১২:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বজনীন পেনশন নিয়ে বাড়ছে সংকট

➤ সরকারি ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা
➤ উচ্চশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষকদের আগ্রহ কমবে
➤ এই পেনশনে যুক্তদের কিস্তি চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা
➤ পেনশন বাস্তবায়নে ৩৮০২ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার
➤ পেনশনে যুক্ত হতে নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান
➤ জনগণের মাঝে আস্থা বাড়ানো, পুরোনো পেনশনভোগীদের আওতামুক্ত রাখা এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে পেনশন তহবিলের ব্যবস্থা নিশ্চিতের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

দেশে বর্তমানে আলোচিত একটি বিষয় সর্বজনীন পেনশন। ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি দেশের সব নাগরিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী বা কর্মের বাইরে থাকা ধনী-গরিব সবার জন্য এই সুবিধা চালু করেছে সরকার। সুবিধাভোগীর বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হওয়ার পর আজীবন পেনশন সুবিধা ভোগ করা যাবে। ন্যূনতম ১০ বছর চাঁদা দেওয়া সাপেক্ষে এ সুবিধা পাওয়া যাবে। জাতীয় সংসদে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩’ পাস এবং ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩ তাতে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রগতি, সমতা, প্রবাস ও সুরক্ষা-এই চার কর্মসূচি নিয়ে সর্বজনীন পেনশন চালু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট। গত ১ জুলাই থেকে প্রত্যয় নামে আরেকটি স্কিম চালু হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের জুলাই থেকে সেবক নামে আরেকটি স্কিম চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। আর সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাস্তবায়ন বা কার্যকরের জন্য সরকার ৩৮০২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে সর্বজনীন পেনশন নিয়ে শুরুতেই এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে যেমন বিশেষজ্ঞরা এই পেনশন ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি ও দুর্বলতার দিকগুলো তুলে ধরেন, তেমননি এর সুফল নিয়ে সরকারি মহল থেকে ব্যাপক প্রচার অব্যাহত রয়েছে। এজন্য শুরুর দিকে সর্বজনীন পেনশনে বেসরকারি পর্যায়ের মানুষের তেমন কোনো সাড়া না থাকলেও ধীরে ধীরে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মজীবীদের বিভিন্নভাবে এই পেনশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা থাকায় এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী গত জুন পর্যন্ত সর্বজনীন পেনশনের আওতায় নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। তবে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া প্রত্যয় স্কিম নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা এবং এটি প্রত্যাহারের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে আশ^স্ত করে পেনশন কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষকরা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারও বেশ বিপাকে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া শিক্ষকদের এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ক্ষমতায় প্রত্যয় স্কিম বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

এ বিষয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান বলেছেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম আমরা চালু করেছি দেশের সব মানুষের জন্য। শ্রমিক, কর্মজীবী এমনকি রাজনৈতিক কর্মীসহ যাদের জন্য কখনোই অবসর জীবনে কোনো অর্থনৈতিক সুযোগই ছিল না। সেই বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে যখনই কথা হয়েছে, তারা বলেছেন, তাদের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম খুব চমৎকার। যারা এর (প্রত্যয় স্কিম) আওতায় নেই তারা অনেক কথা বলছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে। অবশ্যই গণতান্ত্রিক দেশ কথা বলতেই পারেন। তবে ‘প্রত্যয়’ স্কিম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে ‘তথ্যের ঘাটতি’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শনিবার রাতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো পেনশনের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের পেনশনের আওতায় আনার যে উদ্দেশ্যে সর্বজনীন পেনশন চালু হয়েছিল, তা থেকে দূরে সরে গেছে সরকার। একটি নিয়মে পেনশন ভোগ করে সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের নতুন পেনশনের আওতায় আনলে তারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হবেন এবং ভবিষ্যতে মেধাবী শিক্ষক হারানোর শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া নানা আস্থাহীনতার কারণে বর্তমানে যারা সর্বজনীন পেনশনে যুক্ত আছেন তাদেরও প্রিমিয়াম চালিয়ে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

