১২:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, ২০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

◉সংঘর্ষে পাহাড়ে ঝরল ৪ প্রাণ
◉ প্রতিবাদে শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ
◉ খাগড়াছড়ি-রাঙামাটিতে ১৪৪ ধারা জারি
◉ আজ পরিদর্শনে যাচ্ছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল
◉সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল। একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দুপক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৪ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। থেমে থেমে সংঘর্ষের এ ঘটনায় দুই জেলায় আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। এ ঘটনায় পাহাড়িদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতা’। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আজ শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাচ্ছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে আইএসপিআর। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে যেকোনো ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল শুক্রবার জেলা প্রতিনিধির পাঠানো খবর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অপরাধে মামুন হোসেন নামের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা মিছিল করেন। মিছিলটি লারমা স্কয়ারের দিকে অগ্রসর হলে একপক্ষ তাতে বাধা দেয়। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরে সেখানকার দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুড়ে যায় অন্তত ৫০-৬০টি দোকান। এদিকে খাগড়াছড়িতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। এ সংঘাতের জেরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় খাগড়াছড়ি পৌরশহর ও জেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। পরে দুপুরের দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সহিদুজ্জামান। সব পক্ষকে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের সহিংসতা রোধে এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুজন চন্দ্র রায় স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৯৮ সালের ১৪৪ ধারা মতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলাম। শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
খাগড়াছড়িতে সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিলের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে আরেক পার্বত্য শহর রাঙামাটিতেও। সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে শহরের জিমনেশিয়াম চত্বর থেকে কয়েক হাজার পাহাড়ির একটি মিছিল বের হয়ে বনরূপায় গেলে সেখানে মিছিলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে, এমন অভিযোগ করে বেশকিছু দোকানপাট ভাঙচুর করে মিছিলকারীরা। এতে একজন নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এ সময় তারা রাস্তায় চলাচলকারী বাস-ট্রাক ভাঙচুর করে।
রাঙামাটি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. জামালউদ্দিন জানান, গতকাল সকালে পাহাড়িদের একটি মিছিল বনরূপায় এসে ফিরে যাওয়ার সময় বিনা উস্কানিতেই বনরূপা এলাকায় দেদারসে বাঙালিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বনরূপা মসজিদে হামলা ও ভাংচুর করে, বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। এরপরই বাঙালি ব্যবসায়িরা সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের পাল্টা ধাওয়া দেয়। এ সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
পুলিশ জানায়, রাঙামাটিতে সকালে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হয়। শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ টহল টিম শহরে কাজ শুরু করেছে। রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাদিয়া আক্তার জানান, এরই মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে তার নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের মতো আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। যাদের মধ্যে অন্তত ৭ জনের অবস্থা এখনও গুরুতর।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন খান জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দুপুর দেড়টা থেকে রাঙামাটি পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
এদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়িদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতা’। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে কয়েক শতাধিক মানুষ এ অবরোধে অংশ নেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তারা সমাবেশ করেন। এ সময় তারা পাহাড়িদের বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তারা মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যান। তারা ২০-২৫ মিনিট শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ করে রাখেন।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ইনস্টা চাকমা নামের একজন বলেন, খাগড়াছড়িতে আমাদের ভাইদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আমরা পাহাড়ে এমন রক্তপাত দেখতে চাই না। আমরা এর নিন্দা জানাই। কোনো আদিবাসীদের ঘরবাড়ি জ্বালানো চলবে না। আমরা নিশ্চিন্তে পাহাড়ে থাকতে চাই। নিপ্পন চাকমা বলেন, আমরা যখন আমাদের অধিকার আদায়ে কথা বলি, তখন আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা হয়। আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী নই। আমাদের ওপর আঘাত এলে অস্তিত্ব রক্ষায় আমরা বসে থাকব না।
এদিকে পার্বত্য তিন জেলায় সংঘর্ষ নিয়ে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে উচ্ছৃঙ্খল জনগণের গণপিটুনিতে মো. মামুন নামক একজন যুবক নিহত হন। পরবর্তীতে সদর থানা পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বিকালে দীঘিনালা কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি দীঘিনালার বোয়ালখালী বাজার অতিক্রম করার সময় ইউপিডিএফের (মূল) সন্ত্রাসীরা মিছিলের ওপর হামলা করে ও ২০-৩০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ জনতা বোয়ালখালী বাজারের কয়েকটি দোকানে অগ্নি সংযোগ করে। আইএসপিআর আরও জানায়, সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের ৬ জন আহত হলে তাদের চিকিৎসার জন্য দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ফায়ার ব্রিগেড ও স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় আগুন নেভায়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে খাগড়াছড়ি জেলা সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি ও আশেপাশের এলাকাতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে ক্রমেই পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাকর করে তোলে। দ্রুততার সঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জরুরি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা থেকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর, দীঘিনালা ও পানছড়িসহ সব উপজেলায় যৌথভাবে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে টহল দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন কমিউনিটি লিডারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সব পক্ষকে সহিংস কার্যকলাপ হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই রাতে খাগড়াছড়ি জোনের একটি টহল দল সাড়ে ১০টায় একজন মুমূর্ষু রোগীকে স্থানান্তরের সময় খাগড়াছড়ি শহরের স্বনির্ভর এলাকায় পৌঁছালে অবস্থানরত উত্তেজিত জনসাধারণ ইউপিডিএফের (মূল) নেতৃত্বে বাধা সৃষ্টি করে। এক সময় ইউপিডিএফের (মূল) সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর টহল দলের সদস্যদের ওপর গুলি করে এবং আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি চালায়। এ গোলাগুলির ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং কয়েকজন আহত হন বলে জানা যায়। আইএসপিআর জানায়, একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল জনসাধারণ কয়েকজন যুবকের মোটরসাইকেল থামিয়ে তাদের ওপর হামলা ও লাঠিপেটা করে। সেই সঙ্গে উত্তেজিত জনসাধারণ ইউপিডিএফের (মূল) নেতৃত্বে ফায়ার ব্রিগেডের অফিসে ভাঙচুর করে। গতকাল সকালে পিসিজেএসএস সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ রাঙ্গামাটি জেলা সদরে ‘সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে স্থানীয় জনসাধারণ রাঙ্গামাটি জিমনেশিয়াম এলাকায় সমবেত হয়। এ সময় ৮০০-১০০০ জন উত্তেজিত জনসাধারণ একটি মিছিল বের করে বনরুপা এলাকার দিকে অগ্রসর হয় এবং বনরুপা বাজার মসজিদ, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং বেশকিছু দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে করে উভয় পক্ষের বেশকিছু লোকজন আহত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি জেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। উপরোক্ত ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে চলমান উত্তেজনা তিন পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে। অনতিবিলম্বে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। যথাযথ তদন্ত কার্যক্রম সম্পাদনের মাধ্যমে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের শনাক্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে আইএসপিআর। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।

অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসকারী সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানকার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ও গতকাল রাঙামাটিতে সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে আন্তরিকভাবে কাজ করছে সরকার। গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি ও পরবর্তীতে তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলমান হামলা, আক্রমণ ও প্রাণহানির ঘটনায় সরকার গভীরভাবে দুঃখিত এবং ব্যথিত। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে এবং পার্বত্য তিন জেলায় বসবাসকারী সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। এতে আরও বলা হয়, আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এবং ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হওয়ার জন্য সবাইকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়া এবং যেকোনো সম্পত্তি ধ্বংস করা দণ্ডনীয় ও গর্হিত অপরাধ। সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত আর দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি খুব শিগগিরই গঠন করা হবে। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আজ শনিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পরিদর্শন করবেন। এই প্রতিনিধি দলে থাকছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।

জনপ্রিয় সংবাদ

সোনারগাঁয়ে আল হাবিব ইন্টা.ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মাঝে বই বিতরণ

অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

আপডেট সময় : ০৭:৪৭:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪

◉সংঘর্ষে পাহাড়ে ঝরল ৪ প্রাণ
◉ প্রতিবাদে শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ
◉ খাগড়াছড়ি-রাঙামাটিতে ১৪৪ ধারা জারি
◉ আজ পরিদর্শনে যাচ্ছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল
◉সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল। একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দুপক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৪ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। থেমে থেমে সংঘর্ষের এ ঘটনায় দুই জেলায় আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। এ ঘটনায় পাহাড়িদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতা’। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আজ শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাচ্ছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে আইএসপিআর। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে যেকোনো ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল শুক্রবার জেলা প্রতিনিধির পাঠানো খবর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অপরাধে মামুন হোসেন নামের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা মিছিল করেন। মিছিলটি লারমা স্কয়ারের দিকে অগ্রসর হলে একপক্ষ তাতে বাধা দেয়। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরে সেখানকার দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুড়ে যায় অন্তত ৫০-৬০টি দোকান। এদিকে খাগড়াছড়িতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। এ সংঘাতের জেরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় খাগড়াছড়ি পৌরশহর ও জেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। পরে দুপুরের দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সহিদুজ্জামান। সব পক্ষকে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের সহিংসতা রোধে এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুজন চন্দ্র রায় স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৯৮ সালের ১৪৪ ধারা মতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলাম। শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
খাগড়াছড়িতে সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিলের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে আরেক পার্বত্য শহর রাঙামাটিতেও। সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে শহরের জিমনেশিয়াম চত্বর থেকে কয়েক হাজার পাহাড়ির একটি মিছিল বের হয়ে বনরূপায় গেলে সেখানে মিছিলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে, এমন অভিযোগ করে বেশকিছু দোকানপাট ভাঙচুর করে মিছিলকারীরা। এতে একজন নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এ সময় তারা রাস্তায় চলাচলকারী বাস-ট্রাক ভাঙচুর করে।
রাঙামাটি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. জামালউদ্দিন জানান, গতকাল সকালে পাহাড়িদের একটি মিছিল বনরূপায় এসে ফিরে যাওয়ার সময় বিনা উস্কানিতেই বনরূপা এলাকায় দেদারসে বাঙালিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বনরূপা মসজিদে হামলা ও ভাংচুর করে, বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। এরপরই বাঙালি ব্যবসায়িরা সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের পাল্টা ধাওয়া দেয়। এ সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
পুলিশ জানায়, রাঙামাটিতে সকালে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হয়। শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ টহল টিম শহরে কাজ শুরু করেছে। রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাদিয়া আক্তার জানান, এরই মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে তার নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের মতো আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। যাদের মধ্যে অন্তত ৭ জনের অবস্থা এখনও গুরুতর।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন খান জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দুপুর দেড়টা থেকে রাঙামাটি পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
এদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়িদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতা’। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে কয়েক শতাধিক মানুষ এ অবরোধে অংশ নেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তারা সমাবেশ করেন। এ সময় তারা পাহাড়িদের বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তারা মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যান। তারা ২০-২৫ মিনিট শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ করে রাখেন।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ইনস্টা চাকমা নামের একজন বলেন, খাগড়াছড়িতে আমাদের ভাইদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আমরা পাহাড়ে এমন রক্তপাত দেখতে চাই না। আমরা এর নিন্দা জানাই। কোনো আদিবাসীদের ঘরবাড়ি জ্বালানো চলবে না। আমরা নিশ্চিন্তে পাহাড়ে থাকতে চাই। নিপ্পন চাকমা বলেন, আমরা যখন আমাদের অধিকার আদায়ে কথা বলি, তখন আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা হয়। আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী নই। আমাদের ওপর আঘাত এলে অস্তিত্ব রক্ষায় আমরা বসে থাকব না।
এদিকে পার্বত্য তিন জেলায় সংঘর্ষ নিয়ে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে উচ্ছৃঙ্খল জনগণের গণপিটুনিতে মো. মামুন নামক একজন যুবক নিহত হন। পরবর্তীতে সদর থানা পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বিকালে দীঘিনালা কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি দীঘিনালার বোয়ালখালী বাজার অতিক্রম করার সময় ইউপিডিএফের (মূল) সন্ত্রাসীরা মিছিলের ওপর হামলা করে ও ২০-৩০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ জনতা বোয়ালখালী বাজারের কয়েকটি দোকানে অগ্নি সংযোগ করে। আইএসপিআর আরও জানায়, সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের ৬ জন আহত হলে তাদের চিকিৎসার জন্য দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ফায়ার ব্রিগেড ও স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় আগুন নেভায়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে খাগড়াছড়ি জেলা সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি ও আশেপাশের এলাকাতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে ক্রমেই পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাকর করে তোলে। দ্রুততার সঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জরুরি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা থেকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর, দীঘিনালা ও পানছড়িসহ সব উপজেলায় যৌথভাবে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে টহল দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন কমিউনিটি লিডারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সব পক্ষকে সহিংস কার্যকলাপ হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই রাতে খাগড়াছড়ি জোনের একটি টহল দল সাড়ে ১০টায় একজন মুমূর্ষু রোগীকে স্থানান্তরের সময় খাগড়াছড়ি শহরের স্বনির্ভর এলাকায় পৌঁছালে অবস্থানরত উত্তেজিত জনসাধারণ ইউপিডিএফের (মূল) নেতৃত্বে বাধা সৃষ্টি করে। এক সময় ইউপিডিএফের (মূল) সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর টহল দলের সদস্যদের ওপর গুলি করে এবং আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি চালায়। এ গোলাগুলির ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং কয়েকজন আহত হন বলে জানা যায়। আইএসপিআর জানায়, একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল জনসাধারণ কয়েকজন যুবকের মোটরসাইকেল থামিয়ে তাদের ওপর হামলা ও লাঠিপেটা করে। সেই সঙ্গে উত্তেজিত জনসাধারণ ইউপিডিএফের (মূল) নেতৃত্বে ফায়ার ব্রিগেডের অফিসে ভাঙচুর করে। গতকাল সকালে পিসিজেএসএস সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ রাঙ্গামাটি জেলা সদরে ‘সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে স্থানীয় জনসাধারণ রাঙ্গামাটি জিমনেশিয়াম এলাকায় সমবেত হয়। এ সময় ৮০০-১০০০ জন উত্তেজিত জনসাধারণ একটি মিছিল বের করে বনরুপা এলাকার দিকে অগ্রসর হয় এবং বনরুপা বাজার মসজিদ, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং বেশকিছু দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে করে উভয় পক্ষের বেশকিছু লোকজন আহত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি জেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। উপরোক্ত ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে চলমান উত্তেজনা তিন পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে। অনতিবিলম্বে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। যথাযথ তদন্ত কার্যক্রম সম্পাদনের মাধ্যমে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের শনাক্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে আইএসপিআর। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।

অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসকারী সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানকার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ও গতকাল রাঙামাটিতে সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে আন্তরিকভাবে কাজ করছে সরকার। গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি ও পরবর্তীতে তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলমান হামলা, আক্রমণ ও প্রাণহানির ঘটনায় সরকার গভীরভাবে দুঃখিত এবং ব্যথিত। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে এবং পার্বত্য তিন জেলায় বসবাসকারী সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। এতে আরও বলা হয়, আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এবং ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হওয়ার জন্য সবাইকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়া এবং যেকোনো সম্পত্তি ধ্বংস করা দণ্ডনীয় ও গর্হিত অপরাধ। সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত আর দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি খুব শিগগিরই গঠন করা হবে। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আজ শনিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পরিদর্শন করবেন। এই প্রতিনিধি দলে থাকছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।