০৫:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
দুর্নীতির আখড়া রাজউক

টেবিলে টেবিলে ঘোরে ভবনের নকশা অনুমোদনের ফাইল

◉ নির্ধারিত ফিতে মেলে না অনুমোদন, টাকায় মেলে ছাড়পত্র!
◉ ঝুলে আছে কয়েক হাজার নকশা, ভোগান্তিতে গ্রাহকরা
◉ ৪৫ কর্মদিবসে অনুমোদনের বিধান থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন
◉ তথ্য প্রদানে রাজউকের গড়িমসি
◉ নকশা অনুমোদনে ২ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের তথ্য পেয়েছে টিআইবি
◉ অনিয়মের খোঁজে দুদক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) চলছে চরম নকশাজট। বর্তমানে কয়েক হাজার নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সময়মতো নকশার অনুমোদন না পাওয়ায় গ্রাহকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজউকে অনলাইন প্রক্রিয়া চালু হলেও পদে পদে দুর্ভোগে পড়ছেন আবেদনকারীরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত ফিতে আবেদন করা গেলেও রাজউকে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটে জড়িত কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে উপঢৌকন দিলে দ্রুতই নকশা অনুমোদন হয়ে যায়। নয়তো বছরের পর বছর এ টেবিল থেকে ও টেবিল ঘুরতে হয় গ্রাহককে। বিধি অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে ৪৫ কর্মদিবসে নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র এর পুরোটাই উল্টো। দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে রাজউক। ইতোমধ্যেই অনিয়মের অভিযোগে রাজউকে অভিযান চালিয়েছে দুদক। তবে ঘুষ লেনেদেনের সুস্পষ্ট কোনো ফুটেজ না থাকায় কাউকে ধরতে পারেনি সংস্থাটি। এদিকে টিআইবি’র এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ভবনের নকশা অনুমোদনে বিভিন্ন অজুহাতে রাজউক কর্মকর্তারা ঘুষ নেন ২ কোটি টাকা। এসব বিষয়ে জানতে রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তথ্য প্রদানে গড়িমসি করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, নানান কারণে নকশা অনুমোদনে সময় লাগতে পারে। এটা নতুন কিছু নয়। প্রভাবশালীদের কারণে অনেক সময় কিছুটা অনিয়ম ঘটতে পারে। তবে বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। অনিয়ম রোধে পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনে করা হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়ছে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মো. মমিন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ভবনের নকশা অনুমোদনে নতুন আদেশ জারি করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটিই অনলাইনে। এতে করে নকশাজট চরম আকার ধারণ করছে। প্রতিবছরই শত শত গ্রাহকের আবেদন নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। অথচ নকশা অনুমোদন কমিটির (বিসি কমিটি) বৈঠকও নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে না। রাজউকের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি ও ঝামেলাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র পেতে একজন আবেদনকারীকে কমপক্ষে ১৫টি টেবিলে স্বাক্ষরের জন্য ঘুরতে হয়। আবেদনকারীর আবেদনপত্রে কোনো জটিলতা বা ভুল দেখা দিলে এবং কোনো আপত্তি থাকলে রাজউক এক মাসের মধ্যে তা গ্রাহককে জানিয়ে দেবে। অথচ এ নিয়ম রাজউক নিজেই মানছে না। আবেদনকারীকে পদে পদে ঘুষ দিতে হচ্ছে। যে কারণে ঝামেলা এড়াতে গ্রাহকরা সরাসরি কিংবা দালালের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াকেই বৈধ মনে করে থাকেন। আর বহুতল ভবন বা সরকার চিহ্নিত বিশেষ ভবনের পাশে ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের জন্য অপেক্ষার পালা আরো অনেক বেশি। রাজধানীর দুই কোটিরও অধিক মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে রাজউকে নগর পরিকল্পনাবিদ রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ে আছেন ১৮ জন। এছাড়া রাজউকের অন্যান্য বিভাগে জনবল সংকট রয়েছে, যা নকশাজটের একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন নগর উন্নয়ন বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, রাজউকে প্রতিবছর গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার নকশা জমা পড়ে। যার মধ্যে অর্ধেকেরও কম অনুমোদন পায়। গ্রাহকদের অভিযোগ, নানান অজুহাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যায় আবদার মেটাতে না পারার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নকশার অনুমোদনে বিলম্ব হয় এবং বছরের পর বছর লেগে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তার টেবিলে আসার পর সামান্য ত্রুটি ধরে ফাইল আটকে রাখেন। পার্টির সঙ্গে বনিবনা না হওয়া পর্যন্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। এ কারণে গ্রাহকরা দালালনির্ভর হতে বাধ্য হন। গ্রাহকদের অভিযোগ, রাজউকের বিল্ডিং নকশা অনুমোদন কমিটির সদস্যরা নিজেদেরই দালালচক্র নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। এতে করে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্নের ক্ষেত্রে রাজউকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন জোনে শক্তিশালী সিন্টিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই লাখ লাখ টাকার রফাদফায় দ্রুত মেলে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ছাত্রপত্র।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিধি অনুযায়ী রাজধানীতে ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারীকে অনলাইনে সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। এরপর রাজউক কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর দেওয়া কাগজপত্র পর্যালোচনা ও ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ৪৫ কর্মদিবসে ছাড়পত্র দিবে। জানা যায়, নানান জটিলতার কারণে অনুমোদন ছাড়াই পুরান ঢাকার লালবাগের নবাবগঞ্জ রোডের ৬৪/১ নম্বর হোল্ডিংয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে একটি পুরোনো পাঁচতলা ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত করে পেছনের অংশে ৮ তলা ভবন নির্মাণ করছেন আসাদুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান গং। বিষয়টি রাজউকের নজরে এলে ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাজউকের অথরাইজড অফিসার-৫/৩ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভবন মালিকদের একটি নোটিস দেন। সাত কার্যদিবসে নোটিসের জবাব দিতে বললেও নোটিসে কোনো সাড়া দেননি মালিকরা। জানা যায়, উৎকোচ নিয়েই দায় সেরেছে রাজউকের অথরাইজড অফিসার-৫/৩ এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এরপর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। ভবন নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও রাজউকের কেউ এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবনের মালিকানা অংশীদার মনিরুজ্জামান সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এটি রাজউক ভালো বলতে পারবে। অনুমোদন দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি রাজউকের। এ বিষয়টি আমাদের অংশীদারের অন্য একজন দেখভাল করছেন। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না ও বলতেও পারবো না। এদিকে কামরাঙ্গীরচরে রসুলপুর ব্রিজ মার্কেটে পান্নু মিয়ার বাড়ি সংলগ্ন একটি বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে ৩ বছর আগে। ওই ভবনের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হলে মালিকপক্ষ রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দফায় দফায় উৎকোচ দিলেও অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখেছেন অথরাইজড অফিসার। অনুমোদন পাইয়ে দিতে নানান অজুহাতে বিভিন্ন ব্যক্তি ওই মালিকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিলেও এখনো কোনো সুফল পাননি ভবন মালিক। এখনো ঝুলে আছে সেই ভবনের নকশা অনুমোদন ফাইলটি।

