০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা সাহিত্যের অগ্রপথিক

ছোট কাগজ সারেঙ

ছোট কাগজের উজ্জ্বলতম সংকলন ‘সারেঙ’। আবদুর রহমান মল্লিকের সম্পাদনায় দারুণ এক সাহিত্য বার্তার বাতিঘর। প্রতিটি সংখ্যা দেদীপ্যমান বিখ্যাত সাহিত্যিক-গবেষকদের মননশীলতার সংযুক্ততায়। বিষয় ও ভাবের বৈচিত্র্যে নতুন ভাবনার আকর; যেন চিন্তার প্রসারের অগ্রপথিক। বর্তমান সংখ্যায় স্থান পেয়েছে দেশবরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরীর স্মরণে পঞ্চান্নটি লেখা।

কবি আসাদ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে স্মরণযোগ্য নাম। সদ্যপ্রয়াত কবির প্রতি ভালোবাসা থেকেই সারেঙ-এর বর্তমান আয়োজন। কবি লিখেছেন বিস্তর, ভাবনার জাল বিস্তার করেছেন পাঠকের অন্তরে। নিজে আলোকিত হয়েছেন, ঋদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রকে। চিন্তার বাতায়নে পাঠককে যেমন টেনেছেন; তেমনই অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি দিয়ে মানুষকে ভালোবেসেছেন অকৃত্রিমতায়। দারুণ সম্ভাবনায় জাগ্রত করেছেন তরুণ সমাজকে। তাঁর নির্মোহ দেশপ্রেম তারুণ্যকে উদ্বেলিত করে, স্বপ্নবোনায়। দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। সাহসের সঙ্গে সত্যের পক্ষে নিয়েছেন অবস্থান। তাই তো নিঃসঙ্কোচে লিখেছেন, ‘তোমার যা বলার ছিল বলছে কী তা বাংলাদেশ।’ আসাদ চৌধুরী দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। স্মৃতিপটে ধারণ করতেন সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বাদ-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সাংস্কৃতিক মুক্তিও। কল্পনা রাজ্যে বিচরণ করেছেন। প্রকাশ করেছেন কবিতায়—‘চিন্তার ধারাভাষ্যের নিপুণতার কারুকার্যে মানুষের প্রতি নির্ভেদ্য ভালোবাসায়-স্বপ্ন কি সাদা-কালো/ সকলেই আমার মতন/ সাদা-কালো স্বপ্ন দেখে থাকেন?/ তবু স্বপ্ন বললে, অন্তত আমার/ লোকে কেন রঙিন ভাবেন?’ এমন কবিকে স্মরণ রাখা সাহিত্যবোদ্ধাদের দায়িত্ব-বিশেষ করে কলমে যাঁদের শক্তি আছে।

আনোয়ারা সৈয়দ হক ‘আসাদ চৌধুরীকে চিরজীবন মনে রাখব’ স্মরণবার্তায় লিখেছেন, ‘মার্কিন কবি অ্যামিলি ডিকেনসন কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি সবাইকে বলে গেছেন তাঁর কবিতা যেন প্রকাশিত না হয়। তিনি তাঁর বোনকে বলেছিলেন মৃত্যুর পর সব পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু তাঁর বোন সে কবিতা পড়ে একটিও পোড়াতে পারেননি। তাঁর কবরস্থানে আমি গিয়েছিলাম। পৃথিবীর কত মানুষ সেখানে আসে। তাঁর কবরে ছোটো ছোটো নুড়ি পাথর, ছোটো ছোটো কাগজে কবিতা লেখা। পাথরের গায়ে নিজের কবিতা, কবির কবিতা উৎকীর্ণ করা। তাঁর কবর ফুল দিয়ে সাজানো, কে কখন ফুল দিয়ে যায় তার কোনো ঠিক নেই। দেশের মানুষ যদি কবিকে ভালো না বাসে সে কবির কখনো মূল্যায়ন হবে না।’ সারেঙ কবিকে ভালোবাসে। সাহিত্যিককে মূল্যায়ন করে।

‘সারেঙ’-এর সতেরোতম সংখ্যায় সম্পাদক নাতিদীর্ঘ একটি সম্পাদকীয় লিখেছেন—তাতে সৃষ্টিশীল মননশীল লেখক মল্লিক সাহেবের মুনশিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে থাকা কবি আসাদ চৌধুরীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অনুপম বিন্যাস প্রতিটি বাক্যে তিনি প্রকাশ করেছেন। কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক, ড. ফজলুল হক সৈকতসহ দেশবরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, গবেষকদের সমাহারে ‘সারেঙ’ নবযৌবনে উদ্বেলিত। তাঁদের লেখনীতে কবি আসাদ চৌধুরী যেন সরল ভঙ্গিমায় পান চিবুতে চিবুতে গল্পের ছলে আমাদের সাহিত্যের আড্ডার কথা বলছেন, নিশানা দেখাচ্ছেন কবিতার মতো সুন্দর ও সত্যের। অসাধারণ হয়েও সাধারণে বাস করা মানুষটি সত্যিই সবার মাঝে বেঁচে আছেন, থাকবেন সাহিত্যের পাতায়। তাঁর মৃত্যু নেই—দেহান্তর হয়েছেন কেবল।

‘সারেঙ’ সাহিত্যজগতে এক ব্যতিক্রমী নাম। সত্যপ্রকাশের সারথি। জীবন-জগতের বোধ ও বোধি সৃষ্টিতে অসাধারণ এক জগৎ। পাঠককে ভাবুক-রাজ্যে বিচরণ করাতে বেশ সার্থক। লেখার উপকরণ তৈরি ও সৃষ্টিতে এর জুড়ি নেই। সেই সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। এর দৃষ্টান্ত সতেরোতম সংখ্যা। দেশের প্রথিতযশা কবি আসাদ চৌধুরীকে এ কাগজ ভোলেনি। স্মরণ করছে বড় আয়োজনে। পাঠকরা অনেক কিছু জানতে পারবেন ‘সারেঙ’র লেখা থেকে। সারেঙ-সদস্য মনে করেন, পড়ার মাধ্যমেই একটি জাতি নেতৃত্ব দিতে পারে।

সারেঙ দিন বদলে, সমাজ বদলে বিশ্বাসী। শত প্রতিকূলতার মাঝেও নিয়মিত প্রকাশ এর চলার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। যাবতীয় সংকীর্ণতাকে দূর করে সারেঙ সত্যিকার অর্থে সাহিত্যের সারেঙ হয়েছে। অগ্রযাত্রার সারথি এ কাগজ ভবিষ্যতেও সমাজ রূপায়নে সহযাত্রী হবে—তা আমি বিশ্বাস করি। চমৎকার প্রচ্ছদে ২৭২ পৃষ্ঠার সারেঙ আসাদ চৌধুরী সংখ্যা বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য ভবনের প্যাভিলিয়নে। আঠারো ফর্মার সংকলনটি পাবেন মাত্র ২৬০ টাকায়।

 

লেখক: ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

স/মিফা

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলা সাহিত্যের অগ্রপথিক

ছোট কাগজ সারেঙ

আপডেট সময় : ০৯:১১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মার্চ ২০২৪

ছোট কাগজের উজ্জ্বলতম সংকলন ‘সারেঙ’। আবদুর রহমান মল্লিকের সম্পাদনায় দারুণ এক সাহিত্য বার্তার বাতিঘর। প্রতিটি সংখ্যা দেদীপ্যমান বিখ্যাত সাহিত্যিক-গবেষকদের মননশীলতার সংযুক্ততায়। বিষয় ও ভাবের বৈচিত্র্যে নতুন ভাবনার আকর; যেন চিন্তার প্রসারের অগ্রপথিক। বর্তমান সংখ্যায় স্থান পেয়েছে দেশবরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরীর স্মরণে পঞ্চান্নটি লেখা।

কবি আসাদ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে স্মরণযোগ্য নাম। সদ্যপ্রয়াত কবির প্রতি ভালোবাসা থেকেই সারেঙ-এর বর্তমান আয়োজন। কবি লিখেছেন বিস্তর, ভাবনার জাল বিস্তার করেছেন পাঠকের অন্তরে। নিজে আলোকিত হয়েছেন, ঋদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রকে। চিন্তার বাতায়নে পাঠককে যেমন টেনেছেন; তেমনই অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি দিয়ে মানুষকে ভালোবেসেছেন অকৃত্রিমতায়। দারুণ সম্ভাবনায় জাগ্রত করেছেন তরুণ সমাজকে। তাঁর নির্মোহ দেশপ্রেম তারুণ্যকে উদ্বেলিত করে, স্বপ্নবোনায়। দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। সাহসের সঙ্গে সত্যের পক্ষে নিয়েছেন অবস্থান। তাই তো নিঃসঙ্কোচে লিখেছেন, ‘তোমার যা বলার ছিল বলছে কী তা বাংলাদেশ।’ আসাদ চৌধুরী দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। স্মৃতিপটে ধারণ করতেন সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বাদ-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সাংস্কৃতিক মুক্তিও। কল্পনা রাজ্যে বিচরণ করেছেন। প্রকাশ করেছেন কবিতায়—‘চিন্তার ধারাভাষ্যের নিপুণতার কারুকার্যে মানুষের প্রতি নির্ভেদ্য ভালোবাসায়-স্বপ্ন কি সাদা-কালো/ সকলেই আমার মতন/ সাদা-কালো স্বপ্ন দেখে থাকেন?/ তবু স্বপ্ন বললে, অন্তত আমার/ লোকে কেন রঙিন ভাবেন?’ এমন কবিকে স্মরণ রাখা সাহিত্যবোদ্ধাদের দায়িত্ব-বিশেষ করে কলমে যাঁদের শক্তি আছে।

