০৭:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নগরবাসীকে ঈদযাত্রায় ভোগাবে বাহন খরচ

 

➤ ঈদ আসলেই ভাড়া বাড়ে লঞ্চ ও বাসে
➤ রেলের ভাড়া বাড়ানোর পরিকল্পনা, মন্ত্রীর না
➤ নিয়ন্ত্রণে সতর্ক সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়বেন ঢাকাবাসী। প্রতিবছরই দুই ঈদের আগে বাড়তি ভাড়া গোনার বাজে অভিজ্ঞতা নিতে হয় গ্রামমুখী মানুষকে। বিশেষ করে বাসের ভাড়া বেড়ে হয় প্রায় দ্বিগুণ। এবছর ঈদে যেন ভাড়া নৈরাজ্য না হয় সে লক্ষ্যে সতর্ক অবস্থানে আছে সরকার। বাস মালিকরাও বার্তা দিয়েছেন সরকারকে সহয়তার। তবে বাসের আগাম টিকিট বিক্রির প্রথম দিন গতকাল শুক্রবারই প্রায় দ্বিগুণ দামে টিকিট বিক্রি হতে দেখা গেছে। সচেতন মহল বলছে, প্রতিবছর সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার কোনো ফলাফল আসে না। বাস এবং লঞ্চে বাড়ানো হয় ভাড়া। এবছরও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে করছেন না তারা। পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে একই ধরনের ইঙ্গিত। তারা বলছেন, বাসের ভাড়া না বাড়িয়ে সুযোগ নেই। বছরেই দুই ঈদেই বাড়তি আয়ের সুযোগ তাদের। এছাড়াও কমেনি তেল খরচ, সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। এছাড়াও আছে সড়কে নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি। তবে মালিকদের পক্ষ থেকে কিছুটা সহনীয় হতে পারে।

তবে বাড়তি ভাড়া সহনীয় হলেও তা কতটুকু গ্রামমুখী মানুষকে স্বস্তি দিবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে দ্রবমূল্যের ঊর্ধŸগতিতে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রায় যেকোনো বাড়তি খরচ করা কঠিন হবে তাদের জন্য।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জামিল হোসেন বলেন, জিনিসপত্রের যা দাম তাতে স্বল্প বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এরপর পরিবার নিয়ে বাড়িতে গেলেও প্রায় দশ হাজার টাকা খরচ; যা সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ প্রায়। তাই এবার গ্রামে না গিয়ে ঢাকাতে ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

গত মঙ্গলবার রাজারবাগ পুলিশ অডিটরিয়ামে পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মহাসড়ক/সড়ক পথে যাতায়াতকারী যাত্রীসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় আন্তঃজেলা বা দূরপাল্লার যদি কোনো গণপরিবহন বাড়তি ভাড়া নেয়, সেটির প্রমাণ যদি আমরা পাই, তবে সেই গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া, নেওয়া হবে আইনানুগ পদক্ষেপ।
যদিও মালিক সমিতির সভাপতির কথার উল্টো চিত্র দেখা গেছে গতকালই। এদিন শুরু হয় ঈদ উপলক্ষে বাসগুলোর আগাম টিকিট বিক্রি। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালি টার্মিনালে দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে প্রায় দ্বিগুণ দামে সংগ্রহ করতে হয়েছে আগাম টিকিট যাত্রীদের।

সায়েদাবাদে কথা হয় টিকিট করতে আসা শাহিনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, শেষ সময়ে টিকিট পাওয়া মুশকিল হয়। তাই আগেভাগে টিকিট নিতে এসেছি। টিকিটের দাম ঈদের আগে প্রতিবারই দ্বিগুণ হয়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। দ্বিগুণ দামে টিকিট নিয়েছি। পরিবারের সদস্যসহ সবার জন্য এসি গাড়ির টিকিট নিতে খরচ হয়েছে ছয় হাজার টাকা।
সায়েদাবাদে রয়েল কাউন্টারের ম্যানেজার রাইসুল ইসলাম বলেন, ভাড়া কম নেওয়ার কথা মালিকপক্ষ কিছু বলেনি। ঈদের সময় ভাড়া বেশি হয় প্রতিবারই। কারণ ফিরতি পথে যাত্রী পাই না আমরা। গাড়ি খালি আসে।

বাড়তি ভাড়া নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাস মালিক বলেন, তেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বেড়েছে। এছাড়া ঈদের সময় একমুখী যাতায়াত হয়। ফিরতি সময় যাত্রী থাকে না। ক্ষতি পোষাতে ভাড়া বাড়ানো হয়। একারণে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর বাইরে সরকার যদি আমাদের নিশ্চয়তা দেয় কোনো চাঁদাবাজি হবে না তাহলে আমরা ভাড়া কমাতে পারব। শুধু ঈদের সময় নয় সবসময়ই ভাড়া এক-চতুর্থাংশ কমানো সম্ভব।

