০৮:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধ 

আকাশ-আকাশ বলে চিৎকার করে উঠে —বেদনায় কাৎরায়, দুঃখী মানুষের দুঃখ বোধকরি বৃষ্টির মতো।
আমরা মানুষ হওয়ার দুঃখে দুঃখিত! বৃষ্টির রিমঝিম ধারাতে দুঃখ আসে সঙ্গ দিতে। আমরা আকাশের বেদনা দেখি বৃষ্টির প্রতিফলন দেখে । কিন্তু যেই আকাশ’কে মানুষ যুগ-যুগ ধরে ধারণ করে আসছে তার বেদনা আমরা অনুভব করতে পারি না।
আচ্ছা মানুষের বেদনা কী আকাশের চেয়ে ভারী?
যে মা তার সন্তানকে বিদায় জানাতে দুঃখে ভাসায় তার আঁচল —আকাশের বেদনা কী তার চেয়ে ভারী?
যে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ!  আকাশের বেদনা কী তার চেয়ে ভারী? মানুষ যে বেদনাকে হাজার বছর ধরে লালন করে আসছে; সেই বেদনা অন্যকিছু নয় সেটা হচ্ছে মানুষের দুঃখবোধ।  সে বেদনার কাছে আকাশের বেদনা-তো বৃষ্টির একফোঁটা পরিমাণ পানির মতো।

 সময়ের পাটাতনে দুঃখবোধ’কে লালন করি আকাশের বুকচিরে পড়া বৃষ্টির মতো। সবুজ’কে যেমন আরো সবুজ কিংবা সতেজ করে বৃষ্টি; দুঃখবোধও তেমনি  মানুষ’কে সাবলীল করে, শক্তিশালী করে তাজা সবুজ  ঘাসের ন্যায়। সেই দুঃখবোধ’কে আগলে রাখতে হয় , খুব যতনে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া জটিল হৃদয়ে। দুঃখবোধ’কে যারা ফেইসবুক আবর্জনায় ফেলে দেয়! প্রকৃত দুঃখবোধ তাদের নেই। দুঃখবোধ তো মনি-মুক্তোর মতো লুকিয়ে রাখা জীবনের অন্যতম মেটেরিয়ালস। ঐ-যে আগেই বলেছি দুঃখবোধ মানুষ’কে সাবলীল করে, শক্তিশালী করে তাজা সবুজের মতো৷ দুঃখ যতই প্রদর্শন করা হয়, দুঃখ ততই দূর্বল, শক্তিহীন হয় । বৃষ্টির অভাবে যেমন তাজা সবুজ নুইয়ে  পড়ে, প্রদর্শিত দুঃখবোধ তেমন মানুষকে নিচুতে  নিয়ে ফেলে  ৷ দুঃখবোধের জায়গায় যারা শক্তিশালী তারাই জগতে কীর্তিমান হয়েছেন, হয়েছেন স্মরণীয়।
দুঃখবোধ শব্দটিকে  পোস্টমর্টেম করে দেখতে চাই মানুষের দুঃখবোধের ইতিবৃত্ত —

ফেইসবুক আবর্জনা ও সাবলীলতার স্বরুপে দুঃখবোধ  :

কবি হেলাল হাফিজকে কবি হিসেবে জগতে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার একমাত্র ‘দুঃখবোধ’৷ তার কবিতার অন্যতম প্রধান উপাদান শুধুুই দুঃখবোধ। যদিও দুঃখবোধের কারণে তাকে দুর্বল চিত্তের কবি ভাবা হয়; সেটি আলাদা বিষয়। যাই হোক তার দুঃখবোধ ব্যপক বিস্তৃত এবং অকল্পনীয় শক্তিশালী। তাইতো তিনি আজ কবি৷ একজন আপাদমস্তক কবি। শৈশবে মাকে হারানোর বেদনা, স্বপ্নের  প্রেমিকা’কে না পাওয়া। এ যেন বেদনার এক মূর্ত প্রতিক।

 বৃষ্টি  আকাশের কান্না, দুঃখের প্রতিক। মানুষকে সাবলীল করার গোপন হাতিয়ার। যারাই দুঃখবোধ লুকিয়ে রেখে চলে। ফেইসবুক আবর্জনায় ফেলায় না তাদের দুঃখবোধকে—দুঃখবোধ তাদের সাবলীল করে।চলতি পথে সাহসের সঞ্জার করে। যে আকাশে বৃষ্টির রিমঝিম ধারাতে ছেয়ে যায় পুরো জমিন তারও একসময় গিয়ে শেষ হয় বেদনা ধারা। মানুষের জীবনেও ঘোর অমাবস্যার মধ্যরাত অতিবাহিত হয়ে উদিত হয় নতুন সূর্যের, নতুন সকালের। সে সকাল জীবনকে নতুন করে যুদ্ধ করতে শেখায়। সেখানে থাকে না অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ভয়।

