◉ নিষিদ্ধের দাবিতে সোচ্চার ছাত্রসংগঠনগুলো
◉ ইসকন ইস্যুকে ‘টপ প্রায়োরিটি’ দিচ্ছে সরকার, হাইকোর্টকে রাষ্ট্রপক্ষ
◉ ইসকন নিষিদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট বারের জোরালো দাবি
◉ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কোনো দায় নেবে না ইসকন
◉ ইসকন নিষিদ্ধে নমনীয় রাজনৈতিক দলগুলো
◉পুলিশের বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগ চট্টগ্রামের আইনজীবীদের
চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে প্রকাশ্যে হত্যার পর আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশে নিষিদ্ধের দাবিতে চাপ বাড়ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর। সংগঠনটির কার্যক্রম নিষিদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও মহল থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। এমতাবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে জাতির উদ্দেশ্যে স্পষ্ট কোনো বার্তা আসেনি। যদিও বিএনপি, জামায়াত ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতার দাবির পক্ষে তাদের নমনীয়তার বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে হাইকোর্টকে জানানো হয়েছে ইসকন ইস্যুকে ‘টপ প্রায়োরিটি’ দেওয়া হচ্ছে। আর হাইকোর্ট এ বিষয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। ফলে ইসকন নিষিদ্ধে পর্যাপ্ত জনসমর্থন থাকলেও সময় নিতে চাচ্ছে সরকার এমনটায় মনে করা হচ্ছে। এদিকে আটক হওয়া চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কোনো দায় না নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসকন।
গত বুধবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থিত হয়ে ইসকন নিষিদ্ধ চান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনির উদ্দিন। সেই সঙ্গে এই আইনজীবী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চট্টগ্রামের ঘটনাটি তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার আবেদন করেন এবং অন্তত দুই সপ্তাহ জরুরি অবস্থা জারির আবেদন জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রিটের শুনানিতে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে কারাগারে পাঠানোকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সরকার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে হাইকোর্টকে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এতে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রয়োজন হলে ইসকন বাংলাদেশ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলেছেন আদালত। আদালত বলেন, আমাদের দেশের মানুষ সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং সব ধর্মের মানুষ বন্ধুত্বপূর্ণভাবে থাকতে ভালোবাসে। এটা কখনই ভাঙবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন হাইকোর্ট। চট্টগ্রামের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনাটি রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট তৎপর বলে জানানো হয়।
চট্টগ্রামের আইনজীবী হত্যার ঘটনার সরকারের পদক্ষেপের অগ্রগতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদ উদ্দিন আদালতকে বলেন, এই ঘটানাটিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই মধ্যে তিনটি মামলা হয়েছে। একটিতে ১৩ জন, একটিতে ১৪ জন ও অপর একটি ৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
এ সময় হাইকোর্ট বলেন, রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এটা শুনে আমরা আস্বস্ত হলাম। এটাই ওনাদের দায়িত্ব। আশা রাখি সবাই এটা শুনে আস্বস্ত হবেন। দেশের জানমালের কোনো ক্ষতি না হোক আমরা সেটাই চাই। যেহেতু সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলা হলো তাই এই মুহূর্তে আদালত আর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখছে না। আমরা মনে করি আমাদের দেশের মানুষ সৌহার্দ্যপূর্ণ। এদেশে সব ধর্মের মানুষ বন্ধুত্বপূর্ণভাবে থাকতে ভালোবাসে। সে ভালোবাসা কখনোই ভাঙবে না। আর আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গেও আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। পরে আইনজীবী মনির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ইসকনের ব্যাপারে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছে হাই কোর্ট। সংগঠনটির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কোনো সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কোর্ট বলেছেন, বাংলাদেশে আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যেসব ধর্মের অনুসারি আছেন, তারা মিলেমিশে বসবাস করবেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমতার ভিত্তিতে যে সম্পর্ক আছে তা বজায় থাকবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
এদিকে ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গতকালও যশোর, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, ঝালকাঠি, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিকে আইনজীবী আলিফ নিহতের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। একই সঙ্গে ইসকনকে নিষিদ্ধ করতে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।
এদিকে আলিফ হত্যায় পুলিশের নিস্ক্রিয়তা এবং ইন্ধন থাকার অভিযোগ তুলেছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী। এ অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগও চেয়েছেন তিনি। এদিন চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ‘ল’ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এই সমাবেশের আয়োজন করে। কারাগারে নেওয়ার জন্য প্রিজনভ্যানে থাকা অবস্থায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কীভাবে হ্যান্ডমাইকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন, তার হাতে হ্যান্ডমাইক এলো কীভাবে, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি। আলিফ হত্যার প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো আদালত বর্জন করেন চট্টগ্রামের আইনজীবীরা। ফলে এদিন আদালতে কোনও মামলার শুনানি হয়নি। এতে আদালত প্রাঙ্গণে এসে বিপাকে পড়েন বিচারপ্রার্থীরা। সমাবেশে চট্টগ্রামের সরকারী এবং বেসরকারী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর পক্ষে আদালতে আইনজীবী হিসেবে না দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
এদিকে ইসকন নিষিদ্ধের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নমনীয়তার বিষয়টিও দলগুলোর নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ইসকন ইস্যুতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশকে অস্থির করার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ইসকন ইস্যুতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশকে অস্থির করার চক্রান্ত চলছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পতিত স্বৈরাচার দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেওয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে। ন্যূনতম সংস্কার করেই নির্বাচন দেওয়া প্রয়োজন। অনৈক্য নয়, ঐক্য তৈরি করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। ফ্যাসিবাদ দূর হয়েছে কিন্তু তারা আবার ফিরে আসার চেষ্টা করবে, সেখানে যেন আমরা সে পথ তৈরি করে না দেই। আমরা সবাই এমন কাজ করছি যে, ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ অনেক এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার বলেছেন, ইসকন যতই উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড করুক না কেন আমাদেরকে উত্তম সবরের মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। ভারত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য ফাঁদ পেতেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রামে ইসকন সদস্যদের হামলায় নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের কবর জিয়ারত শেষে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, আমরা দোয়া করি বাংলাদেশের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া তথা দক্ষিণ অঞ্চল হবে ইসলামের ঘাঁটি। এই যে ইসকন নামক উগ্র জঙ্গীবাদী যে গোষ্ঠী সন্ত্রাসের আগুন জ্বালাতে চেষ্টা করছে। এদের ব্যাপারে আমিরে জামায়াতের হেদায়েত হলো আমরা উত্তম ধৈর্য ধারণ করবো, আমরা সংযত থাকব।
আইনজীবী সাইফুল ইসলামের হত্যার বিচার করাসহ ‘উগ্র সংগঠন’ ইসকনকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে সমমনা ইসলামি দলগুলো। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সমমনা ইসলামি দলগুলোর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। এর আগে গত বুধবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেখান থেকে ইসকন নিষিদ্ধের দাবি জানান সমন্বয়করা। এছাড়া গণ অধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও ইসকনের নিষিদ্ধের বিষয়ে তাদের অবস্থান জানিয়েছে।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর স্বামীবাগ আশ্রমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসকনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বহিষ্কৃত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কোনো দায় নেবে না সংগঠনটি। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছিল রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে। ফলে সংগঠনটির সঙ্গে বর্তমানে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ সময় ইসকন সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বলেছেন, বহিষ্কৃত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য একান্তই তার ব্যক্তিগত। এর দায় ইসকন নেবে না।
চারু বলেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে ভারতের মন্তব্য বা অবস্থানের সঙ্গে ইসকনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো দেশের কোনো ব্যক্তি চিন্ময়কে নিয়ে কী উদ্যোগ নিলো বা কী বলল… সে জন্য ইসকন দায়ী নয়।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম আইনজীবী হত্যায় ইসকনকে অন্যায়ভাবে জড়িয়ে মিথ্যাচার চলছে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ইসকন দায়ী নয়। শিশুর সঙ্গে খারাপ কাজসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য অনেক আগেই চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
