গত মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ফলোআপ সভায় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে নামেই চাঁদা আদায় করুক না কেন, সব ধরনের চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ডিএমপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সবশেষ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষ্যে সড়কপথে যাত্রীসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ঈদে মালিকদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না। তারপরও প্রতিবার অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ আসে। আমাদের আসলে এত পরিমাণ গাড়ি। যার কারণে সবগুলোকে একসঙ্গে দেখা সম্ভব হয় না। প্রতিবার কিছু অসাধু মানুষ আগেই বেশি করে টিকিট কেটে রেখে দেয়, এরপর ঈদের আগে বেশি দামে বিক্রি করে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগালে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

আর সাবেক নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও পরিবহন মালিক সমিতির নেতা শাজাহান খান বলেন, এবার ঈদে আশা করছি যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। তবে, ভাড়া তৃতীয় পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তারা সড়কের চাঁদাবাজিতে মিডিয়া হিসেবে কাজ করে। তাদের আয় পরিবহন মালিকদের থেকেও বেশি। তারা গাড়িগুলো থেকে যে পরিমাণ টাকা নেয়, তা একটি গাড়ির ভাড়ার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

তিনি বলেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলে জিনিসপত্রের দাম কমে যাবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারছি না। নির্দেশনা জারি করলেও শতভাগ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এটা সেতুমন্ত্রীকে দেখার অনুরোধ করছি।

পরিবহনে চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, চাঁদাবাজি একটি পুরোনো কাজ। তা বন্ধ করতে পারবেন? বন্ধ করা কঠিন। হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। দুর্নীতি আমেরিকাসহ সবখানে হয়। কিন্তু তা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। চাঁদাবাজিও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত কথা বলেছেন। পরিবহন চাঁদাবাজির কারণ পণ্যের দাম বাড়ে।

তবে সচেতন মহল বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যত ফলাফল থাকে শূন্য। মনোপলি ভাঙতে না পারলে কমবে না ভাড়া।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন বিষয়ক গবেষক আশীষ কুমার দে বলেন, মেনোপলি ব্যবসার কারণে ভাড়া কমছে না। এর বড় কারণ রাষ্ট্রীয় যে পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাস কম, জনবলও কম। একইভাবে ট্রেনেও একই অবস্থা। ফলে মানুষ বাসের উপর নির্ভর হয়ে পড়ে। এই সুযোগ নিয়ে বাস মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। আর বাসমালিকরা চাঁদাবাজির কথা বললেও চাঁদাবাজি করেন বাসমালিক নেতারা জড়িত, হাইওয়েতে পুলিশ চাঁদাবজি করে আবার এখন সরকারি দলের লোকেরাও এই চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, যাদের বেতন কম এই ভাড়া বেশির কারণে ট্রাকে ওঠে, ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠে, ফিটনেসবিহীন লঞ্চে ওঠে। এ কারণে ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। বাস মালিক নেতারা যা-ই বলুক সেটা লোক দেখানো। তারা ভাড়া কমাবে না বাস্তবে।

এদিকে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের রেয়াত বা ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রেলওয়ে। এর ফলে ট্রেনের ভাড়া কিছুটা বাড়বে। বাড়তি এই ভাড়ার হার আগামী ১ এপ্রিল থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে, স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে শোভন শ্রেণির কামরায় ২০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া দিতে হবে। এসি, প্রথম শ্রেণি বা তদূর্ধ্ব যেকোনো শ্রেণির কামরার জন্য ৩০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেয়াত বা ছাড় প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের জন্য গত মাসে পাঠানো হয়। ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মেলে। এরপর রেলপথ মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন করতে রেল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। আগামী ১ এপ্রিল তা থেকে ছাড় প্রত্যাহারের বিষয়টি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।
যদিও গত শনিবার রেলপথ মন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম বলেন, আপাতত ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে বর্তমান নির্ধারিত ভাড়া অনেকদিন ধরে, ২০১৬ সাল থেকে আছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু ট্রেনের টিকিটের দাম বাড়েনি। তেলের দাম বেড়েছে, বগির দাম বেড়েছে, ইঞ্জিনের দাম বেড়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে। যখন আমরা ট্রেনের টিকিটের ভাড়া বাড়াবো, তখন আগে থেকে জানিয়েই বাড়াবো।