রাজউকের নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি জরিপ করেছিল। টিআইবির ওই জরিপে বলা হয়েছিল, নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, হয়রানি ও ঘোরাঘুরির জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে গ্রাহকরা দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। জরিপে বলা হয়, বছরে শুধু প্ল্যান পাস বাবদ রাজউককে গ্রাহকরা ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ঘুষ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালে জরিপ চালায় টিআইবি। এরপর ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি আয়োজিত টিআইবি’র অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইমারতের নকশা অনুমোদনের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকর্তাদের ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তি পর্যায়ে নকশা অনুমোদনে ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ লাখ ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ২-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজউক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া ১০ তলার বেশি ইমারতের নকশা অনুমোদনে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ১৫-৪০ লাখ টাকা এবং বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে রাস্তা প্রশস্ত দেখাতে ২০-৩০ হাজার টাকা, ছাড়পত্র অনুমোদনে ১৫-৮০ হাজার টাকা ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ১-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজউক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া নকশা অনুমোদনে সময়ক্ষেপণ, সেবায় প্রতারণা ও হয়রানি, পরিদর্শনে অনিয়ম ও দুর্নীতি, নকশা বাস্তবায়নে আইন ও বিধির লঙ্ঘন, প্লট বরাদ্দ, প্লট হস্তান্তর, ফ্ল্যাটের চাবি হস্তান্তরসহ একাধিক সেবায় ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না।

গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজউক আর দুর্নীতি সমার্থক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। রাজউক একটি মুনাফা অর্জনকারী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে কিন্তু জনবান্ধব হতে পারেনি। রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে সুশাসনের যে ঘাটতি আমরা চিহ্নিত করেছি, তার মধ্যে অন্যতম হলো জবাবদিহিতাহীন বোর্ড ও বোর্ডের অব্যবস্থাপনা। রাজউক বর্তমানে যে সংস্কৃতির মধ্যে আছে সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে সরিয়ে আনা বেশ কঠিন বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির এই কর্মকর্তা।

এদিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ওইদিন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক বিলকিস আক্তারের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে অংশ নেন সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম এবং এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর। তিনি বলেন, রাজউকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সিন্ডিকেট গঠন, ঘুষের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবনের ছাড়পত্র ও নকশা প্রদান এবং ভবন ভাঙার নোটিস দিয়ে বাণিজ্যসহ অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউকে অভিযান চালায় দুদক। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও অবৈধ লেনদেনের কোনো ফুটেজ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে ধরা যায়নি। তবে এখনো সংশ্লিষ্টদের ওপর দুদকের নজরদারি রয়েছে বলেও জানান দুদকের এই কর্মকর্তা।

এদিকে গত সপ্তাহে দু’দিন রাজউকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন জোনে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন অফিস কক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যার যার টেবিলে বসে দৈনন্দিন কাজ সারছেন। অপরিচিত কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তারা। ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন ও আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (বোর্ড, জনসংযোগ ও প্রটোকল) শামীমা মোমেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এ বিষয়টি সংস্থাটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) মো. আশরাফুল ইসলাম দেখভাল করেন। আপনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এরপর তার কক্ষে গিয়ে তাকে পাওয়া যানি। সেখানে কর্তব্যরত একজন বলেন, স্যার মিটিংয়ে আছেন। পরে আসেন, নতুবা দোতলায় উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ শাখার পরিচালক মোহাম্মদ সামছুল হকের দপ্তরে যোগাযোগ করুন। সেখানে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত একজন বলেন, স্যার উপরে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে মিটিংয়ে আছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব তথ্য জানতে হলে দোতলায় অথরাইজড অফিসার কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। এভাবে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে নিজেদের দায় এড়িয়ে যান। তথ্য প্রদানে গড়িমসি করেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে জানতে সংস্থাটির উন্নয়ন উইংয়ের প্রধান প্রকৌশলী উজ্জল মল্লিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমি একটি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলবো বলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. মমিন উদ্দিনের সঙ্গে অফিসে যোগাযোগ করা হলে তার কার্যালয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর কয়েকদফা ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. ছিদ্দিকুর রহমান সরকারের সঙ্গে দু’দফা যোগাযোগ করেও মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য মেলেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউক কর্মকর্তাদের দাবি, আবেদনপত্রে নানা অসংগতির কারণেই নকশা অনুমোদন পাচ্ছেন না আবেদনকারীরা। আর এর সাথে যোগ হয়েছে নকশা কমিটির বৈঠক সময়মতো না হওয়া। তবে কর্মকর্তাদের ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে নকশা আটকে থাকে, এ বিষয়টি সঠিক নয় বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। ঘুষ না দেওয়ার কারণে নকশাজটের বিষয়টি স্বীকার করে ভবনের নকশা অনুমোদন কমিটির এক সদস্য বলেন, নানান কারণে নকশা অনুমোদনে সময় লাগতে পারে, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। রাজউকে কমবেশি দুর্নীতির অভিযোগ থাকতে পারে। প্রতিবছর অন্তত ৫ থেকে ৭ হাজার নকশার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। এছাড়া অনিয়ম রোধে নকশা অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হওয়ায় এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বেড়েছে। তবে নকশা অনুমোদনের জন্য আগের মতো এখন আর আবেদনও জমা পড়ে না বলে দাবি করেন সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা।

ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত পবিপ্রবি?