প্রশ্রয় বনাম দুঃখবোধ:

মানুষ যদি শুধুমাত্র তার দুঃখবোধকে প্রশ্রয় দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতো তাহলে সে কখওনোই এভারেস্টের চুড়ায় উঠতে পারতো না। যেতে পারতো না নিজেকে ছাড়িয়ে। আমি বলছি না যে দুঃখবোধের প্রয়োজন নেই, অবশ্যই প্রয়োজন  আছে। দুঃখবোধ তো জীবনের মেটেরিয়ালস। এটা ছাড়া যুদ্ধের অমীমাংসিত স্লোগান হয় না। দুঃখবোধ থাকবে —জীবনের দুঃখ নামক চ্যাপ্টার পড়ে  এগিয়ে যেতে হবে দুঃখবোধকে সাথে নিয়ে। ঐ-যে বলেছিলাম, দুঃখবোধ এমন এক হাতিয়ার যার মাধ্যমে জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়। কবি হেলাল হাফিজ সাবলীল ভাষায় তার কবিতায় বলেছেন,

        আমার দুঃখ আছে কিন্তু আমি দুখী নই,
দুঃখ তো সুখের মতো নীচ নয়,
যে আমাকে দুঃখ দেবে।

যারা স্থুল মানসিকতা লালন করে, দুঃখবোধে কাছে তারা পরাজিত হয়।  দুঃখবোধ সুখের মতো এতো নীচু  নয়  যে  কবিকে  দুঃখ  দেবে!   সুখ  থেকে একধাপ এগিয়ে মানুষের দুঃখবোধ।

মানুষ চেনাতে দুঃখবোধ :

দুঃখবোধ তো  নিজের ভেতর থাকা একমাত্র পরম আত্মীয়। নিজের ব্যক্তিগত কারাগার! যেখানে অন্ধকার থাকে; আর সেই অন্ধকারকে ভেদ করেই আলোর উপযুক্ত করার নতুন হাতিয়ার দুঃখবোধ । দুঃখের ভাগ পৃথিবীর কেউই নেয় না— তাই কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর ব্যথার গৌরব কবিতায় সরল কলমে লিখেছেন,

❝  দানের দিনে সবাই আসি
নিয়ে গেল হাসি- রাশি❞।

হায়রে আভাইগা কপাল মানুষের দুঃখবোধ বিলানোর কেউ নেই। আছে শুধু সুখের চাকচিক্য কুড়িয়ে নেয়া স্বার্থপর মানুষ। সবকিছুকে ছাড়িয়ে চুড়ান্ত সত্য হলো দুঃখবোধ মানুষকে হতাশায় ফেলতে আসে না। আসে মানুষ চেনাতে। নিজেকে সাবলীল করে শক্তিশালী করে বীরের মতো ফেরাতে।

চিরায়ত অবহেলার সূত্রপাতে দুঃখবোধ :

দুঃখ আসলে আসমানের কান্না, ঘরের বাহিরে থাকলে ভিজতে হবে, ঘরের ভিতরে থাকলে স্পর্শ করবে না বৃষ্টির একটি ফোঁটাও। জীবন এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাবে! তবু দুঃখবোধকে লুকিয়ে রাখতে হবে। দুঃখকে প্রকাশ করতে গেলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে।বাহিরে থাকলে বৃষ্টি যেমন আপনাকে ভিজিয়ে দেয়, প্রকাশিত দুঃখবোধ আপনাকে এনে দিবে পাহাড়সম মানুষের অবহেলা। এই অবহেলা টগবগে তাজা মৃত্যুর চাইতেও অতি ভয়ংকর। মানুষের অবহেলা মারাত্মক বিষধর। ব্যথায় নীল হতে হবে মানুষের অবহেলার কাছে, যদি প্রকাশিত হয় আমাদের দুঃখবোধ। চিরায়ত অবহেলার সূত্রপাত এই দুঃখবোধের সংস্পর্শেই, যে অবহেলার কোনো সমাধান পৃথিবীর জমিনে নেই।