জনপ্রিয় সংবাদ

নগরবাসীকে ঈদযাত্রায় ভোগাবে বাহন খরচ

আপডেট সময় : ০৪:৪৩:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০২৪

 

➤ ঈদ আসলেই ভাড়া বাড়ে লঞ্চ ও বাসে
➤ রেলের ভাড়া বাড়ানোর পরিকল্পনা, মন্ত্রীর না
➤ নিয়ন্ত্রণে সতর্ক সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়বেন ঢাকাবাসী। প্রতিবছরই দুই ঈদের আগে বাড়তি ভাড়া গোনার বাজে অভিজ্ঞতা নিতে হয় গ্রামমুখী মানুষকে। বিশেষ করে বাসের ভাড়া বেড়ে হয় প্রায় দ্বিগুণ। এবছর ঈদে যেন ভাড়া নৈরাজ্য না হয় সে লক্ষ্যে সতর্ক অবস্থানে আছে সরকার। বাস মালিকরাও বার্তা দিয়েছেন সরকারকে সহয়তার। তবে বাসের আগাম টিকিট বিক্রির প্রথম দিন গতকাল শুক্রবারই প্রায় দ্বিগুণ দামে টিকিট বিক্রি হতে দেখা গেছে। সচেতন মহল বলছে, প্রতিবছর সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার কোনো ফলাফল আসে না। বাস এবং লঞ্চে বাড়ানো হয় ভাড়া। এবছরও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে করছেন না তারা। পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে একই ধরনের ইঙ্গিত। তারা বলছেন, বাসের ভাড়া না বাড়িয়ে সুযোগ নেই। বছরেই দুই ঈদেই বাড়তি আয়ের সুযোগ তাদের। এছাড়াও কমেনি তেল খরচ, সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। এছাড়াও আছে সড়কে নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি। তবে মালিকদের পক্ষ থেকে কিছুটা সহনীয় হতে পারে।

তবে বাড়তি ভাড়া সহনীয় হলেও তা কতটুকু গ্রামমুখী মানুষকে স্বস্তি দিবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে দ্রবমূল্যের ঊর্ধŸগতিতে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রায় যেকোনো বাড়তি খরচ করা কঠিন হবে তাদের জন্য।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জামিল হোসেন বলেন, জিনিসপত্রের যা দাম তাতে স্বল্প বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এরপর পরিবার নিয়ে বাড়িতে গেলেও প্রায় দশ হাজার টাকা খরচ; যা সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ প্রায়। তাই এবার গ্রামে না গিয়ে ঢাকাতে ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

গত মঙ্গলবার রাজারবাগ পুলিশ অডিটরিয়ামে পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মহাসড়ক/সড়ক পথে যাতায়াতকারী যাত্রীসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় আন্তঃজেলা বা দূরপাল্লার যদি কোনো গণপরিবহন বাড়তি ভাড়া নেয়, সেটির প্রমাণ যদি আমরা পাই, তবে সেই গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া, নেওয়া হবে আইনানুগ পদক্ষেপ।
যদিও মালিক সমিতির সভাপতির কথার উল্টো চিত্র দেখা গেছে গতকালই। এদিন শুরু হয় ঈদ উপলক্ষে বাসগুলোর আগাম টিকিট বিক্রি। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালি টার্মিনালে দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে প্রায় দ্বিগুণ দামে সংগ্রহ করতে হয়েছে আগাম টিকিট যাত্রীদের।

সায়েদাবাদে কথা হয় টিকিট করতে আসা শাহিনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, শেষ সময়ে টিকিট পাওয়া মুশকিল হয়। তাই আগেভাগে টিকিট নিতে এসেছি। টিকিটের দাম ঈদের আগে প্রতিবারই দ্বিগুণ হয়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। দ্বিগুণ দামে টিকিট নিয়েছি। পরিবারের সদস্যসহ সবার জন্য এসি গাড়ির টিকিট নিতে খরচ হয়েছে ছয় হাজার টাকা।
সায়েদাবাদে রয়েল কাউন্টারের ম্যানেজার রাইসুল ইসলাম বলেন, ভাড়া কম নেওয়ার কথা মালিকপক্ষ কিছু বলেনি। ঈদের সময় ভাড়া বেশি হয় প্রতিবারই। কারণ ফিরতি পথে যাত্রী পাই না আমরা। গাড়ি খালি আসে।

বাড়তি ভাড়া নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাস মালিক বলেন, তেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বেড়েছে। এছাড়া ঈদের সময় একমুখী যাতায়াত হয়। ফিরতি সময় যাত্রী থাকে না। ক্ষতি পোষাতে ভাড়া বাড়ানো হয়। একারণে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর বাইরে সরকার যদি আমাদের নিশ্চয়তা দেয় কোনো চাঁদাবাজি হবে না তাহলে আমরা ভাড়া কমাতে পারব। শুধু ঈদের সময় নয় সবসময়ই ভাড়া এক-চতুর্থাংশ কমানো সম্ভব।