দুর্নীতির আখড়া রাজউক

টেবিলে টেবিলে ঘোরে ভবনের নকশা অনুমোদনের ফাইল

আপডেট সময় : ০৭:৩০:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ মে ২০২৪

◉ নির্ধারিত ফিতে মেলে না অনুমোদন, টাকায় মেলে ছাড়পত্র!
◉ ঝুলে আছে কয়েক হাজার নকশা, ভোগান্তিতে গ্রাহকরা
◉ ৪৫ কর্মদিবসে অনুমোদনের বিধান থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন
◉ তথ্য প্রদানে রাজউকের গড়িমসি
◉ নকশা অনুমোদনে ২ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের তথ্য পেয়েছে টিআইবি
◉ অনিয়মের খোঁজে দুদক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) চলছে চরম নকশাজট। বর্তমানে কয়েক হাজার নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সময়মতো নকশার অনুমোদন না পাওয়ায় গ্রাহকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজউকে অনলাইন প্রক্রিয়া চালু হলেও পদে পদে দুর্ভোগে পড়ছেন আবেদনকারীরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত ফিতে আবেদন করা গেলেও রাজউকে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটে জড়িত কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে উপঢৌকন দিলে দ্রুতই নকশা অনুমোদন হয়ে যায়। নয়তো বছরের পর বছর এ টেবিল থেকে ও টেবিল ঘুরতে হয় গ্রাহককে। বিধি অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে ৪৫ কর্মদিবসে নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র এর পুরোটাই উল্টো। দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে রাজউক। ইতোমধ্যেই অনিয়মের অভিযোগে রাজউকে অভিযান চালিয়েছে দুদক। তবে ঘুষ লেনেদেনের সুস্পষ্ট কোনো ফুটেজ না থাকায় কাউকে ধরতে পারেনি সংস্থাটি। এদিকে টিআইবি’র এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ভবনের নকশা অনুমোদনে বিভিন্ন অজুহাতে রাজউক কর্মকর্তারা ঘুষ নেন ২ কোটি টাকা। এসব বিষয়ে জানতে রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তথ্য প্রদানে গড়িমসি করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, নানান কারণে নকশা অনুমোদনে সময় লাগতে পারে। এটা নতুন কিছু নয়। প্রভাবশালীদের কারণে অনেক সময় কিছুটা অনিয়ম ঘটতে পারে। তবে বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। অনিয়ম রোধে পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনে করা হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়ছে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মো. মমিন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ভবনের নকশা অনুমোদনে নতুন আদেশ জারি করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটিই অনলাইনে। এতে করে নকশাজট চরম আকার ধারণ করছে। প্রতিবছরই শত শত গ্রাহকের আবেদন নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। অথচ নকশা অনুমোদন কমিটির (বিসি কমিটি) বৈঠকও নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে না। রাজউকের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি ও ঝামেলাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র পেতে একজন আবেদনকারীকে কমপক্ষে ১৫টি টেবিলে স্বাক্ষরের জন্য ঘুরতে হয়। আবেদনকারীর আবেদনপত্রে কোনো জটিলতা বা ভুল দেখা দিলে এবং কোনো আপত্তি থাকলে রাজউক এক মাসের মধ্যে তা গ্রাহককে জানিয়ে দেবে। অথচ এ নিয়ম রাজউক নিজেই মানছে না। আবেদনকারীকে পদে পদে ঘুষ দিতে হচ্ছে। যে কারণে ঝামেলা এড়াতে গ্রাহকরা সরাসরি কিংবা দালালের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াকেই বৈধ মনে করে থাকেন। আর বহুতল ভবন বা সরকার চিহ্নিত বিশেষ ভবনের পাশে ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের জন্য অপেক্ষার পালা আরো অনেক বেশি। রাজধানীর দুই কোটিরও অধিক মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে রাজউকে নগর পরিকল্পনাবিদ রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ে আছেন ১৮ জন। এছাড়া রাজউকের অন্যান্য বিভাগে জনবল সংকট রয়েছে, যা নকশাজটের একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন নগর উন্নয়ন বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, রাজউকে প্রতিবছর গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার নকশা জমা পড়ে। যার মধ্যে অর্ধেকেরও কম অনুমোদন পায়। গ্রাহকদের অভিযোগ, নানান অজুহাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যায় আবদার মেটাতে না পারার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নকশার অনুমোদনে বিলম্ব হয় এবং বছরের পর বছর লেগে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তার টেবিলে আসার পর সামান্য ত্রুটি ধরে ফাইল আটকে রাখেন। পার্টির সঙ্গে বনিবনা না হওয়া পর্যন্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। এ কারণে গ্রাহকরা দালালনির্ভর হতে বাধ্য হন। গ্রাহকদের অভিযোগ, রাজউকের বিল্ডিং নকশা অনুমোদন কমিটির সদস্যরা নিজেদেরই দালালচক্র নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। এতে করে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্নের ক্ষেত্রে রাজউকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন জোনে শক্তিশালী সিন্টিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই লাখ লাখ টাকার রফাদফায় দ্রুত মেলে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ছাত্রপত্র।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিধি অনুযায়ী রাজধানীতে ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারীকে অনলাইনে সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। এরপর রাজউক কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর দেওয়া কাগজপত্র পর্যালোচনা ও ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ৪৫ কর্মদিবসে ছাড়পত্র দিবে। জানা যায়, নানান জটিলতার কারণে অনুমোদন ছাড়াই পুরান ঢাকার লালবাগের নবাবগঞ্জ রোডের ৬৪/১ নম্বর হোল্ডিংয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে একটি পুরোনো পাঁচতলা ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত করে পেছনের অংশে ৮ তলা ভবন নির্মাণ করছেন আসাদুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান গং। বিষয়টি রাজউকের নজরে এলে ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাজউকের অথরাইজড অফিসার-৫/৩ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভবন মালিকদের একটি নোটিস দেন। সাত কার্যদিবসে নোটিসের জবাব দিতে বললেও নোটিসে কোনো সাড়া দেননি মালিকরা। জানা যায়, উৎকোচ নিয়েই দায় সেরেছে রাজউকের অথরাইজড অফিসার-৫/৩ এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এরপর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। ভবন নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও রাজউকের কেউ এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবনের মালিকানা অংশীদার মনিরুজ্জামান সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এটি রাজউক ভালো বলতে পারবে। অনুমোদন দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি রাজউকের। এ বিষয়টি আমাদের অংশীদারের অন্য একজন দেখভাল করছেন। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না ও বলতেও পারবো না। এদিকে কামরাঙ্গীরচরে রসুলপুর ব্রিজ মার্কেটে পান্নু মিয়ার বাড়ি সংলগ্ন একটি বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে ৩ বছর আগে। ওই ভবনের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হলে মালিকপক্ষ রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দফায় দফায় উৎকোচ দিলেও অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখেছেন অথরাইজড অফিসার। অনুমোদন পাইয়ে দিতে নানান অজুহাতে বিভিন্ন ব্যক্তি ওই মালিকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিলেও এখনো কোনো সুফল পাননি ভবন মালিক। এখনো ঝুলে আছে সেই ভবনের নকশা অনুমোদন ফাইলটি।