সর্বজনীন পেনশনের প্রভাবে কী ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী সবুজ বাংলাকে বলেন, সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর সময় বলেছিল-যারা কোনো পেনশনে যুক্ত নেই, তাদের সুবিধার্থে এই পেনশন চালু করা হয়েছে। কিন্তু এতে জনগণের আস্থা পায়নি সরকার। প্রথমেই হোঁচট খেয়ে এখন বিভিন্ন পেনশন সুবিধাভোগীদের বাধ্যতামূলকভাবে এর আওতায় আনছে। বিশেষ করে কোনো আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরকে প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এরমধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সরকারি কর্মজীবীদের মধ্যে চরম বৈষম্য বাড়বে তেমনি শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে মেধাবীদের আগ্রহ কমে যাবে। এর আগে পে-স্কেলের মাধ্যমেও শিক্ষকদের একধাপ নিচে নামানো হয়েছিল। তবে যারা নতুন করে পেনশনের আওতায় এসেছে তাদের জন্য ভালো হলেও পুরানো পেনশনভোগীদের জন্য বঞ্চনার বিষয়। শিক্ষকদের এতে যুক্ত করার পরিবর্তে তাদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো চালু করার প্রস্তাব দেন তিনি।

শিক্ষকেরা বলছেন, প্রত্যয় স্কিমে মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা (যেটি সর্বনিম্ন) কেটে রাখার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান পেনশন ব্যবস্থায় নেই। এ ছাড়া প্রত্যয় স্কিমে আনুতোষিকও শূন্য। বর্তমানে পেনশনার ও নমিনি আজীবন পেনশনপ্রাপ্ত হন; কিন্তু প্রত্যয় স্কিমে পেনশনাররা ৭৫ বছর পর্যন্ত পেনশন পাবেন। বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যায়, সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমে তা উল্লেখ নেই। এর বাইরে প্রত্যয় স্কিমে পেনশনধারীদের বয়সসীমা ৫৯ বছর রাখা হয়েছে, যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অবসরে যান ৬৫ বছরে। আর বর্তমান পেনশন ব্যবস্থায় এককালীন বিশাল অঙ্কের অর্থ পাওয়া যায়, যা প্রত্যয় স্কিমে সম্ভব নয়।

সর্বজনীন পেনশনের সমালোচনা করে সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক ঘাটতি মেটাতেই মূলত, এই পেনশন স্কিম চালু করেছে সরকার। কারণ ১০ বছর ধরে সরকার শুধু টাকা সংগ্রহ করবে। এরপর সুবিধাভোগীদের পাওনা দেওয়ার চিন্তা। অনেক বিমা কোম্পানির মতো এই পেনশন পেতেও অনিশ্চয়তা দেখছেন অনেকে।

শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, গত ক’বছর ধরে মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর খরচের বহর আমাদের মোটেও আশ্বস্ত করে না, নৈরাশ্য আমাদের ঘিরে ধরে। বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে বা হচ্ছে, তা অন্যান্য দেশে একই ধরনের প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় দুই-তিন গুণ। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কিছুতেই সময়সীমা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পগুলো বড় দায় সৃষ্টি করছে। তাই পেনশন স্কিম থেকে প্রাপ্ত অর্থের সার্বিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে বড় রকমের বিপদে পড়তে হবে। শতভাগ ভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে পেনশন তহবিলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য গোলাম মোস্তফা গণমাধ্যমকে বলেন, পেনশন কর্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করবে। কারো কোনো আপত্তি থাকলে সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তা সংশোধন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমগুলোকে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় হতে হবে। প্রবাসীদের আগ্রহী করতে হলে, তাদের বোঝাতে হবে, অন্যান্য বিনিয়োগের চেয়ে সর্বজনীন পেনশনে বিনিয়োগ করলে বেশি লাভ হবে। স্কিমটাও সেভাবে সাজাতে হবে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অন্যান্য দেশ স্কিম প্রণয়নে কি কি মডেল অনুসরণ করছে, সেগুলো পর্যালোচনা করেও আমাদের স্কিমগুলো রিভাইজ করা যেতে পারে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সুবিধা ও আবেদনের পদ্ধতি: সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি সকল বাংলাদেশি নাগরিক অংশ নিতে পারবেন। তবে, বিশেষ বিবেচনায় পঞ্চাশোর্ধ নাগরিকগণও ১০ বছর নিরবচ্ছিন্ন চাঁদা প্রদান করলে আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন; প্রবাস থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রেরিত চাঁদার ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যাবে। চাঁদার টাকা ট্রেজারি বন্ডসহ নিরাপদ কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা হবে; সর্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রদত্ত চাঁদা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যাবে; আবেদনের সময় চাঁদাদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যক; মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থও আয়করমুক্ত থাকবে; নির্ধারিত ফরমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে, যার বিপরীতে আবেদনকারীর অনুকূলে একটি ইউনিক আইডি প্রদান করা হবে; মোবাইল নম্বর ও প্রবাসীদের ইমেইলের মাধ্যমে ইউনিক আইডি নম্বর, চাঁদার হার এবং মাসিক চাঁদা প্রদানের তারিখ অবহিত করা হবে; পেনশনের টাকা তোলার জন্য কোনো অফিসে যেতে হবে না। নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেনশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে; পেনশন স্কিম ও চাঁদার হার যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যাবে। তবে, পেনশনার আইডি অপরিবর্তিত থাকবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন প্রকল্প: এবার সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ নামে একটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা তিন হাজার ৮০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে এডিবির অর্থায়নের পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৫ কোটি ডলার এবং অবশিষ্ট সাড়ে সাত কোটি ডলার ব্যয় করবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়সীমা ধরা হয়েছে তিন বছর আট মাস (চলতি বছরের নভেম্বর থেকে আগামী ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত)।

পেনশনে যুক্ত হতে নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান : আওয়ামী লীগসহ এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুব মহিলা লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল গণভবনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম, এটা আমরা সবার জন্য দিয়েছি। এটি আমাদের ২০০৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে ছিল। শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পান, বাকিরা বঞ্চিত থাকেন। কেউ যাতে বঞ্চিত না থাকেন, সেজন্য স্তরভেদে সর্বজনীন পেনশনের ব্যবস্থা করা আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাত্র সংসদে ভোটের ফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না: মির্জা ফখরুল

সর্বজনীন পেনশন নিয়ে বাড়ছে সংকট

আপডেট সময় : ০৭:২৪:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৮ জুলাই ২০২৪

➤ সরকারি ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা
➤ উচ্চশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষকদের আগ্রহ কমবে
➤ এই পেনশনে যুক্তদের কিস্তি চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা
➤ পেনশন বাস্তবায়নে ৩৮০২ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার
➤ পেনশনে যুক্ত হতে নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান
➤ জনগণের মাঝে আস্থা বাড়ানো, পুরোনো পেনশনভোগীদের আওতামুক্ত রাখা এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে পেনশন তহবিলের ব্যবস্থা নিশ্চিতের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

দেশে বর্তমানে আলোচিত একটি বিষয় সর্বজনীন পেনশন। ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি দেশের সব নাগরিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী বা কর্মের বাইরে থাকা ধনী-গরিব সবার জন্য এই সুবিধা চালু করেছে সরকার। সুবিধাভোগীর বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হওয়ার পর আজীবন পেনশন সুবিধা ভোগ করা যাবে। ন্যূনতম ১০ বছর চাঁদা দেওয়া সাপেক্ষে এ সুবিধা পাওয়া যাবে। জাতীয় সংসদে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩’ পাস এবং ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩ তাতে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রগতি, সমতা, প্রবাস ও সুরক্ষা-এই চার কর্মসূচি নিয়ে সর্বজনীন পেনশন চালু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট। গত ১ জুলাই থেকে প্রত্যয় নামে আরেকটি স্কিম চালু হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের জুলাই থেকে সেবক নামে আরেকটি স্কিম চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। আর সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাস্তবায়ন বা কার্যকরের জন্য সরকার ৩৮০২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে সর্বজনীন পেনশন নিয়ে শুরুতেই এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে যেমন বিশেষজ্ঞরা এই পেনশন ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি ও দুর্বলতার দিকগুলো তুলে ধরেন, তেমননি এর সুফল নিয়ে সরকারি মহল থেকে ব্যাপক প্রচার অব্যাহত রয়েছে। এজন্য শুরুর দিকে সর্বজনীন পেনশনে বেসরকারি পর্যায়ের মানুষের তেমন কোনো সাড়া না থাকলেও ধীরে ধীরে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মজীবীদের বিভিন্নভাবে এই পেনশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা থাকায় এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী গত জুন পর্যন্ত সর্বজনীন পেনশনের আওতায় নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। তবে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া প্রত্যয় স্কিম নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা এবং এটি প্রত্যাহারের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে আশ^স্ত করে পেনশন কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষকরা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারও বেশ বিপাকে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া শিক্ষকদের এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ক্ষমতায় প্রত্যয় স্কিম বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

এ বিষয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান বলেছেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম আমরা চালু করেছি দেশের সব মানুষের জন্য। শ্রমিক, কর্মজীবী এমনকি রাজনৈতিক কর্মীসহ যাদের জন্য কখনোই অবসর জীবনে কোনো অর্থনৈতিক সুযোগই ছিল না। সেই বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে যখনই কথা হয়েছে, তারা বলেছেন, তাদের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম খুব চমৎকার। যারা এর (প্রত্যয় স্কিম) আওতায় নেই তারা অনেক কথা বলছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে। অবশ্যই গণতান্ত্রিক দেশ কথা বলতেই পারেন। তবে ‘প্রত্যয়’ স্কিম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে ‘তথ্যের ঘাটতি’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শনিবার রাতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো পেনশনের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের পেনশনের আওতায় আনার যে উদ্দেশ্যে সর্বজনীন পেনশন চালু হয়েছিল, তা থেকে দূরে সরে গেছে সরকার। একটি নিয়মে পেনশন ভোগ করে সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের নতুন পেনশনের আওতায় আনলে তারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হবেন এবং ভবিষ্যতে মেধাবী শিক্ষক হারানোর শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া নানা আস্থাহীনতার কারণে বর্তমানে যারা সর্বজনীন পেনশনে যুক্ত আছেন তাদেরও প্রিমিয়াম চালিয়ে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

সর্বজনীন পেনশনের প্রভাবে কী ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী সবুজ বাংলাকে বলেন, সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর সময় বলেছিল-যারা কোনো পেনশনে যুক্ত নেই, তাদের সুবিধার্থে এই পেনশন চালু করা হয়েছে। কিন্তু এতে জনগণের আস্থা পায়নি সরকার। প্রথমেই হোঁচট খেয়ে এখন বিভিন্ন পেনশন সুবিধাভোগীদের বাধ্যতামূলকভাবে এর আওতায় আনছে। বিশেষ করে কোনো আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরকে প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এরমধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সরকারি কর্মজীবীদের মধ্যে চরম বৈষম্য বাড়বে তেমনি শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে মেধাবীদের আগ্রহ কমে যাবে। এর আগে পে-স্কেলের মাধ্যমেও শিক্ষকদের একধাপ নিচে নামানো হয়েছিল। তবে যারা নতুন করে পেনশনের আওতায় এসেছে তাদের জন্য ভালো হলেও পুরানো পেনশনভোগীদের জন্য বঞ্চনার বিষয়। শিক্ষকদের এতে যুক্ত করার পরিবর্তে তাদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো চালু করার প্রস্তাব দেন তিনি।

শিক্ষকেরা বলছেন, প্রত্যয় স্কিমে মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা (যেটি সর্বনিম্ন) কেটে রাখার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান পেনশন ব্যবস্থায় নেই। এ ছাড়া প্রত্যয় স্কিমে আনুতোষিকও শূন্য। বর্তমানে পেনশনার ও নমিনি আজীবন পেনশনপ্রাপ্ত হন; কিন্তু প্রত্যয় স্কিমে পেনশনাররা ৭৫ বছর পর্যন্ত পেনশন পাবেন। বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যায়, সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমে তা উল্লেখ নেই। এর বাইরে প্রত্যয় স্কিমে পেনশনধারীদের বয়সসীমা ৫৯ বছর রাখা হয়েছে, যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অবসরে যান ৬৫ বছরে। আর বর্তমান পেনশন ব্যবস্থায় এককালীন বিশাল অঙ্কের অর্থ পাওয়া যায়, যা প্রত্যয় স্কিমে সম্ভব নয়।