কবি মাহবুব মিত্রের আদালতে মানুষের দুঃখবোধ  :

সময়ের পাটাতনে বৃদ্ধি হচ্ছে দুঃখবোধের অভিমানী সরল অনুভূতি, সেই সরলতা’কে যারা ব্যবহার করে অর্জন করতে চায় আত্মতুষ্টির গরল উপাখ্যান তারা কখনো কবি মাহবুব মিত্রের মানুষের মানচিত্র বুঝে উঠতে পারবে না দুঃখবোধের অঙ্কিত রেখায়। কবি মাহবুব মিত্র তার “ রতিক্লান্ত প্রহরের ছায়া”  কবিতায় সাবলীল ভাষায় বলেছেন,

সময়ের সাদা পৃষ্ঠায় উদিত হয়
জীবনের পুরনো গরল, ধাইমার করতলে
অঙ্কিত রেখার মতো মানুষের মানচিত্র।

অতীতের যে সোনালী জীবন পার করে এসেছি, তার প্রতিটি সাদা পৃষ্ঠায়,বেদনার স্বর্ণাক্ষরে প্রতিটি  হৃদয়ে লিখা আছে জীবনের পুরনো গরল। আর সেই পুরনো গরল কিংবা মানুষের আশ্রিত দুঃখবোধের স্বীকৃত রুপ “ধাইমা’র করতলে অঙ্কিত রেখার মতো মানুষের মানচিত্র”। তাই-তো ক্লান্তিকর দুঃখবোধে কবি মাহবুব মিত্র আমাদের দুঃখবোধের সাবলীল স্বীকৃতি দাতা। যে স্বীকৃতিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে “মানুষের মানচিত্র”।

চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধ : 

কারোর অকালে পিতাকে হারানোর দুঃখ আছে,কারোর মা’কে হারানোর দুঃখ আছে, কেউ তার সন্তানকে হারিয়েছেন অবেলায়,ভাই-ভাইকে ঘৃণা করার দুঃখ আছে করোর,কারোর বা প্রেমিকার ছলনায় দুঃখ বেড়েছে হাজারগুণ।সকল দুঃখের একটি শেষ পরিণতি কিংবা বোধ আছে। সেই দুঃখের সর্বশেষ পরিণতির নাম মানুষের দুঃখবোধ। হোক সেটি ভালো বা মন্দ। যার শিশুকালটি কেটেছে অবহেলায় অবলীলায় তার একটি দুঃখবোধ আছে ; যার সংসার কেটেছে অভাব অনটনে তার একটি দুঃখবোধ আছে। যার দুঃখ আছে সেই জানে তার দুঃখবোধের সাবলীল ব্যথার যন্ত্রণা কতোটা! আমরা চাইলেই দুঃখবোধকে হৃদয়ে লালন না করে জীবন পরিচালিত করতে পারি না। এটি জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত।

দুনিয়ার চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধকে মেনে না নেওয়া আত্মঘাতী গোলের মতো হয়। এটাকে মেনে নিয়েই চলতে হয়। যারা বিশ্বাস রেখে চলে তারা কখনো হারে না। আর সেই বিশ্বাস যখন চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধের উপর তখন তাকে আর কোনো ব্যক্তি দমিয়ে রাখতে পারে না।

হে দুঃখী মানুষের কল্যাণকামী — আসুন হাজার বছর বহন করা দুঃখবোধকে লালন করি সাবলীলতার মোড়কে। ফেইসবুক আবর্জনা ও সালীলতার স্বরুপে দুঃখবোধকে লালিত করি সফলতার সংগ্রামে। আমাদের দুঃখবোধ  থাকবে কিন্তু আমরা দুঃখীত হবো না দুর্বল চিত্তের গোঘ্রাসে। মানুষের স্পষ্ট অবয়ব চিনতে দুঃখবোধকে হাতিয়ার বানাই। চিরায়ত অবহেলার মনবৃত্তকে পরিহার করি দুঃখবোধের উদ্দেশ্য বুঝতে।আসুন দুঃখবোধ পুষে রাখি চেপে রাখার জন্য। হারার আগেই যারা হেরে যায় সংগ্রামের লড়াইয়ে  তারা আসল কাপুরুষ। লিখাটি তাদের জন্য যারা হারার আগেই হেরে যান দুঃখবোধের  কাছে।

