শিশু-কিশোর সাহিত্যে কবি ওসমান মাহমুদকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। তার শিল্পমানস, স্বতন্ত্র অনুধ্যান ও সৃষ্টিধর্মী বিবেচনা বিরলপ্রজ। তার কবিতায় ভাবের গভীরতা আছে। আছে চিত্ররূপময় দৃশ্যের যোজনা। ‘মন ছুটে যায় জারুলবনে’র ক্ষেত্রেও একই কথা। তবে ব্যতিক্রম হলো- এখানকার কবিতাগুলোতে তার সময়োপযোগী বিবেচনা। যা শিশু-কিশোরদের সুকুমার বৃত্তিতে এঁকে দেবে সবুজ, সতেজ ও নির্মল বায়ুভরা এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। কল্পনার ডানায় ভর করে তারা ছুটে যাবে আকাশ নীলে উড়ন্ত চিলের পিছু পিছু। তেপান্তরের দামাল বাতাসে ভেসে আসা কোকিলের কুহুতানে মুগ্ধ হবে তারা। রঙিন আকাশ আর সবুজ বনের শোভায় সাজিয়ে নেবে তাদের অবুঝ মনের উদ্দাম আঙিনা। এক্ষেত্রে কবি এদেশের সম্ভাবনার স্বপ্ননাবিক হাজারো শিশু-কিশোরদের অগ্রপথিক। বাতাসে কান পেতে তারা শুনবে কবি তাদের নাম ধরে ডাকছেন-
ফুলের বনে মৌমাছি আর ছুটছে কালো ভোমরা
যায় বয়ে কাল রাফিন-রাহী কই হারালে তোমরা?
তবে বইটি কেবল শিশু-কিশোরদের পাঠোপযোগিই নয়। এখানে সব বয়সের পাঠকই তাদের মনের নিভৃততম ইচ্ছে ও আকুতির কথা খুঁজে পাবেন। দূরগন্ধবাহী উপমা-অলঙ্কারে খুঁজে পাবেন অতীত দিনের দস্যিপনাকে। হৃদয়ে ব্যঞ্জনা তুলবে এইসব পঙক্তি-
ডাকতো দূরের বটের ছায়া তেপান্তরের মাঠ
ফুলের বনে বেড়িয়ে নিতাম মৌমাছিদের পাঠ।
উছলানো ঢেউ কলকলানো মানিকছড়া খাল
বাঁক খেয়ে ফের করতো আরজ আবার এসো কাল।
সত্যি বলতে কী- সাহিত্য হয়ে উঠলে, তা সব বয়সের পাঠকদের জন্যই আকর্ষণের বস্তু হয়। ওসমান মাহমুদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি মূলত কবি। ছোটোবড়ো সবার জন্যই তিনি লিখেন। কবিতার পাশাপাশি লিখেন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গান। তার শিল্পবোধ, উপমা- অলঙ্কার ও পাত্র-মিত্র সবই কেমন অদ্ভুত যোজনায় সম্মোহন সৃষ্টি করে। আমরা যাকে আর্ট এ্যাপ্রিসিয়েশান বলি, ওসমান মাহমুদের কবিতায় তার পুরোটাই উপস্থিত। আমার বিশ্বাস, তার ‘মন ছুটে যায় জারুলবনে’ বয়স নির্বিশেষে সকল পাঠকের হৃদয়েই জায়গা করে নেবে। –[ কবি, মোস্তফা মাহাথির ]
ওসমান মাহমুদের গুচ্ছ কবিতা—

আগুন-লাগা ফাগুন
আগুন-লাগা ফাগুন জেগে উঠলো বনের গাত্রে
গাইছে কোকিল আর পাপিয়া হরেক পাখির জাত রে।
হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে প্রাণ নেচে যায় শূন্যে
আঁকতে ছবি রং-তুলি আর কৃষ্ণচূড়ার খুন নে।
মন ছোটে দূর আকাশ নীলে চিলের পিছে হন্যে
সাজাও আপন স্বপ্ন রঙিন, দিলাম আকাশ বন নে।
তেপান্তরের দামাল শোভা মন কাড়ে কু-উ সুর যে
যুগান্তরের দস্যি কত চোখ মেলে ভোর সূর্যে।
ফুলের বনে মৌমাছি আর জুটছে কালো ভোমরা
যায় বয়ে কাল, রাফিন রাহী কই হারালে তোমরা!
কেউ হলো না তোর
ছন্নছাড়া মনপাখি তোর ওড়ার কোথায় শেষ
কোন কেতনের খোঁজে উড়িস কোথায় আপন দেশ?
পথে পথে বাউল বেশে খোঁজ করে যাস কার
কীসের পানে কীসের টানে হইলি ঘরের বার!
