◉সচিবালয়ে নতুন উদেষ্টাদের কর্মব্যস্ততা, জানালেন নানা পরিকল্পনা ও নির্র্দেশনা
◉রদবদল ও চাকরি হারানোর আতঙ্কে অনেকে
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিরাজ করছিল চরম অস্থিরতা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারফিউ জারি, সাধারণ ছুটিতেও কেটেছে বহুদিন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। এর তিন দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর এ সরকার গঠনের দুই দিন পর গতকাল ছিল সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তাই নতুন উদ্যমে শুরু সরকারি অফিস-আদালত। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সর্বত্রই রদবদল আর চাকরি হারানোর শঙ্কার মধ্যেই গতকাল বেশ কর্মমুখর হয়ে ওঠে সব প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে সচিবালয়ে বেশ কর্মব্যস্ত ছিলেন নতুন উপদেষ্টারা। এসময় তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নানা পরিকল্পনা ও নির্দেশনা জানিয়েছেন।
গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে চূড়ান্তভাবে একটি নিরপেক্ষ এবং সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর। এটা নিয়ে সন্দেহের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। সেটি সাত দিন লাগতে পারে, ১৫ দিন লাগতে পারে, আবার দুই মাসও লাগতে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অধিকতর জনবান্ধব মন্ত্রণালয়ে পরিণত করা হবে। বিভিন্ন প্রকার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা হবে। ছাত্র জনতার আন্দোলনে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে উপদেষ্টা বলেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তরসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে গতিশীলতা বৃদ্ধিতে মোটিভেশনাল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সকালে এ মতবিনিময় সভার শুরুতেই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান। পরে অ্যালোকেশন অব বিজনেস অ্যামং দি ডিফারেন্ট মিনিস্ট্রিজ এন্ড ডিভিশনস অনুযায়ী ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিধি এবং ভিশন ও মিশন উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসমূহ সম্পর্কে উপদেষ্টাকে অবহিত করা হয়।
এদিকে জনরোষে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা সচিবদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে ছাত্র-জনতা। একই সঙ্গে যারা এখন কর্মরত তাদের দ্রুত অপসারণ দাবি করেছেন তারা। গতকাল বেলা ১১টা থেকে তারা সচিবালয়ের সামনে ছাত্র-জনতা পরিচয়ে অবস্থান নেন কয়েকশজন। এ সময় তারা সচিবদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এদিকে, সচিবালয় গেটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন সেনা সদস্যরা। তবে বিক্ষোভকারীদের কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি।
অন্যদিকে ৬ দফা দাবিতে ‘বাংলাদেশ সচিবালয় বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী সংগঠনের’ ব্যানারে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করেছে ১০ম-২০তম গ্রেডের একদল কর্মচারী। গতকাল বিকালে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে সচিবালয় বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ)’ কার্যালয়ে আসেন তারা। এসময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মো. মনির হোসেন তাদের ৬ দফা দাবির কথা সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, আমি ২১ বছরে মাত্র একবার পদোন্নতি পেয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর আমাদের এত বঞ্চিত করেছে, যেটা কল্পনা করা যায় না।
স্থবিরতা কাটিয়ে উঠছে ঢাকার নিম্ন আদালত : সরকার পতনের আন্দোলনকে সাধারণ ছুটি ঘিরে স্থবির হয়ে পড়েছিল ঢাকার নিম্ন আদালত। তবে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে কাজ চলছে। গতকাল ঢাকার আদালতগুলোতে সীমিত পরিসরে বিচারকাজ চলছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন এজলাসে বসেন। এদিন বিচারিক আদালতের মামলাসহ ফৌজদারি বিবিধ মামলাগুলো শুনানি হচ্ছে। একই অবস্থা দেখা যায়, বিশেষ আদালতগুলোতে। কার্যতালিকায় মামলাগুলো এদিন আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তবে সাক্ষ্যগ্রহণ বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো শুনানি হয়নি বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের কোনো আইনজীবীও এদিন আদালতে হাজির হননি।
বিচারকাজ চলেছে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতেও। এদিন বিচারকাজ চলেছে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হেলাল উদ্দিনের আদালতে। দেওয়ানি, ফৌজদারি ও ফৌজদারি বিবিধ মামলার শুনানি হয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত সপ্তাহে সীমিত পরিসরে কাজ চলেছে। চলতি সপ্তাহে কাজের পরিধি কিছুটা বেড়েছে। তবে আদালত প্রাঙ্গণে পোশাকসহ কোনো পুলিশকে নিরাপত্তা রক্ষায় দেখা যায়নি। তবে বিজিবির অল্প সংখ্যক সদস্যকে আদালত এলাকায় নিরাপত্তা দিতে দেখা যায়।
এদিকে শনিবার সুপ্রিম কোর্ট ঘিরে চরম উত্তেজনার এক পর্যায়ে পদত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি এবং পাঁচজন বিচারপতি। পরে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। গতকাল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ শপথ নিয়েছেন। এর মধ্যদিয়ে উচ্চ আদালতটির তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। আজ থেকে এখানে বিচার কাজ শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। এর আগে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয় সরকার।
আদালতে কোনো সিন্ডিকেটের তথ্য জানা মাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টে কোনো হস্তক্ষেপ হবে এটা আমি চিন্তাও করি না। সিন্ডিকেট কেউ করে থাকলে আমাদের জানাবেন। জানানো মাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেলের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল স্যার কোনো সিন্ডিকেট করবেন এটা তার শত্রুও বিশ্বাস করবে না।’ তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা করি তিনি দ্রুত দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এ জায়গাটি উন্নত করবেন।’ হাইকোর্ট বিভাগ ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন মনে করেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অবশ্যই মনে করি। যে কারণে জনরোষ তৈরি হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগে কেন হবে না।’

























