১২:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পরিকল্পনা করে আগুন দেওয়া হয়েছিল বঙ্গবাজারে

◉ বেরিয়ে আসছে আলামত, পাওয়া গেছে সিসিটিভি ফুটেজ
◉ সাবেক মেয়র তাপসসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
◉ বহুতল মার্কেট নির্মাণ করতে পরিকল্পনা করে দেওয়া হয় আগুন

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বিপণি বিতান বঙ্গবাজার পুড়ে ছাই হয়ে যায় গত বছরের ৪ এপ্রিল। ভোর রাতে লাগা রহস্যজনক ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় মার্কেটটির চারটি ইউনিটসহ আশপাশের আরও তিন মার্কেট। শত কোটি টাকার দোকান, মালামাল ছাড়াও নগদ টাকা পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যান শত শত ব্যবসায়ী। সে সময় তদন্তের নামে সিগারেট, মশার কয়েল এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার গল্প প্রচার করা হয়েছিল সরকার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আলোচিত এই অগ্নিকাণ্ডে পরিকল্পিত নাশকতার আলামত বেরিয়ে আসছে। পরিকল্পনা করেই বঙ্গবাজারে আগুন দেওয়া হয়েছিল এমন প্রমাণ মিলছে।

এরই মধ্যে ঘটনার দিন ভোরে আগুন লাগার ঠিক আগ মুহূর্তের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেছে। এদিকে এ ঘটনায় ব্যবসায়ীরা মামলা করায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ওই রাতে আগুন লাগার আগে আদর্শ মার্কেটের সামনের সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ পাওয়া গেছে। ফুটেজে দেখা গেছে, আগুন লাগার কিছুক্ষণ আগে দুই যুবক মোটরসাইকেলযোগে বঙ্গ সুপার মার্কেটের আদর্শ ইউনিটের গেইটে যায়। গেইট থেকে কিছু দূরে মোটরসাইকেল রেখে টর্চলাইট নিয়ে আদর্শ ইউনিটের গেইটের দিকে যায় দুই যুবকের মধ্যে একজন। এর কিছুক্ষণ পরই দৌড়ে মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায় ওই দুই যুবক। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, মোটরসাইকেলে আসা ওই দুই যুবকই মার্কেটে আগুন দিয়ে চলে যায়।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সেই সময় আগুন লাগার পরপরই দোকানিদের অনেকেই প্রকাশ্য গণমাধ্যমে কথা বলেন। যা নিয়ে সেই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকারের নাশকতার অভিযোগ এড়িয়ে যায়। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য আরও কয়েকটি সংস্থা। আলাদাভাবে তদন্ত করলেও সেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে আগুন লাগার মাত্র ছয়দিনের মাথায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। যেখানে সিগারেট অথবা মশার কয়েল থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়েছে বলে জানানো হয়। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিন মার্কেট বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের মূল লাইনও বন্ধ করে দেওয়া হতো। কিন্তু আগুন লেগেছিল ভোর রাতে, তাই সেই সময় বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের তদন্তে যে নিরাপত্তারক্ষীর সিগারেটের আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, হোসেন পাটোয়ারী নামের সেই নিরাপত্তারক্ষী ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন আরো এক যুগ আগে। সেই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার এমন বক্তব্যই প্রকাশিত হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গবাজারের দোকানগুলো ভেঙে সেখানে অনেক আগে থেকেই বহুতল মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস আগে সাঈদ খোকন মেয়র থাকাকালেই বহুতল ভবনের নকশা তৈরি করে মার্কেট নির্মাণের দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় পুনর্বাসন করা ছাড়া নতুন মার্কেট নির্মাণে আপত্তি জানান ব্যবসায়ীরা। সিটি করপোরেশন তাদের দাবি না মানলে উচ্চ আদালতে যান দোকনিরা। আদালতে শুনানির পর মার্কেট ভাঙতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র হয়ে আবারও নতুন করে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের দোকান মালিকরাই নতুন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ পাবেন বলে আশ্বাস দিলেও মেয়র তাপসের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল ‘মার্কেটটি ব্যবহারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। পাশাপাশি ডিএসসিসির পক্ষ থেকে দোকান মালিক সমিতিকে মার্কেট খালি করতে একাধিক নোটিস দেওয়া হয়। কিন্তু ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় নেওয়া দোকান হারানোর আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা দোকান না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের সরাতে না পেরে সিটি করপোরেশনসহ স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজারের মার্কেট পুড়িয়ে ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। মার্কেট পুড়ে যাওয়ার নাটক মঞ্চস্থের পর ভবন নির্মাণে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞারও কোনো গুরুত্ব থাকেনি। কোনো ঝামেলা ছাড়াই নতুন মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু করে ডিএসসিসি। আগুন লাগার একদিন পার না হতেই ডিএসসিসির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার তাপস নতুন করে বঙ্গবাজারে বহুতল কমপ্লেক্সের কাজ শুরুর ঘোষণা দেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন মার্কেট ভবনে পুরনো ব্যবসায়ীদের ছাড়াও অন্তত ২৫০টি অতিরিক্ত দোকান তৈইরি করে তা বরাদ্দ দিয়ে মেয়র তাপসসহ সংশ্লিষ্টদের হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

