❖ ঢাকাসহ সারা দেশে অভিযান অব্যাহত
❖ ধানমন্ডিতে জামায়াতের আস্তানায় সিটিটিসির হানা
❖ নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি গ্রেপ্তার
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট-ধ্বংসযজ্ঞসহ দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার তাণ্ডবলীলায় পুলিশ-সাংবাদিকসহ হতাহতের ঘটনায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত ২০৭ মামলায় ২৫৩৬ জনসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সাড়ে ৫ শতাধিক মামলায় এ পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এদের মধ্যে বেশিরভাগই জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মী রয়েছে। ভুক্তভোগী অনেকেই অভিযোগ করেছেন, পুলিশ নিরপরাধীদের ধরে নিয়ে অর্থ দাবি করছেন, টাকা না পেলে নাশকতার মামলায় আসামি দেখিয়ে আদালতে পাঠাচ্ছেন। তবে পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদসহ যেসব স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ ও নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে, সেসব এলাকার ভিডিও ফুটেজ দেখে দেখে জড়িতদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। নিরপরাধী কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হচ্ছে না। এদিকে ধানমন্ডির একটি বাসায় জামায়াত-শিবিরের গোপন আস্তানার সন্ধান পেয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একটি দল। সেখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র-বোমা ও গোলাবারুদসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল পুলিশ-র্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনের মধ্যে গত ১৭ জুলাই দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবে রাজধানীজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। ওইদিন রাতে দুষ্কৃতকারীরা হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজা পুড়িয়ে দেয়। রাতভর যাত্রাবাড়ী এলাকায় চলে সংঘর্ষ। ১৮ জুলাইও টোলপ্লাজায় আগুন দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে চালানো হয় তাণ্ডব। আগুন দেওয়া হয় একাধিক পুলিশ বক্সে। ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় বিটিভি, সেতু ভবন, মেট্রো রেলস্টেশন, ডেটা সেন্টার, বিআরটিএ ভবনে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯ জুলাই দিবাগত মধ্যরাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। সেই সঙ্গে নামানো হয় সেনাবাহিনী। এতে গৃহবন্দি হয়ে পড়ে মানুষ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে খুব একটা বের হতে পারেনি। তবে সেনাবাহিনী রাস্তায় নামার পর অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ফলে শিথিল করা হয়েছে কারফিউ। দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবে বিটিভি ও সেতু ভবন, মেট্রো রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় রাজধানী ঢাকায় এ পর্যন্ত দায়েরকৃত ২০৭টি মামলায় ২৫৩৬ জনসহ সারা দেশে সাড়ে ৫ শতাধিক মামলায় এ পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে বগুড়ায় ১৪৫, ফেনীতে ৮৪, পাবনায় ৩৩ ও খুলনায় ৭ জন রয়েছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মী রয়েছে। ভুক্তভোগী অনেকেই অভিযোগ করেছেন, পুলিশ নিরপরাধীদের ধরে নিয়ে অর্থ দাবি করছেন, টাকা না পেলে নাশকতার মামলায় আসামি দেখিয়ে আদালতে পাঠাচ্ছেন। তবে পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু গণমাধ্যমকে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদসহ যেসব স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ ও নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে, সেসব এলাকার ভিডিও ফুটেজ দেখে দেখে জড়িতদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। নিরপরাধী কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হচ্ছে না। ডিএমপির মিডিয়া সেলের এডিসি কেএন রায় নিয়তি জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ঢাকাসহ সারা দেশে সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০৭। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ২৫৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এদের বেশিরভাগ বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী। তিনি জানান, সহিংসতা নাশকতার ঘটনায় গোয়েন্দা তথ্য ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার বিকাল পর্যন্ত ঢাকায় ২৫৩৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদিকে সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে র্যাব। অভিযানে ঢাকায় ৭১ ও ঢাকার বাইরে ২১৯ জনসহ মোট ২৯০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল বিকালে সবুজ বাংলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক আ ন ম ইমরান খান। এদিকে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি নবী হোসেনকে (৪৮) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল ভোর ৬টার দিকে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নবী হোসেন উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকার শাহাবুদ্দিনের ছেলে। তিনি ২০০৮ সালের নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার বারৈচা হাইওয়ে সড়কে বাস ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন।
র্যাবের ভৈরব ক্যাম্পের স্কোয়াড কমান্ডার এএসপি মো. শহিদুল্লাহ জানান, গত ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার ঘটনায় ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যান। এ ঘটনায় র্যাব তাদের শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তারের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার ভোরে নবী হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জানান, নবী হোসেন নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে পায়ে হেঁটে ইটাখোলা বাসস্ট্যান্ডে আসেন। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকার নিজ বাড়িতে এসে আত্মগোপন করেন। গ্রেপ্তারের পর নবী হোসেনকে বেলাবো থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে ডিএমপির মিডিয়া সেলের এডিসি কেএন রায় নিয়তি জানান, গতকাল বিকালে গোপন সংবাদে রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি বাসায় জামায়াত-শিবিরের অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুত রাখার গোপন আস্তানার সন্ধান পেয়েছে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে রাজধানীর ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোড সংলগ্ন ৫/এ অবসর ভবনে ওই আস্তানার সন্ধান মিলেছে বলে দাবি সিটিটিসির। গতকাল শনিবার সিটিটিসির ডিসি মিশুক চাকমা জানান, ভবনটি ঘিরে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। সঙ্গে দেশীয় অস্ত্র, ককটেল ও বিস্ফোরক জব্দ করা হয়েছে। অভিযান শেষে এক সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (সিটিটিসি) মো. আসাদুজ্জামান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে নাশকতাকারীরা যে তাণ্ডবলীলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা, কারোরই কাম্য নয়, জড়িতদের সর্বশক্তি দিয়ে চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি করা হবে। এটা থেকে আমরা এক পা-ও সরে দাঁড়াব না। তিনি বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে কারফিউ জারি করেছি। আমরা সেনাবাহিনীকে ডেকেছি। তারা সহযোগিতা করছে। এই জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের উত্থান, বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্ত এরই মধ্যে আমরা কন্ট্রোল করে নিয়ে এসেছি। আগামী দু-চারদিনের মধ্যে আশা করি সবই কন্ট্রোল করে নিয়ে আসব। কারণ, দেশের মানুষ এটা পছন্দ করছে না। আমরা মনে করি সবাই মিলে এটা প্রতিহত করব। এই গোষ্ঠীকে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে দেব না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর কাজ শেষ হলে, দেশের পরিবেশ যখন ঠিক হবে, সেনাবাহিনী তাদের কাজে চলে যাবে। কারফিউ প্রত্যাহার হবে এবং জনজীবন আবারো স্বাভাবিক গতিতে চলবে। আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি সেটি ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করছি।






