লেখক, ইতাঙ্গীর খন্দকার
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধ 

আপডেট সময় : ০৫:১৭:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

আকাশ-আকাশ বলে চিৎকার করে উঠে —বেদনায় কাৎরায়, দুঃখী মানুষের দুঃখ বোধকরি বৃষ্টির মতো।
আমরা মানুষ হওয়ার দুঃখে দুঃখিত! বৃষ্টির রিমঝিম ধারাতে দুঃখ আসে সঙ্গ দিতে। আমরা আকাশের বেদনা দেখি বৃষ্টির প্রতিফলন দেখে । কিন্তু যেই আকাশ’কে মানুষ যুগ-যুগ ধরে ধারণ করে আসছে তার বেদনা আমরা অনুভব করতে পারি না।
আচ্ছা মানুষের বেদনা কী আকাশের চেয়ে ভারী?
যে মা তার সন্তানকে বিদায় জানাতে দুঃখে ভাসায় তার আঁচল —আকাশের বেদনা কী তার চেয়ে ভারী?
যে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ!  আকাশের বেদনা কী তার চেয়ে ভারী? মানুষ যে বেদনাকে হাজার বছর ধরে লালন করে আসছে; সেই বেদনা অন্যকিছু নয় সেটা হচ্ছে মানুষের দুঃখবোধ।  সে বেদনার কাছে আকাশের বেদনা-তো বৃষ্টির একফোঁটা পরিমাণ পানির মতো।

 সময়ের পাটাতনে দুঃখবোধ’কে লালন করি আকাশের বুকচিরে পড়া বৃষ্টির মতো। সবুজ’কে যেমন আরো সবুজ কিংবা সতেজ করে বৃষ্টি; দুঃখবোধও তেমনি  মানুষ’কে সাবলীল করে, শক্তিশালী করে তাজা সবুজ  ঘাসের ন্যায়। সেই দুঃখবোধ’কে আগলে রাখতে হয় , খুব যতনে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া জটিল হৃদয়ে। দুঃখবোধ’কে যারা ফেইসবুক আবর্জনায় ফেলে দেয়! প্রকৃত দুঃখবোধ তাদের নেই। দুঃখবোধ তো মনি-মুক্তোর মতো লুকিয়ে রাখা জীবনের অন্যতম মেটেরিয়ালস। ঐ-যে আগেই বলেছি দুঃখবোধ মানুষ’কে সাবলীল করে, শক্তিশালী করে তাজা সবুজের মতো৷ দুঃখ যতই প্রদর্শন করা হয়, দুঃখ ততই দূর্বল, শক্তিহীন হয় । বৃষ্টির অভাবে যেমন তাজা সবুজ নুইয়ে  পড়ে, প্রদর্শিত দুঃখবোধ তেমন মানুষকে নিচুতে  নিয়ে ফেলে  ৷ দুঃখবোধের জায়গায় যারা শক্তিশালী তারাই জগতে কীর্তিমান হয়েছেন, হয়েছেন স্মরণীয়।
দুঃখবোধ শব্দটিকে  পোস্টমর্টেম করে দেখতে চাই মানুষের দুঃখবোধের ইতিবৃত্ত —

ফেইসবুক আবর্জনা ও সাবলীলতার স্বরুপে দুঃখবোধ  :

কবি হেলাল হাফিজকে কবি হিসেবে জগতে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার একমাত্র ‘দুঃখবোধ’৷ তার কবিতার অন্যতম প্রধান উপাদান শুধুুই দুঃখবোধ। যদিও দুঃখবোধের কারণে তাকে দুর্বল চিত্তের কবি ভাবা হয়; সেটি আলাদা বিষয়। যাই হোক তার দুঃখবোধ ব্যপক বিস্তৃত এবং অকল্পনীয় শক্তিশালী। তাইতো তিনি আজ কবি৷ একজন আপাদমস্তক কবি। শৈশবে মাকে হারানোর বেদনা, স্বপ্নের  প্রেমিকা’কে না পাওয়া। এ যেন বেদনার এক মূর্ত প্রতিক।

 বৃষ্টি  আকাশের কান্না, দুঃখের প্রতিক। মানুষকে সাবলীল করার গোপন হাতিয়ার। যারাই দুঃখবোধ লুকিয়ে রেখে চলে। ফেইসবুক আবর্জনায় ফেলায় না তাদের দুঃখবোধকে—দুঃখবোধ তাদের সাবলীল করে।চলতি পথে সাহসের সঞ্জার করে। যে আকাশে বৃষ্টির রিমঝিম ধারাতে ছেয়ে যায় পুরো জমিন তারও একসময় গিয়ে শেষ হয় বেদনা ধারা। মানুষের জীবনেও ঘোর অমাবস্যার মধ্যরাত অতিবাহিত হয়ে উদিত হয় নতুন সূর্যের, নতুন সকালের। সে সকাল জীবনকে নতুন করে যুদ্ধ করতে শেখায়। সেখানে থাকে না অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ভয়।