ঘরের খোঁজে পরের বোঝা টানবি কত মন
তুই তো চির ঘরহারা এক করলি উজাড় ধন।
ঘরের না তুই, পরেরও না, ডাকছে তোকে পথ
নদীর ধারে বন পাখি ফুল গড়ছে ভবিষ্যৎ।
ব্যস্ত নদী মুখর সে পথ ডাকছে ফাগুন বায়
সব ধাবমান তুই রয়ে যাস ত্রিশূল মোহনায়।
নীড় হারিয়ে তীরের খোঁজে ভিড় জমিয়ে ফের
মন হয়েছিস্ ছাউনি বনের জীর্ণ কুটিরের।
কেউ হলো না তোর তবু তুই সবার হ’লি ডাক
গহন বুকে উনুন জ্বেলেও ঠোঁট করে দিস তাক।
মন ছুটে যায়
মন ছুটে যায় সাগর-তীরে মন ছোটে দূর নীলে
জোনাকজ্বলা রাত্তিরে দূর শাপলাফোটা বিলে।
ফসল-ফলা সবুজ মাঠে মানিকছড়ার কূলে
মৌচাকে আর পাখির বাসায় প্রজাপতি ফুলে।
মন ছোটে লাল কৃষ্ণচূড়ায় চপল চড়ুই নীড়ে
অবুঝ পাগল দিগন্তে ধায় সবুজ বাতাস চিরে
পাতাঝরা শূন্য শাখে মন বসে রয় চুপে
যায় হারিয়ে কোকিল-সুরে মুগ্ধ ফাগুন-রূপে।
মন ছোটে রাত তারার দেশে জোছনাধোয়া মাঠে
বাউরি বাতাস বন্ধু ভেবেই তার সারাদিন কাটে
কিংবা সাঁঝে পাখির পাড়ায় সূর্যমুখী বনে
সই পেতে দেয় বংশীবাদক রাখালিয়ার সনে।
মন ছোটে লাল সাঁঝের মায়ায় ব্যস্ত দিনের শেষে
চোখে সবুজ স্বপ্ন মেখে শূন্যে বেড়ায় ভেসে।
জারুলবনে পিক-পাপিয়ার সুর সুমধুর গানে
খোঁজে ব্যাকুল চঞ্চলা মন কান্না-হাসির মানে।
হেমন্ত
মাঠভরা ওই সোনালি ধানের খুশবু লেগেছে বায়ে
ভোরের সুবাসে দোয়েলের শিস্ ভেসে আসে দূর গাঁয়ে।
প্রভাতপাখির কাকলিমুখর কুয়াশা কিরণ মেশে
নিসর্গ সাজে মায়াপুরী যেন শিশির নিশুতি শেষে।
পতিত ভিটায় তরুশাখে ঘুঘু একলা একাকী ডাকে
নিঝুম প্রহরে শালিকের ছুট্ সোনালি ধানের ফাঁকে।
অচেনা আবেশে দেহ-মনজুড়ে নব শিহরন জাগে
শীতল বাতাস ছোঁয়া দিয়ে যায় অন্তরে অনুরাগে।
আকাশের নীল করে ঝিলমিল স্নিগ্ধ দুপুর বেলা
উদাসী কিশোর চঞ্চলা মনে সাজায় স্বপ্ন-ভেলা।
কার্তিক-মাঠে ভরা যৌবন কুয়াশা শীতল সাঁঝে
কিষাণ দুলালী কত ছবি আঁকে বিরহী মনের ভাঁজে!
ছাতিমের ফুল হাসনাহেনার বিমোহিত রূপ ঘ্রাণে
দূরদেশি পাখি অতিথিরা আসে হেমন্তে গানে গানে।
নাইওরি আসে বাপের বাড়িতে কিশোরের দল মাতে
সাজ সাজ রবে পাড়াজুড়ে সব হেসে ওঠে তার সাথে।
কিষাণ-কিষাণি মুখরিত সদা ফসল তোলার গানে
আঙিনার কোণে ভিড় করে থাকে নতুন সোনালি ধানে।
বাতাসের বুকে পিঠা পায়েসের সুবাস বেড়ায় ভেসে
কত রং-রূপ সুখের পরশ সোনার বাংলাদেশে।

দিন এলো শিউলির
চিকচিকে সোনারোদ আঙিনায় থির
মুক্তার দানা যেন উষার শিশির।
নীল আকাশের বুকে দুধ-সাদা মেঘ
পানসির মতো ওড়ে, নেই উদ্বেগ।
নদী-পাড়ে কাশফুল হাওয়া চঞ্চল
ঠিক যেন মনে হয় সাদা সাদা জল।
কাশবনে ঢেউ জাগে রুপালি এ ঢেউ
শাড়ি পরে নাচে যেন পরিদের কেউ।
সেখানে বেড়ায় উড়ে চড়ুইয়ের ঝাঁক
শোনা যায় ডাহুকের অবিরাম ডাক।
দিন এলো সুরভিত শিউলি ফোটার
রং আহা কী নিবিড়! হলুদ বোঁটার।
শোভাময় পদ্ম বা শাপলার বিল
লাল নীল প্রজাপতি আলো ঝিলমিল।
কলমী কমলে শোভে জলাশয় আর
বঝাঁক বেঁধে ওড়ে বক জলে ছায়া তার।
বিলে-ঝিলে শুনি পানকৌড়ির সুর
ছন্দের সুরে জাগে নিঝুম দুপুর।
বিকেলের পুবাকাশে রংধনু লাল
সাতরঙে ছড়ালো কী স্বপ্নের জাল!
গোধূলি আকাশপারে সিঁদুরে আবীর
দিনশেষে অবসাদে পাখি খোঁজে নীড়।
শরতের পূর্ণিমা রাত কী মধুর!
রুপা-রং জোছনারা ঝরে ঝুরঝুর।
রাতশেষে ফের আসে শিউলির ভোর-
বাতাসে সুবাস কী যে মনে মায়া ঘোর।
