রাজউকের নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি জরিপ করেছিল। টিআইবির ওই জরিপে বলা হয়েছিল, নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, হয়রানি ও ঘোরাঘুরির জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে গ্রাহকরা দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। জরিপে বলা হয়, বছরে শুধু প্ল্যান পাস বাবদ রাজউককে গ্রাহকরা ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ঘুষ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালে জরিপ চালায় টিআইবি। এরপর ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি আয়োজিত টিআইবি’র অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইমারতের নকশা অনুমোদনের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকর্তাদের ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তি পর্যায়ে নকশা অনুমোদনে ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ লাখ ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ২-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজউক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া ১০ তলার বেশি ইমারতের নকশা অনুমোদনে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ১৫-৪০ লাখ টাকা এবং বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে রাস্তা প্রশস্ত দেখাতে ২০-৩০ হাজার টাকা, ছাড়পত্র অনুমোদনে ১৫-৮০ হাজার টাকা ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ১-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজউক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া নকশা অনুমোদনে সময়ক্ষেপণ, সেবায় প্রতারণা ও হয়রানি, পরিদর্শনে অনিয়ম ও দুর্নীতি, নকশা বাস্তবায়নে আইন ও বিধির লঙ্ঘন, প্লট বরাদ্দ, প্লট হস্তান্তর, ফ্ল্যাটের চাবি হস্তান্তরসহ একাধিক সেবায় ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না।

গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজউক আর দুর্নীতি সমার্থক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। রাজউক একটি মুনাফা অর্জনকারী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে কিন্তু জনবান্ধব হতে পারেনি। রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে সুশাসনের যে ঘাটতি আমরা চিহ্নিত করেছি, তার মধ্যে অন্যতম হলো জবাবদিহিতাহীন বোর্ড ও বোর্ডের অব্যবস্থাপনা। রাজউক বর্তমানে যে সংস্কৃতির মধ্যে আছে সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে সরিয়ে আনা বেশ কঠিন বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির এই কর্মকর্তা।

এদিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ওইদিন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক বিলকিস আক্তারের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে অংশ নেন সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম এবং এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর। তিনি বলেন, রাজউকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সিন্ডিকেট গঠন, ঘুষের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবনের ছাড়পত্র ও নকশা প্রদান এবং ভবন ভাঙার নোটিস দিয়ে বাণিজ্যসহ অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউকে অভিযান চালায় দুদক। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও অবৈধ লেনদেনের কোনো ফুটেজ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে ধরা যায়নি। তবে এখনো সংশ্লিষ্টদের ওপর দুদকের নজরদারি রয়েছে বলেও জানান দুদকের এই কর্মকর্তা।

এদিকে গত সপ্তাহে দু’দিন রাজউকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন জোনে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন অফিস কক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যার যার টেবিলে বসে দৈনন্দিন কাজ সারছেন। অপরিচিত কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তারা। ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন ও আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (বোর্ড, জনসংযোগ ও প্রটোকল) শামীমা মোমেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এ বিষয়টি সংস্থাটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) মো. আশরাফুল ইসলাম দেখভাল করেন। আপনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এরপর তার কক্ষে গিয়ে তাকে পাওয়া যানি। সেখানে কর্তব্যরত একজন বলেন, স্যার মিটিংয়ে আছেন। পরে আসেন, নতুবা দোতলায় উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ শাখার পরিচালক মোহাম্মদ সামছুল হকের দপ্তরে যোগাযোগ করুন। সেখানে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত একজন বলেন, স্যার উপরে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে মিটিংয়ে আছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব তথ্য জানতে হলে দোতলায় অথরাইজড অফিসার কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। এভাবে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে নিজেদের দায় এড়িয়ে যান। তথ্য প্রদানে গড়িমসি করেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে জানতে সংস্থাটির উন্নয়ন উইংয়ের প্রধান প্রকৌশলী উজ্জল মল্লিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমি একটি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলবো বলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. মমিন উদ্দিনের সঙ্গে অফিসে যোগাযোগ করা হলে তার কার্যালয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর কয়েকদফা ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. ছিদ্দিকুর রহমান সরকারের সঙ্গে দু’দফা যোগাযোগ করেও মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য মেলেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউক কর্মকর্তাদের দাবি, আবেদনপত্রে নানা অসংগতির কারণেই নকশা অনুমোদন পাচ্ছেন না আবেদনকারীরা। আর এর সাথে যোগ হয়েছে নকশা কমিটির বৈঠক সময়মতো না হওয়া। তবে কর্মকর্তাদের ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে নকশা আটকে থাকে, এ বিষয়টি সঠিক নয় বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। ঘুষ না দেওয়ার কারণে নকশাজটের বিষয়টি স্বীকার করে ভবনের নকশা অনুমোদন কমিটির এক সদস্য বলেন, নানান কারণে নকশা অনুমোদনে সময় লাগতে পারে, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। রাজউকে কমবেশি দুর্নীতির অভিযোগ থাকতে পারে। প্রতিবছর অন্তত ৫ থেকে ৭ হাজার নকশার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। এছাড়া অনিয়ম রোধে নকশা অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হওয়ায় এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বেড়েছে। তবে নকশা অনুমোদনের জন্য আগের মতো এখন আর আবেদনও জমা পড়ে না বলে দাবি করেন সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা।