◉ তাণ্ডব চালায় ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা
◉ হেলমেট বাহিনীকে খুঁজছে পুলিশ-র্যাব
চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে দেশের ইতিহাসের অন্যতম উত্তাল সময় পার করেছে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। কথিত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ কর্মসূচি একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার তোপের মুখে গত ৫ আগস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। তবে এর আগে আন্দোলন দমনের সর্বাত্মক চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাশাপাশি ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন পর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করেছে শেখ হাসিনার সরকারের আ.লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা। তারা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতার অবস্থান লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ১২ জেলায় এমন তাণ্ডব চালিয়েছে হেলমেট পরিহিত ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগে চলমান সহিংসতায় সশস্ত্র হামলা ও গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দেন সরকার। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সহিংসপ্রবণ ১২টি জেলায় ১২৬ জন অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এদের মধ্যে বড় অংশের অনেকেই এখনও অধরা রয়ে গেছে। তাদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ও সীমান্ত এলাকায় ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের কেউ জামাতা, কেউ প্রবাসী ফেরতের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আশ্রয়স্থল থেকে বের হচ্ছেন না। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছাত্র আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা ও গুলির তাণ্ডব চালিয়েছে আ.লীগ সরকারের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ও ভাড়াটে সন্ত্রসীরা। তারা বেশিরভাগ হামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে সাদা পোশাকে হেলমেট পড়ে অপরাধ মিশনে অংশ নিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ইতোমধ্যেই অনেকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি রয়েছেন। হামলা চালানোর ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যারা সশস্ত্র হামলা ও হেলমেট পড়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হেলমেট বাহিনীর সদস্যদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য স্থানে অভিযান চালিয়ে হন্যে হয়ে তাদের খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গতকাল বুধবার পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্র আন্দোলনের তোপের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান ৪ বারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিনই গণভবন, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দেশের থানা ভবনসহ দেশজুড়ে সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। গণঅভ্যুত্থানের আগে ও পরের ৩ দিন হত্যা-হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ মাঠপর্যায়ের বিতর্কিত সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন-বিপ্লবকে; যা অব্যাহত রয়েছে।
সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে শনাক্ত হওয়া ১০ জন অস্ত্রধারীর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩ জনকে। ফেনীতে শনাক্ত হওয়া ৩৩ জন অস্ত্রধারীর মধ্যে ১ জনকে, কেরানীগঞ্জে ৪ জনের মধ্যে ১ জনকে এবং সিরাজগঞ্জে ২ জনের মধ্যে ১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার এ ৬ জনের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। অবশ্য অস্ত্রধারীদের সঙ্গে হামলায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শনাক্ত হওয়া অস্ত্রধারীদের ধরতে চেষ্টার কোনো কমতি নেই বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। একটি ফুটেজে দেখা যায়, ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে অস্ত্র হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যান ঢাকা উত্তর সিটির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাতিজা। গত ১৭-২১ জুলাই এবং ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বছিলা পর্যন্ত সড়কে অবস্থানকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করা হয়েছিল। আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মোহাম্মদপুর এলাকায় দলবল নিয়ে সক্রিয় ছিলেন সাবেক দুই কাউন্সিলর আসিফ ও রাজীব এবং বিপ্লব। গত ৫ আগস্ট দুপুরের পর আত্মগোপনে চলে যান তারা। এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা যায়নি।
গত ৪ আগস্ট ঢাকার মিরপুরে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম জাহিদ। তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। গত ২ আগস্ট উত্তরার জমজম টাওয়ার এলাকায় অস্ত্র হাতে ছিলেন ডিএনসিসির ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন। গত ৪ আগস্ট উত্তরার আজমপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে দেখা গেছে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুরতাফা বিন ওমরকে। এছাড়া আজিমপুর ও পলাশি এলাকায় ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মানিক, ৫৬ নম্বরের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন ও তার ক্যাডার মাহিন, জয়নাল, লালচাঁন সুমন, জাবেদুল ইসলাম জাবেদ, মুসা, নাডা সাহাবুদ্দিন, সিরাজ তালুকদার, তাইজুদ্দিন আহম্মেদ রনি, টিপুসহ শতাধিক সন্ত্রাসী সশস্ত্র হামলা-গুলি চালায়। গত ১৬ জুলাই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হাসান মোল্লাকে অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা যায়নি। এদিকে চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলন দমনে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মহড়ায় যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী ওরফে বাবরের উপস্থিতি ছিল। অন্তর্র্বতী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গেল আড়াই মাসে শত শত মামলা হয়েছে, পুলিশ ও প্রশাসনের সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রদবদল হয়েছে। এরপরও হেলমেট বাহিনীর সব অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি চট্টগ্রাম পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিও ফুটেজে ফেনী শহরের মহিপাল এলাকায় একে-৪৭-এর মতো দেখতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার চোখে পড়েছে। সরকার পতনের আগের দিন, গত ৪ আগস্ট ওই ভিডিওটি ধারণ করা হয়। সেদিন গুলিতে মহিপালে চার শিক্ষার্থীসহ ৯ জন নিহত হন। এ ঘটনায় জড়িত ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন বাবলু এবং ফেনী সদরের কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ৪ আগস্ট মহিপালে অন্তত ৩৩ জনের হাতে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তারা সবাই ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারীর অনুসারী। তবে ৩৩ জন অস্ত্রধারীকে চিহ্নিত করা গেলেও গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র একজন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিভিন্ন সময় (১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত) নারায়ণগঞ্জে যেসব অস্ত্রধারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, শামীমের শ্যালক তানভীর আহমেদ এবং শামীমের ঘনিষ্ঠ শাহ নিজাম আছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের কেউই তাদের অস্ত্র জমা দেননি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীম ফেরদৌস বলেন, ছাত্র-জনতার ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। অনেকেই নজরদারিতে আছেন। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।


