বঙ্গবাজার মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক বিএম হাবিব বলেন, সেদিন আগুন লাগে ভোর ৫টার দিকে। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এক বন্ধুর কল পেয়ে দৌড়ে এসে দেখি আমার কোটি টাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। একদম অল্প সময়ের মধ্যেই এত বড় মার্কেট আগুনে ছাই হয়ে গেল। সেদিনই আমি বলেছি, এ আগুন এমনি এমনি লাগেনি। পরিকল্পিতভাবে এই আগুন লাগানো হয়েছে। যা সিসিটিভি ফুটেজেও সবাই দেখেছে। মার্কেটের দোকানদার, কর্মচারী ও সিকিউরিটি গার্ড সবাই ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। রাত ১০টায় মার্কেট বন্ধ হওয়ার বিদ্যুতের সব লাইন অফ হয়ে যায়। বিদ্যুতের কারণে আগুন লাগলেও এত ছড়ানোর কথা না। আগুন দেখে সব ব্যবসায়ীই বলেছেন, পরিকল্পনা করে এই আগুন লাগানো হয়েছিল।

এদিকে ২২ অক্টোবর বঙ্গবাজারে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার অভিযোগ এনে ৩০ জনের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন রিপন বাদী হয়ে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ এনে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এর পরদিন মামলা দায়েরে বিলম্বের কারণ উল্লেখসহ আদালতে প্রতিবেদন পাঠায় পুলিশ। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডিএসসিসির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন, ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতন, শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান, যুবলীগের শাহাবুদ্দিন, বঙ্গবাজার মার্কেট সমিতির সহ-সভাপতি নাজমুল হাসান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। তারা ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে পরস্পরের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজারে অগ্নিসংযোগ করেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

মামলার বাদী কাপড় ব্যবসায়ী কামাল হোসেন রিপন বলেন, আগুন লাগলে বঙ্গবাজার এত কম সময়ে পুড়ে যাওয়ার কথা না। দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছে, যে কারণে মুহূর্তেই আমাদের সবকিছু পুড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে ডিএসসিসির প্রশাসক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার তাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি। আগুন লাগানোর পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা সাবেক মেয়র তাপস এবং সাবেক এমপি আফজাল হোসেন পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শাহবাগ থানায় হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাইনুল ইসলাম খান পুলক। বলেন, মামলার দায়িত্ব পাওয়ার পর আমরা তদন্ত শুরু করেছি। প্রথমেই আসামিদের ধরার চেষ্টা করছি। আশা করছি তাদের ধরতে পারলে অনেক তথ্যই বেরিয়ে আসবে। তাছাড়া অন্যান্য আলামত বিবেচনায় নিয়েও আমাদের তদন্ত চলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পরিকল্পনা করে আগুন দেওয়া হয়েছিল বঙ্গবাজারে

