◉পোশাক কারখানার বর্জ্যের মাধ্যমে পানিতে মিশছে স্থায়ী রাসায়নিক পিফাস
◉ট্যাপের পানিতে সীমার চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত পিফাস
ঢাকার আশপাশের নদ-নদী ও খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পিফাসের (পার অ্যান্ড পলি ফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যানসেস) উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রায় সব নমুনায় এই বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়া গেছে। নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে এই ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসলে মানবদেহে ছয় ধরনের ক্যান্সারসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এবং বৈশ্বিক জনস্বার্থ সংস্থা আইপেনের যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন পোশাক কারখানা থেকে নির্গত হচ্ছে এসব বিষাক্ত কেমিক্যাল। পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পিফাস পোশাক কারখানা থেকে বর্জ্যরে মাধ্যমে আশপাশের খাল ও নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখান থেকে ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে খাবারের পানিতেও মিশে যাচ্ছে। এই পানি ব্যবহারে বা পান করার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ক্যান্সার ও লিভার নষ্টের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এসডো জানায়, ঢাকা ও এর আশেপাশের আটটি লেক ও নদীর পানির ৩১টি নমুনা, চারটি ট্যাপের পানি ও পোশাকের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পিফাস পরীক্ষার জন্য হাই পারফরমেন্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি- মাস ও স্পেকট্রোমেট্রি পোএক্ট্রোমেট্রি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সংস্থা দুটির গবেষকরা বলছেন, এই রাসায়নিকগুলো তাদের বৈশিষ্ট্যর কারণে ‘স্থায়ী রাসায়নিক’ নামে পরিচিত। খাল, নদী ও খাবার পানিতে খাবার পানিতে পিফাসের উপস্থিতি এবং পোশাক শিল্পে এদের ব্যাপক ব্যবহার উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বব্যাপী পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত মোট রাসায়নিকের ৫০ শতাংশই ও রাসায়নিক ব্যবহারের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস।
পিফাস বা পার-পলিফ্লুওরোঅ্যালকাইল হল মানুষের তৈরি একধরনের রাসায়নিক পদার্থ। এর স্থায়িত্ব দীর্ঘ এবং পোশাককে পানি, তেল ও তাপ থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়। ১৯৪০-এর দশক থেকে পিফাস বিভিন্ন পণ্য এবং শিল্পক্ষেত্রে, যেমন- নন-স্টিক কুকওয়্যার, পানি ও দাগ প্রতিরোধী সুতা, খাদ্য প্যাকেজিং, অগ্নিনির্বাপক ফোম, প্রসাধনী এবং অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পানি ও দাগ-প্রতিরোধ, তাপ প্রতিরোধ এবং রাসায়নিক স্থিতিশীলতার জন্য পণ্যে পিফাসের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
গবেষকরা জানান, পিফাস পরিবেশে সহজে ভাঙে না এবং প্রাণির শরীরে স্থায়ীভাবে জমা হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দেয়। মানবদেহে পিফাসের বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। এটি প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস ও ভ্রƒণের বৃদ্ধি ঘটায় এবং থাইরয়েড হরমোন কার্যকারিতার উপর সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদী পিফাসের সংস্পর্শে থাকার ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, কম ওজনের শিশু জন্ম নেয় ও যে কোনো ধরনের টিকার কার্যকারিতা কমে যায়। এছাড়া পিফাস লিভারের ক্ষতি করে ও শরীরে নানা ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টি করে। পানির উৎস, মাটি ও খাদ্যে পিফাসের উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশের জনগণ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
পরীক্ষায় ভূপৃষ্ঠের পানির ৩১টি নমুনার মধ্যে ২৭টিতে, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশ পানিতে পিফাস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৮টি নমুনায় স্টকহোম কনভেনশনের অধীনে বিশ্বব্যাপী নির্মূলের জন্য তালিকাভুক্ত পিফাস ও ১৯টি নমুনায় ভূপৃষ্ঠের পানির জন্য প্রস্তাবিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি পিফাস শনাক্ত হয়েছে।
এছাড়া বেশ কয়েকটি নমুনায় খুব বেশি পরিমাণে পিফাস পাওয়া গেছে। একটি নমুনাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তাবিত নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৩১০ গুণ বেশি পিফাস রয়েছে। এই নমুনায় রাসায়নিক পিফএ ও পিফএস এবং বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ পিফাসের সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল, যা পিফএ-এর জন্য বর্তমান ডাচ সীমার চেয়ে ১৭০০ গুণ বেশি এবং পিফাস-এর জন্য বর্তমান ডাচ এডভাইসরি সীমার চেয়ে ৫৪ হাজার গুণ বেশি।
এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, পিফাস পরিবেশে জমা হয়ে থাকে বলে এটি চিরস্থায়ী রাসায়নিক হিসেবে পরিচিত। এটি মানুষের উর্বরতা, ভ্রƒণ বিকাশ এবং থাইরয়েড হরমোন ফাংশনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া কিছু পিফাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, লিভার নষ্ট করে এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে পিফাসের কিছু ধরন স্টকহোম কনভেনশনের মাধ্যমে সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আরও কিছু নিষিদ্ধ করতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে পিফাস নিয়ে নির্দিষ্ট আইন নেই। তাই এ গবেষণার ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডে তুলনা করা হয়েছে। ২০১৯ সালে কর্ণফুলী নদীর পানিতে সর্বোচ্চ পিফাস শনাক্ত করা হয়, যা প্রস্তাবিত ইউরোপীয় সীমার চেয়ে ৩০০ গুণ। সেই নমুনায় দুটি নিষিদ্ধ পিফাসের উপস্থিতিও ছিল, যা বর্তমান ডাচ সীমার চেয়ে ১ হাজার ৭০০ গুণ থেকে ৫৪ হাজার গুণ বেশি। ২০২২ সালে হাতিরঝিল লেক থেকে নেওয়া নমুনায় পিএফওএ এবং পিএফওএস উভয়ের উপস্থিতিই ছিল ডাচ সীমার চেয়ে ১৮৫ গুণ। উচ্চ পিফাস পাওয়া নমুনাগুলোর বেশির ভাগই পোশাক শিল্পকারখানার কাছাকাছি এলাকার। ২০২২ সালে দুটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ঢাকা ও আদমজী ইপিজেড) কাছাকাছি জলপথের আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিমের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। যেখানে ডাউনস্ট্রিমের নমুনায় উচ্চ পিফাস ঘনত্ব পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের চারটি নলকূপের পানির নমুনার মধ্যে তিনটিতেই পিফাস পাওয়া যায়।
এসডোর গবেষণার প্রধান শাহরিয়ার হোসেন বলেন, নদী, লেক, কলের পানি এবং পোশাকে পিফাস আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে। তবে শিল্পকারখানা ও নীতিনির্ধারকরা সাড়া দিচ্ছেন না। এ রাসায়নিকগুলো একে একে নিয়ন্ত্রণে কয়েক দশক সময় লাগবে, যা আমাদের সন্তানদের ঝুঁকিতে ফেলবে।

























