি। এখানে পাহাড় কাটার যে অভিযোগ উঠেছে সেটি তদন্ত হবে এবং সংশ্লিষ্ট দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, যেখানে পাহাড়কাটা হবে সেখানেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে ভয়াবহ আকারে পাহাড় কাটা চলে। বছর কয়েক আগেও চট্টগ্রামে ২০০টির মতো পাহাড় ছিল। গত চল্লিশ বছরে চট্টগ্রামের ৬০ শতাংশের বেশি পাহাড় সাবাড় করে দেয়া হয়েছে।


