প্রশ্রয় বনাম দুঃখবোধ:

মানুষ যদি শুধুমাত্র তার দুঃখবোধকে প্রশ্রয় দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতো তাহলে সে কখওনোই এভারেস্টের চুড়ায় উঠতে পারতো না। যেতে পারতো না নিজেকে ছাড়িয়ে। আমি বলছি না যে দুঃখবোধের প্রয়োজন নেই, অবশ্যই প্রয়োজন  আছে। দুঃখবোধ তো জীবনের মেটেরিয়ালস। এটা ছাড়া যুদ্ধের অমীমাংসিত স্লোগান হয় না। দুঃখবোধ থাকবে —জীবনের দুঃখ নামক চ্যাপ্টার পড়ে  এগিয়ে যেতে হবে দুঃখবোধকে সাথে নিয়ে। ঐ-যে বলেছিলাম, দুঃখবোধ এমন এক হাতিয়ার যার মাধ্যমে জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়। কবি হেলাল হাফিজ সাবলীল ভাষায় তার কবিতায় বলেছেন,

        আমার দুঃখ আছে কিন্তু আমি দুখী নই,
দুঃখ তো সুখের মতো নীচ নয়,
যে আমাকে দুঃখ দেবে।

যারা স্থুল মানসিকতা লালন করে, দুঃখবোধে কাছে তারা পরাজিত হয়।  দুঃখবোধ সুখের মতো এতো নীচু  নয়  যে  কবিকে  দুঃখ  দেবে!   সুখ  থেকে একধাপ এগিয়ে মানুষের দুঃখবোধ।

মানুষ চেনাতে দুঃখবোধ :

দুঃখবোধ তো  নিজের ভেতর থাকা একমাত্র পরম আত্মীয়। নিজের ব্যক্তিগত কারাগার! যেখানে অন্ধকার থাকে; আর সেই অন্ধকারকে ভেদ করেই আলোর উপযুক্ত করার নতুন হাতিয়ার দুঃখবোধ । দুঃখের ভাগ পৃথিবীর কেউই নেয় না— তাই কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর ব্যথার গৌরব কবিতায় সরল কলমে লিখেছেন,

❝  দানের দিনে সবাই আসি
নিয়ে গেল হাসি- রাশি❞।

হায়রে আভাইগা কপাল মানুষের দুঃখবোধ বিলানোর কেউ নেই। আছে শুধু সুখের চাকচিক্য কুড়িয়ে নেয়া স্বার্থপর মানুষ। সবকিছুকে ছাড়িয়ে চুড়ান্ত সত্য হলো দুঃখবোধ মানুষকে হতাশায় ফেলতে আসে না। আসে মানুষ চেনাতে। নিজেকে সাবলীল করে শক্তিশালী করে বীরের মতো ফেরাতে।

চিরায়ত অবহেলার সূত্রপাতে দুঃখবোধ :

দুঃখ আসলে আসমানের কান্না, ঘরের বাহিরে থাকলে ভিজতে হবে, ঘরের ভিতরে থাকলে স্পর্শ করবে না বৃষ্টির একটি ফোঁটাও। জীবন এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাবে! তবু দুঃখবোধকে লুকিয়ে রাখতে হবে। দুঃখকে প্রকাশ করতে গেলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে।বাহিরে থাকলে বৃষ্টি যেমন আপনাকে ভিজিয়ে দেয়, প্রকাশিত দুঃখবোধ আপনাকে এনে দিবে পাহাড়সম মানুষের অবহেলা। এই অবহেলা টগবগে তাজা মৃত্যুর চাইতেও অতি ভয়ংকর। মানুষের অবহেলা মারাত্মক বিষধর। ব্যথায় নীল হতে হবে মানুষের অবহেলার কাছে, যদি প্রকাশিত হয় আমাদের দুঃখবোধ। চিরায়ত অবহেলার সূত্রপাত এই দুঃখবোধের সংস্পর্শেই, যে অবহেলার কোনো সমাধান পৃথিবীর জমিনে নেই।