সর্বজনীন পেনশনের সমালোচনা করে সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক ঘাটতি মেটাতেই মূলত, এই পেনশন স্কিম চালু করেছে সরকার। কারণ ১০ বছর ধরে সরকার শুধু টাকা সংগ্রহ করবে। এরপর সুবিধাভোগীদের পাওনা দেওয়ার চিন্তা। অনেক বিমা কোম্পানির মতো এই পেনশন পেতেও অনিশ্চয়তা দেখছেন অনেকে।

শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, গত ক’বছর ধরে মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর খরচের বহর আমাদের মোটেও আশ্বস্ত করে না, নৈরাশ্য আমাদের ঘিরে ধরে। বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে বা হচ্ছে, তা অন্যান্য দেশে একই ধরনের প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় দুই-তিন গুণ। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কিছুতেই সময়সীমা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পগুলো বড় দায় সৃষ্টি করছে। তাই পেনশন স্কিম থেকে প্রাপ্ত অর্থের সার্বিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে বড় রকমের বিপদে পড়তে হবে। শতভাগ ভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে পেনশন তহবিলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য গোলাম মোস্তফা গণমাধ্যমকে বলেন, পেনশন কর্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করবে। কারো কোনো আপত্তি থাকলে সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তা সংশোধন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমগুলোকে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় হতে হবে। প্রবাসীদের আগ্রহী করতে হলে, তাদের বোঝাতে হবে, অন্যান্য বিনিয়োগের চেয়ে সর্বজনীন পেনশনে বিনিয়োগ করলে বেশি লাভ হবে। স্কিমটাও সেভাবে সাজাতে হবে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অন্যান্য দেশ স্কিম প্রণয়নে কি কি মডেল অনুসরণ করছে, সেগুলো পর্যালোচনা করেও আমাদের স্কিমগুলো রিভাইজ করা যেতে পারে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সুবিধা ও আবেদনের পদ্ধতি: সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি সকল বাংলাদেশি নাগরিক অংশ নিতে পারবেন। তবে, বিশেষ বিবেচনায় পঞ্চাশোর্ধ নাগরিকগণও ১০ বছর নিরবচ্ছিন্ন চাঁদা প্রদান করলে আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন; প্রবাস থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রেরিত চাঁদার ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যাবে। চাঁদার টাকা ট্রেজারি বন্ডসহ নিরাপদ কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা হবে; সর্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রদত্ত চাঁদা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যাবে; আবেদনের সময় চাঁদাদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যক; মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থও আয়করমুক্ত থাকবে; নির্ধারিত ফরমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে, যার বিপরীতে আবেদনকারীর অনুকূলে একটি ইউনিক আইডি প্রদান করা হবে; মোবাইল নম্বর ও প্রবাসীদের ইমেইলের মাধ্যমে ইউনিক আইডি নম্বর, চাঁদার হার এবং মাসিক চাঁদা প্রদানের তারিখ অবহিত করা হবে; পেনশনের টাকা তোলার জন্য কোনো অফিসে যেতে হবে না। নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেনশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে; পেনশন স্কিম ও চাঁদার হার যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যাবে। তবে, পেনশনার আইডি অপরিবর্তিত থাকবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন প্রকল্প: এবার সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ নামে একটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা তিন হাজার ৮০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে এডিবির অর্থায়নের পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৫ কোটি ডলার এবং অবশিষ্ট সাড়ে সাত কোটি ডলার ব্যয় করবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়সীমা ধরা হয়েছে তিন বছর আট মাস (চলতি বছরের নভেম্বর থেকে আগামী ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত)।

পেনশনে যুক্ত হতে নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান : আওয়ামী লীগসহ এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুব মহিলা লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল গণভবনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম, এটা আমরা সবার জন্য দিয়েছি। এটি আমাদের ২০০৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে ছিল। শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পান, বাকিরা বঞ্চিত থাকেন। কেউ যাতে বঞ্চিত না থাকেন, সেজন্য স্তরভেদে সর্বজনীন পেনশনের ব্যবস্থা করা আছে।