আপডেট সময় : ০৭:৪৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৪

◉ বেরিয়ে আসছে আলামত, পাওয়া গেছে সিসিটিভি ফুটেজ
◉ সাবেক মেয়র তাপসসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
◉ বহুতল মার্কেট নির্মাণ করতে পরিকল্পনা করে দেওয়া হয় আগুন

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বিপণি বিতান বঙ্গবাজার পুড়ে ছাই হয়ে যায় গত বছরের ৪ এপ্রিল। ভোর রাতে লাগা রহস্যজনক ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় মার্কেটটির চারটি ইউনিটসহ আশপাশের আরও তিন মার্কেট। শত কোটি টাকার দোকান, মালামাল ছাড়াও নগদ টাকা পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যান শত শত ব্যবসায়ী। সে সময় তদন্তের নামে সিগারেট, মশার কয়েল এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার গল্প প্রচার করা হয়েছিল সরকার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আলোচিত এই অগ্নিকাণ্ডে পরিকল্পিত নাশকতার আলামত বেরিয়ে আসছে। পরিকল্পনা করেই বঙ্গবাজারে আগুন দেওয়া হয়েছিল এমন প্রমাণ মিলছে।

এরই মধ্যে ঘটনার দিন ভোরে আগুন লাগার ঠিক আগ মুহূর্তের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেছে। এদিকে এ ঘটনায় ব্যবসায়ীরা মামলা করায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ওই রাতে আগুন লাগার আগে আদর্শ মার্কেটের সামনের সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ পাওয়া গেছে। ফুটেজে দেখা গেছে, আগুন লাগার কিছুক্ষণ আগে দুই যুবক মোটরসাইকেলযোগে বঙ্গ সুপার মার্কেটের আদর্শ ইউনিটের গেইটে যায়। গেইট থেকে কিছু দূরে মোটরসাইকেল রেখে টর্চলাইট নিয়ে আদর্শ ইউনিটের গেইটের দিকে যায় দুই যুবকের মধ্যে একজন। এর কিছুক্ষণ পরই দৌড়ে মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায় ওই দুই যুবক। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, মোটরসাইকেলে আসা ওই দুই যুবকই মার্কেটে আগুন দিয়ে চলে যায়।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সেই সময় আগুন লাগার পরপরই দোকানিদের অনেকেই প্রকাশ্য গণমাধ্যমে কথা বলেন। যা নিয়ে সেই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকারের নাশকতার অভিযোগ এড়িয়ে যায়। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য আরও কয়েকটি সংস্থা। আলাদাভাবে তদন্ত করলেও সেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে আগুন লাগার মাত্র ছয়দিনের মাথায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। যেখানে সিগারেট অথবা মশার কয়েল থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়েছে বলে জানানো হয়। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিন মার্কেট বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের মূল লাইনও বন্ধ করে দেওয়া হতো। কিন্তু আগুন লেগেছিল ভোর রাতে, তাই সেই সময় বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের তদন্তে যে নিরাপত্তারক্ষীর সিগারেটের আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, হোসেন পাটোয়ারী নামের সেই নিরাপত্তারক্ষী ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন আরো এক যুগ আগে। সেই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার এমন বক্তব্যই প্রকাশিত হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গবাজারের দোকানগুলো ভেঙে সেখানে অনেক আগে থেকেই বহুতল মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস আগে সাঈদ খোকন মেয়র থাকাকালেই বহুতল ভবনের নকশা তৈরি করে মার্কেট নির্মাণের দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় পুনর্বাসন করা ছাড়া নতুন মার্কেট নির্মাণে আপত্তি জানান ব্যবসায়ীরা। সিটি করপোরেশন তাদের দাবি না মানলে উচ্চ আদালতে যান দোকনিরা। আদালতে শুনানির পর মার্কেট ভাঙতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র হয়ে আবারও নতুন করে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের দোকান মালিকরাই নতুন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ পাবেন বলে আশ্বাস দিলেও মেয়র তাপসের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল ‘মার্কেটটি ব্যবহারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। পাশাপাশি ডিএসসিসির পক্ষ থেকে দোকান মালিক সমিতিকে মার্কেট খালি করতে একাধিক নোটিস দেওয়া হয়। কিন্তু ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় নেওয়া দোকান হারানোর আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা দোকান না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের সরাতে না পেরে সিটি করপোরেশনসহ স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজারের মার্কেট পুড়িয়ে ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। মার্কেট পুড়ে যাওয়ার নাটক মঞ্চস্থের পর ভবন নির্মাণে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞারও কোনো গুরুত্ব থাকেনি। কোনো ঝামেলা ছাড়াই নতুন মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু করে ডিএসসিসি। আগুন লাগার একদিন পার না হতেই ডিএসসিসির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার তাপস নতুন করে বঙ্গবাজারে বহুতল কমপ্লেক্সের কাজ শুরুর ঘোষণা দেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন মার্কেট ভবনে পুরনো ব্যবসায়ীদের ছাড়াও অন্তত ২৫০টি অতিরিক্ত দোকান তৈইরি করে তা বরাদ্দ দিয়ে মেয়র তাপসসহ সংশ্লিষ্টদের হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

বঙ্গবাজার মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক বিএম হাবিব বলেন, সেদিন আগুন লাগে ভোর ৫টার দিকে। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এক বন্ধুর কল পেয়ে দৌড়ে এসে দেখি আমার কোটি টাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। একদম অল্প সময়ের মধ্যেই এত বড় মার্কেট আগুনে ছাই হয়ে গেল। সেদিনই আমি বলেছি, এ আগুন এমনি এমনি লাগেনি। পরিকল্পিতভাবে এই আগুন লাগানো হয়েছে। যা সিসিটিভি ফুটেজেও সবাই দেখেছে। মার্কেটের দোকানদার, কর্মচারী ও সিকিউরিটি গার্ড সবাই ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। রাত ১০টায় মার্কেট বন্ধ হওয়ার বিদ্যুতের সব লাইন অফ হয়ে যায়। বিদ্যুতের কারণে আগুন লাগলেও এত ছড়ানোর কথা না। আগুন দেখে সব ব্যবসায়ীই বলেছেন, পরিকল্পনা করে এই আগুন লাগানো হয়েছিল।

এদিকে ২২ অক্টোবর বঙ্গবাজারে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার অভিযোগ এনে ৩০ জনের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন রিপন বাদী হয়ে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ এনে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এর পরদিন মামলা দায়েরে বিলম্বের কারণ উল্লেখসহ আদালতে প্রতিবেদন পাঠায় পুলিশ। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডিএসসিসির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন, ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতন, শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান, যুবলীগের শাহাবুদ্দিন, বঙ্গবাজার মার্কেট সমিতির সহ-সভাপতি নাজমুল হাসান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। তারা ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে পরস্পরের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজারে অগ্নিসংযোগ করেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

মামলার বাদী কাপড় ব্যবসায়ী কামাল হোসেন রিপন বলেন, আগুন লাগলে বঙ্গবাজার এত কম সময়ে পুড়ে যাওয়ার কথা না। দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছে, যে কারণে মুহূর্তেই আমাদের সবকিছু পুড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে ডিএসসিসির প্রশাসক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার তাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি। আগুন লাগানোর পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা সাবেক মেয়র তাপস এবং সাবেক এমপি আফজাল হোসেন পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শাহবাগ থানায় হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাইনুল ইসলাম খান পুলক। বলেন, মামলার দায়িত্ব পাওয়ার পর আমরা তদন্ত শুরু করেছি। প্রথমেই আসামিদের ধরার চেষ্টা করছি। আশা করছি তাদের ধরতে পারলে অনেক তথ্যই বেরিয়ে আসবে। তাছাড়া অন্যান্য আলামত বিবেচনায় নিয়েও আমাদের তদন্ত চলছে।