কবি মাহবুব মিত্রের আদালতে মানুষের দুঃখবোধ  :

সময়ের পাটাতনে বৃদ্ধি হচ্ছে দুঃখবোধের অভিমানী সরল অনুভূতি, সেই সরলতা’কে যারা ব্যবহার করে অর্জন করতে চায় আত্মতুষ্টির গরল উপাখ্যান তারা কখনো কবি মাহবুব মিত্রের মানুষের মানচিত্র বুঝে উঠতে পারবে না দুঃখবোধের অঙ্কিত রেখায়। কবি মাহবুব মিত্র তার “ রতিক্লান্ত প্রহরের ছায়া”  কবিতায় সাবলীল ভাষায় বলেছেন,

সময়ের সাদা পৃষ্ঠায় উদিত হয়
জীবনের পুরনো গরল, ধাইমার করতলে
অঙ্কিত রেখার মতো মানুষের মানচিত্র।

অতীতের যে সোনালী জীবন পার করে এসেছি, তার প্রতিটি সাদা পৃষ্ঠায়,বেদনার স্বর্ণাক্ষরে প্রতিটি  হৃদয়ে লিখা আছে জীবনের পুরনো গরল। আর সেই পুরনো গরল কিংবা মানুষের আশ্রিত দুঃখবোধের স্বীকৃত রুপ “ধাইমা’র করতলে অঙ্কিত রেখার মতো মানুষের মানচিত্র”। তাই-তো ক্লান্তিকর দুঃখবোধে কবি মাহবুব মিত্র আমাদের দুঃখবোধের সাবলীল স্বীকৃতি দাতা। যে স্বীকৃতিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে “মানুষের মানচিত্র”।

চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধ : 

কারোর অকালে পিতাকে হারানোর দুঃখ আছে,কারোর মা’কে হারানোর দুঃখ আছে, কেউ তার সন্তানকে হারিয়েছেন অবেলায়,ভাই-ভাইকে ঘৃণা করার দুঃখ আছে করোর,কারোর বা প্রেমিকার ছলনায় দুঃখ বেড়েছে হাজারগুণ।সকল দুঃখের একটি শেষ পরিণতি কিংবা বোধ আছে। সেই দুঃখের সর্বশেষ পরিণতির নাম মানুষের দুঃখবোধ। হোক সেটি ভালো বা মন্দ। যার শিশুকালটি কেটেছে অবহেলায় অবলীলায় তার একটি দুঃখবোধ আছে ; যার সংসার কেটেছে অভাব অনটনে তার একটি দুঃখবোধ আছে। যার দুঃখ আছে সেই জানে তার দুঃখবোধের সাবলীল ব্যথার যন্ত্রণা কতোটা! আমরা চাইলেই দুঃখবোধকে হৃদয়ে লালন না করে জীবন পরিচালিত করতে পারি না। এটি জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত।

দুনিয়ার চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধকে মেনে না নেওয়া আত্মঘাতী গোলের মতো হয়। এটাকে মেনে নিয়েই চলতে হয়। যারা বিশ্বাস রেখে চলে তারা কখনো হারে না। আর সেই বিশ্বাস যখন চিরায়ত চরিত্রে মানুষের দুঃখবোধের উপর তখন তাকে আর কোনো ব্যক্তি দমিয়ে রাখতে পারে না।

হে দুঃখী মানুষের কল্যাণকামী — আসুন হাজার বছর বহন করা দুঃখবোধকে লালন করি সাবলীলতার মোড়কে। ফেইসবুক আবর্জনা ও সালীলতার স্বরুপে দুঃখবোধকে লালিত করি সফলতার সংগ্রামে। আমাদের দুঃখবোধ  থাকবে কিন্তু আমরা দুঃখীত হবো না দুর্বল চিত্তের গোঘ্রাসে। মানুষের স্পষ্ট অবয়ব চিনতে দুঃখবোধকে হাতিয়ার বানাই। চিরায়ত অবহেলার মনবৃত্তকে পরিহার করি দুঃখবোধের উদ্দেশ্য বুঝতে।আসুন দুঃখবোধ পুষে রাখি চেপে রাখার জন্য। হারার আগেই যারা হেরে যায় সংগ্রামের লড়াইয়ে  তারা আসল কাপুরুষ। লিখাটি তাদের জন্য যারা হারার আগেই হেরে যান দুঃখবোধের  কাছে।

লেখক, ইতাঙ্গীর খন্দকার
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়