০৬:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজার

➤সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মিলছে না চাহিদার ওষুধ
➤কোম্পানিগুলোতে চলছে মুনাফার মহোৎসব
➤ভেজাল ওষুধে প্রতারিত হচ্ছেন স্বজনরা, মৃত্যুঝুঁকিতে রোগীরা
➤সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত ও মনিটরিংয়ের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
➤মূল্য বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের

করোনাকালীন সময়ে কাঁচামালের আমদানি ও উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে একদফা বাড়ার পর আবারও কোনো ঘোষণা ছাড়াই বেড়েছে বেশির ভাগ ওষুধের দাম। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নানা কৌশলে দেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানি মূল্য বাড়িয়ে মুনাফার মহোৎসবে মেতে উঠেছে। তদারকির অভাবে সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও মিলছে না চাহিদার ওষুধ।

নামিদামি কোম্পানিগুলো মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ায় একশ্রেণির প্রতিষ্ঠান ভেজাল ওষুধ উৎপাদন করে কম মূল্যে মিটফোর্ড ওষুধ মার্কেটের মাধ্যমে সারা দেশে ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীসহ তাদের স্বজনেরা। ভেজাল ওষুধ সেবনে মুমূর্ষু অনেক রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছেন। এ অবস্থায় চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এর পেছনে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারসহ ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং মূল্যবৃদ্ধি রোধে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মাঠপর্যায়ের খুচরা দোকানে প্রতিনিয়ত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে, বিভিন্ন কারণে ওষুধে মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক ঘটনা। এদিকে সব ধরনের ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি রোধে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি শারীরিক অসুস্থতার জন্য সেবা নিতে ঢাকা মেডিক্যালের বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে যান মাফিয়া রহমান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শ^াসকষ্ট খুঁজে পায় ডাক্তার। এরপর হাসপাতাল থেকে একপাতা হিস্টাসিন ও ১ পাতা প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। বাকি দামি ওষুধগুলো বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকসহ অতিমূল্যবান ওষুধ ছিল। যা কিনতে গিয়ে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন ওই ওষুধ সেবন করে ভালো না হওয়ায় এক আত্মীয়ের পরামর্শে ধানমন্ডির মিরপুর রোডে বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে এক অধ্যাপকের শরণাপন্ন হন। সেখানে ইসিজি, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ব্লাডসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করান। পরে চিকিৎসক জানতে পারেন তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। সেখানে টানা ৫ দিন ভর্তি থেকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করে চিকিৎসা শেষে নিজ বাসায় ফিরে যান। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আবারো গুরুতর অসুস্থ হন একই রোগে। সেদিন দিবাগত মধ্যরাতে মোহাম্মদপুরের বেসরকারি সিটি হাসপাতালে ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসানের অধীনে ভর্তি হন তিনি। সুস্থ হয়ে ১ মে বাসায় ফেরেন। উপদেশ দেন নিয়মিত ওষুধ সেবনের। ইনজেকশন- আই-পেনাম, মক্সকুইন, ট্যাবলেট- টোফেন, থাইরক্স, রসুটিন, ডক্সিভা, বাইজুরান, মোনাস, প্রিডিক্সা, ওমাস্টিন, ভিসকোটিন, ইডিলস, ইমপালিনা, প্ল্যাগরিন, নেবুলাইজেশন উইনডাল প্লাস ও বুডিকোর্ট ইত্যাদি। এসব ওষুধ সব ফার্মেসিতেও সহজে পাননি।

যেখানে পেয়েছেন, সেখানেই মোড়কের গায়ে লেখার চাইতেও বেশি দামে ওষুধ কিনতে হয়েছে তাকে। ওই ওষুধ কিনতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ে এ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। দফায় দফায় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্রয়ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন মাফিয়া রহমান। করোনা মহামারির সময় ওষুধের যে দাম বেড়েছিল, তা আর কমেনি। চলতি বছরে আবারও শুরু হয়েছে অস্থিরতা। সব থেকে বেশি বেড়েছে অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধের দাম। চলতি বছরের গত দুই মাসে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে উৎপাদিত ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। অন্তত ৫০ ধরনের ওষুধের দাম সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ওষুধ তৈরির সব কাঁচামাল আমদানিতে বেড়েছে খরচ, আর তাই বেড়েছে ওষুধের দাম।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় দেড় হাজারের বেশি জীবনরক্ষাকারী ২৭ হাজারের বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় আছে মাত্র ২১৯টি। এর মধ্যে ১১৭টি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার। অন্যান্য ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। অথচ একসময় ২০০-এর বেশি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে দিত সরকার। কিন্তু সেই সংখ্যা এখন আরও কমেছে। সম্প্রতি ওষুধের দাম বাড়াকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন) মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, ওষুধের দাম কিছুটা বেড়েছে। এটি অস্বীকার করছি না। আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য এবং ডলারের ক্রাইসিসের জন্য এটি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসকের পরামর্শে রোগমুক্তির জন্য রোগীরা ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু অতিমূল্যের কারণে অনেকেই ওষুধ কিনতে না পেরে রোগব্যাধি লালন করে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতিযোগিতার বাজারে কিছু নামসর্বস্ব কোম্পানিও গুণগত মান যাচাই না করে ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এতে অনেক রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছেন। ওষুধর মূল্য কমিয়ে আনতে হলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি রোধে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মাঠপর্যায়ের খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে কিনা তা প্রতিনিয়ত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে সব ধরনের ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওষুধ প্রশাসনের অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে অব্যাহতভাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি রোধে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। এছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি করা অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ সময় আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়। সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সেলিম আজাদ ও আনিচ উল মাওয়া।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাজ্য হাইকমিশনে ওসমান হাদির ভাই ওমরকে নিয়োগ

নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজার

আপডেট সময় : ০৭:৫৪:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৪

➤সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মিলছে না চাহিদার ওষুধ
➤কোম্পানিগুলোতে চলছে মুনাফার মহোৎসব
➤ভেজাল ওষুধে প্রতারিত হচ্ছেন স্বজনরা, মৃত্যুঝুঁকিতে রোগীরা
➤সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত ও মনিটরিংয়ের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
➤মূল্য বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের

করোনাকালীন সময়ে কাঁচামালের আমদানি ও উৎপাদন কমে যাওয়ার অজুহাতে একদফা বাড়ার পর আবারও কোনো ঘোষণা ছাড়াই বেড়েছে বেশির ভাগ ওষুধের দাম। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নানা কৌশলে দেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানি মূল্য বাড়িয়ে মুনাফার মহোৎসবে মেতে উঠেছে। তদারকির অভাবে সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও মিলছে না চাহিদার ওষুধ।

নামিদামি কোম্পানিগুলো মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ায় একশ্রেণির প্রতিষ্ঠান ভেজাল ওষুধ উৎপাদন করে কম মূল্যে মিটফোর্ড ওষুধ মার্কেটের মাধ্যমে সারা দেশে ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীসহ তাদের স্বজনেরা। ভেজাল ওষুধ সেবনে মুমূর্ষু অনেক রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছেন। এ অবস্থায় চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এর পেছনে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারসহ ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং মূল্যবৃদ্ধি রোধে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মাঠপর্যায়ের খুচরা দোকানে প্রতিনিয়ত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে, বিভিন্ন কারণে ওষুধে মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক ঘটনা। এদিকে সব ধরনের ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি রোধে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি শারীরিক অসুস্থতার জন্য সেবা নিতে ঢাকা মেডিক্যালের বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে যান মাফিয়া রহমান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শ^াসকষ্ট খুঁজে পায় ডাক্তার। এরপর হাসপাতাল থেকে একপাতা হিস্টাসিন ও ১ পাতা প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। বাকি দামি ওষুধগুলো বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকসহ অতিমূল্যবান ওষুধ ছিল। যা কিনতে গিয়ে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন ওই ওষুধ সেবন করে ভালো না হওয়ায় এক আত্মীয়ের পরামর্শে ধানমন্ডির মিরপুর রোডে বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে এক অধ্যাপকের শরণাপন্ন হন। সেখানে ইসিজি, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ব্লাডসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করান। পরে চিকিৎসক জানতে পারেন তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। সেখানে টানা ৫ দিন ভর্তি থেকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করে চিকিৎসা শেষে নিজ বাসায় ফিরে যান। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আবারো গুরুতর অসুস্থ হন একই রোগে। সেদিন দিবাগত মধ্যরাতে মোহাম্মদপুরের বেসরকারি সিটি হাসপাতালে ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসানের অধীনে ভর্তি হন তিনি। সুস্থ হয়ে ১ মে বাসায় ফেরেন। উপদেশ দেন নিয়মিত ওষুধ সেবনের। ইনজেকশন- আই-পেনাম, মক্সকুইন, ট্যাবলেট- টোফেন, থাইরক্স, রসুটিন, ডক্সিভা, বাইজুরান, মোনাস, প্রিডিক্সা, ওমাস্টিন, ভিসকোটিন, ইডিলস, ইমপালিনা, প্ল্যাগরিন, নেবুলাইজেশন উইনডাল প্লাস ও বুডিকোর্ট ইত্যাদি। এসব ওষুধ সব ফার্মেসিতেও সহজে পাননি।

যেখানে পেয়েছেন, সেখানেই মোড়কের গায়ে লেখার চাইতেও বেশি দামে ওষুধ কিনতে হয়েছে তাকে। ওই ওষুধ কিনতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ে এ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। দফায় দফায় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্রয়ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন মাফিয়া রহমান। করোনা মহামারির সময় ওষুধের যে দাম বেড়েছিল, তা আর কমেনি। চলতি বছরে আবারও শুরু হয়েছে অস্থিরতা। সব থেকে বেশি বেড়েছে অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধের দাম। চলতি বছরের গত দুই মাসে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে উৎপাদিত ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। অন্তত ৫০ ধরনের ওষুধের দাম সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ওষুধ তৈরির সব কাঁচামাল আমদানিতে বেড়েছে খরচ, আর তাই বেড়েছে ওষুধের দাম।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় দেড় হাজারের বেশি জীবনরক্ষাকারী ২৭ হাজারের বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় আছে মাত্র ২১৯টি। এর মধ্যে ১১৭টি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার। অন্যান্য ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। অথচ একসময় ২০০-এর বেশি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে দিত সরকার। কিন্তু সেই সংখ্যা এখন আরও কমেছে। সম্প্রতি ওষুধের দাম বাড়াকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন) মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, ওষুধের দাম কিছুটা বেড়েছে। এটি অস্বীকার করছি না। আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য এবং ডলারের ক্রাইসিসের জন্য এটি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসকের পরামর্শে রোগমুক্তির জন্য রোগীরা ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু অতিমূল্যের কারণে অনেকেই ওষুধ কিনতে না পেরে রোগব্যাধি লালন করে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতিযোগিতার বাজারে কিছু নামসর্বস্ব কোম্পানিও গুণগত মান যাচাই না করে ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এতে অনেক রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছেন। ওষুধর মূল্য কমিয়ে আনতে হলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি রোধে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মাঠপর্যায়ের খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে কিনা তা প্রতিনিয়ত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে সব ধরনের ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওষুধ প্রশাসনের অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে অব্যাহতভাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি রোধে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। এছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি করা অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ সময় আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়। সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সেলিম আজাদ ও আনিচ উল মাওয়া।