আনোয়ারা সৈয়দ হক ‘আসাদ চৌধুরীকে চিরজীবন মনে রাখব’ স্মরণবার্তায় লিখেছেন, ‘মার্কিন কবি অ্যামিলি ডিকেনসন কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি সবাইকে বলে গেছেন তাঁর কবিতা যেন প্রকাশিত না হয়। তিনি তাঁর বোনকে বলেছিলেন মৃত্যুর পর সব পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু তাঁর বোন সে কবিতা পড়ে একটিও পোড়াতে পারেননি। তাঁর কবরস্থানে আমি গিয়েছিলাম। পৃথিবীর কত মানুষ সেখানে আসে। তাঁর কবরে ছোটো ছোটো নুড়ি পাথর, ছোটো ছোটো কাগজে কবিতা লেখা। পাথরের গায়ে নিজের কবিতা, কবির কবিতা উৎকীর্ণ করা। তাঁর কবর ফুল দিয়ে সাজানো, কে কখন ফুল দিয়ে যায় তার কোনো ঠিক নেই। দেশের মানুষ যদি কবিকে ভালো না বাসে সে কবির কখনো মূল্যায়ন হবে না।’ সারেঙ কবিকে ভালোবাসে। সাহিত্যিককে মূল্যায়ন করে।

‘সারেঙ’-এর সতেরোতম সংখ্যায় সম্পাদক নাতিদীর্ঘ একটি সম্পাদকীয় লিখেছেন—তাতে সৃষ্টিশীল মননশীল লেখক মল্লিক সাহেবের মুনশিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে থাকা কবি আসাদ চৌধুরীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অনুপম বিন্যাস প্রতিটি বাক্যে তিনি প্রকাশ করেছেন। কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক, ড. ফজলুল হক সৈকতসহ দেশবরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, গবেষকদের সমাহারে ‘সারেঙ’ নবযৌবনে উদ্বেলিত। তাঁদের লেখনীতে কবি আসাদ চৌধুরী যেন সরল ভঙ্গিমায় পান চিবুতে চিবুতে গল্পের ছলে আমাদের সাহিত্যের আড্ডার কথা বলছেন, নিশানা দেখাচ্ছেন কবিতার মতো সুন্দর ও সত্যের। অসাধারণ হয়েও সাধারণে বাস করা মানুষটি সত্যিই সবার মাঝে বেঁচে আছেন, থাকবেন সাহিত্যের পাতায়। তাঁর মৃত্যু নেই—দেহান্তর হয়েছেন কেবল।

‘সারেঙ’ সাহিত্যজগতে এক ব্যতিক্রমী নাম। সত্যপ্রকাশের সারথি। জীবন-জগতের বোধ ও বোধি সৃষ্টিতে অসাধারণ এক জগৎ। পাঠককে ভাবুক-রাজ্যে বিচরণ করাতে বেশ সার্থক। লেখার উপকরণ তৈরি ও সৃষ্টিতে এর জুড়ি নেই। সেই সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। এর দৃষ্টান্ত সতেরোতম সংখ্যা। দেশের প্রথিতযশা কবি আসাদ চৌধুরীকে এ কাগজ ভোলেনি। স্মরণ করছে বড় আয়োজনে। পাঠকরা অনেক কিছু জানতে পারবেন ‘সারেঙ’র লেখা থেকে। সারেঙ-সদস্য মনে করেন, পড়ার মাধ্যমেই একটি জাতি নেতৃত্ব দিতে পারে।

সারেঙ দিন বদলে, সমাজ বদলে বিশ্বাসী। শত প্রতিকূলতার মাঝেও নিয়মিত প্রকাশ এর চলার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। যাবতীয় সংকীর্ণতাকে দূর করে সারেঙ সত্যিকার অর্থে সাহিত্যের সারেঙ হয়েছে। অগ্রযাত্রার সারথি এ কাগজ ভবিষ্যতেও সমাজ রূপায়নে সহযাত্রী হবে—তা আমি বিশ্বাস করি। চমৎকার প্রচ্ছদে ২৭২ পৃষ্ঠার সারেঙ আসাদ চৌধুরী সংখ্যা বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য ভবনের প্যাভিলিয়নে। আঠারো ফর্মার সংকলনটি পাবেন মাত্র ২৬০ টাকায়।

 

লেখক: ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

স/মিফা