গত মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ফলোআপ সভায় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে নামেই চাঁদা আদায় করুক না কেন, সব ধরনের চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ডিএমপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সবশেষ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষ্যে সড়কপথে যাত্রীসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ঈদে মালিকদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না। তারপরও প্রতিবার অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ আসে। আমাদের আসলে এত পরিমাণ গাড়ি। যার কারণে সবগুলোকে একসঙ্গে দেখা সম্ভব হয় না। প্রতিবার কিছু অসাধু মানুষ আগেই বেশি করে টিকিট কেটে রেখে দেয়, এরপর ঈদের আগে বেশি দামে বিক্রি করে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগালে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

আর সাবেক নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও পরিবহন মালিক সমিতির নেতা শাজাহান খান বলেন, এবার ঈদে আশা করছি যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। তবে, ভাড়া তৃতীয় পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তারা সড়কের চাঁদাবাজিতে মিডিয়া হিসেবে কাজ করে। তাদের আয় পরিবহন মালিকদের থেকেও বেশি। তারা গাড়িগুলো থেকে যে পরিমাণ টাকা নেয়, তা একটি গাড়ির ভাড়ার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

তিনি বলেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলে জিনিসপত্রের দাম কমে যাবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারছি না। নির্দেশনা জারি করলেও শতভাগ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এটা সেতুমন্ত্রীকে দেখার অনুরোধ করছি।

পরিবহনে চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, চাঁদাবাজি একটি পুরোনো কাজ। তা বন্ধ করতে পারবেন? বন্ধ করা কঠিন। হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। দুর্নীতি আমেরিকাসহ সবখানে হয়। কিন্তু তা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। চাঁদাবাজিও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত কথা বলেছেন। পরিবহন চাঁদাবাজির কারণ পণ্যের দাম বাড়ে।

তবে সচেতন মহল বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যত ফলাফল থাকে শূন্য। মনোপলি ভাঙতে না পারলে কমবে না ভাড়া।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন বিষয়ক গবেষক আশীষ কুমার দে বলেন, মেনোপলি ব্যবসার কারণে ভাড়া কমছে না। এর বড় কারণ রাষ্ট্রীয় যে পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাস কম, জনবলও কম। একইভাবে ট্রেনেও একই অবস্থা। ফলে মানুষ বাসের উপর নির্ভর হয়ে পড়ে। এই সুযোগ নিয়ে বাস মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। আর বাসমালিকরা চাঁদাবাজির কথা বললেও চাঁদাবাজি করেন বাসমালিক নেতারা জড়িত, হাইওয়েতে পুলিশ চাঁদাবজি করে আবার এখন সরকারি দলের লোকেরাও এই চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, যাদের বেতন কম এই ভাড়া বেশির কারণে ট্রাকে ওঠে, ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠে, ফিটনেসবিহীন লঞ্চে ওঠে। এ কারণে ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। বাস মালিক নেতারা যা-ই বলুক সেটা লোক দেখানো। তারা ভাড়া কমাবে না বাস্তবে।

এদিকে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের রেয়াত বা ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রেলওয়ে। এর ফলে ট্রেনের ভাড়া কিছুটা বাড়বে। বাড়তি এই ভাড়ার হার আগামী ১ এপ্রিল থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে, স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে শোভন শ্রেণির কামরায় ২০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া দিতে হবে। এসি, প্রথম শ্রেণি বা তদূর্ধ্ব যেকোনো শ্রেণির কামরার জন্য ৩০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেয়াত বা ছাড় প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের জন্য গত মাসে পাঠানো হয়। ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মেলে। এরপর রেলপথ মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন করতে রেল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। আগামী ১ এপ্রিল তা থেকে ছাড় প্রত্যাহারের বিষয়টি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।
যদিও গত শনিবার রেলপথ মন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম বলেন, আপাতত ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে বর্তমান নির্ধারিত ভাড়া অনেকদিন ধরে, ২০১৬ সাল থেকে আছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু ট্রেনের টিকিটের দাম বাড়েনি। তেলের দাম বেড়েছে, বগির দাম বেড়েছে, ইঞ্জিনের দাম বেড়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে। যখন আমরা ট্রেনের টিকিটের ভাড়া বাড়াবো, তখন আগে থেকে জানিয়েই বাড়াবো।