০৩:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুর অঞ্চলে ১৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ

রংপুর অঞ্চলে কোন ভাবেই কমছে না তামাকের আগ্রাসন। সরকারের নানা উদ্যোগেও
তামাক নামক বিষপাতা উৎপাদন থেকে ফেরানো যাচ্ছে না কৃষকদের। সিগারেট কো¤পানিগুলোর
নানা ধরনের প্রণোদনার পাশাপাশি দাম ভালো পাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জেনেও তামাক চাষ
করছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা। গত বছর থেকে চলতি মৌসুমে তামাকের চাষ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।
রংপুর অঞ্চলে বিঘার পর বিঘা জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হচ্চে
রংপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায়। বিশ্লেষকেরা বলেন, কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, উৎপাদনের
আগে কো¤পানির তামাকের দর নির্ধারণ, বিক্রয়ের নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কো¤পানির
প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, পরামর্শ প্রদানের কারণে অন্যান্য ফসল ছেড়ে তামাক চাষে
ঝুঁকছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। রংপুর সদর উপজেলার খাপরিখাল এলাকার কৃষক রজব আলী বলেন, গত
বছর চার বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন। তার খরচ হয়েছিল ৮৬ হাজার টাকা। ওই জমিতে
উৎপাদিত ৩৩ মণ তামাক বিক্রি করেছেন ২ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা। বাড়তি লাভের আশায় এবার সাত
বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন তিনি। রজব আলী বলেন, চলতি মৌসুমে তামাকের দাম আরও
বাড়বে। কো¤পানির লোকজন এসে তামাক ক্রয় করে নিয়ে যায়। তামাকের বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা
করতে হয় না। এ বছর তামাক দিয়ে মাঠ ভরে গেছে। একই উপজেলার মমিনপুর এলাকার কৃষক রাসেল
মিয়া বলেন, ৩৯ বছর ধরে তামাক চাষ করছেন। এ বছরের মতো ব্যাপক জমিতে তামাক চাষ আগে
কখনো দেখেননি। চলতি মৌসুমে অনেক কৃষক নতুন করে তামাক চাষ করেছেন। তামাক
কো¤পানি থেকেই বীজ, সার, কীটনাশক ও সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হয়। গত বছর তামাকের বাজারদর বেশি
ছিল। তাই এ বছর কৃষকরা তামাক চাষে আরও বেশি ঝুঁকেছেন। রংপুর নগরীর হাজিরহাট এলাকার
কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, ৪ বিঘা জমি আলু চাষের জন্য প্রস্তুত করেন তিনি। কিন্তু বীজের
দাম, সার সংকটসহ এবার আলুর দাম নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা ভেবে তিনি তামাক চাষ করতে বাধ্য
হয়েছেন। রংপুরের অভিরাম এলাকার কৃষক দ¤পতি আকবর আলী বলেন, গত ১০ বছর ধরে তামাক চাষ
করেন। তামাকের বিকল্প নানা ফসল রয়েছে। তবে তামাকে কখনই লোকসান হয় না, চাহিদাও ভালো। এ
জন্য তামাক চাষ করা হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে তামাক চাষে যুক্ত থাকায় কৃষকরা স্কিন ডিজিস,
শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেসরকারিসংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট এর গবেষণা বলছে, তামাকজনিত ব্যাধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে
বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
তামাক এবং বিড়ি, সিগারেটের ধোয়ায় ৭ হাজারের বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। যার
মধ্যে ৭০টি সরাসরি ক্যানসারে আক্রান্তে প্রভাব ফেলে। গ্যাটস এর প্রতিবেদন বলছে, দেশে প্রতি
বছর এক লক্ষ ৬১ হাজার মানুষ তামাক জনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. তাপস বোস বলেন, তামাকের
বহুল ব্যবহার হৃদরোগ, ক্যানসার, বক্ষব্যাধি এবং অন্যান্য অনেক অপ্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যুর
অন্যতম প্রধান কারণ। কৃষি বিভাগের তথ্যে জানা যায়, গত ১০ বছরে রংপুর অঞ্চলে তামাক উৎপাদন
ঊর্ধ্বমুখী। চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে তামাক চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে, অথচ
আগের মৌসুমে ছিল ১৩ হাজার ৩৪৯ হেক্টর। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক
শফিকুল ইসলাম বলেন, তামাকে বেশি লাভের আশায় কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছে। তবে এই
বিষপাতা চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে উঠান বৈঠক, সচেতনতা সভা করা হচ্ছে। গবেষকদের
মতে, শস্য বিন্যাস, উৎপাদন এবং বিপণনে কৃষকদের সহায়তার পাশাপাশি তামাকের ক্ষতিকর
দিকগুলো তুলে ধরতে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

উৎসবমুখর আয়োজনে তিতুমীর কলেজে সরস্বতী পূজা উদযাপন

রংপুর অঞ্চলে ১৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ

আপডেট সময় : ০৪:৩৬:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

রংপুর অঞ্চলে কোন ভাবেই কমছে না তামাকের আগ্রাসন। সরকারের নানা উদ্যোগেও
তামাক নামক বিষপাতা উৎপাদন থেকে ফেরানো যাচ্ছে না কৃষকদের। সিগারেট কো¤পানিগুলোর
নানা ধরনের প্রণোদনার পাশাপাশি দাম ভালো পাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জেনেও তামাক চাষ
করছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা। গত বছর থেকে চলতি মৌসুমে তামাকের চাষ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।
রংপুর অঞ্চলে বিঘার পর বিঘা জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হচ্চে
রংপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায়। বিশ্লেষকেরা বলেন, কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, উৎপাদনের
আগে কো¤পানির তামাকের দর নির্ধারণ, বিক্রয়ের নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কো¤পানির
প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, পরামর্শ প্রদানের কারণে অন্যান্য ফসল ছেড়ে তামাক চাষে
ঝুঁকছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। রংপুর সদর উপজেলার খাপরিখাল এলাকার কৃষক রজব আলী বলেন, গত
বছর চার বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন। তার খরচ হয়েছিল ৮৬ হাজার টাকা। ওই জমিতে
উৎপাদিত ৩৩ মণ তামাক বিক্রি করেছেন ২ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা। বাড়তি লাভের আশায় এবার সাত
বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন তিনি। রজব আলী বলেন, চলতি মৌসুমে তামাকের দাম আরও
বাড়বে। কো¤পানির লোকজন এসে তামাক ক্রয় করে নিয়ে যায়। তামাকের বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা
করতে হয় না। এ বছর তামাক দিয়ে মাঠ ভরে গেছে। একই উপজেলার মমিনপুর এলাকার কৃষক রাসেল
মিয়া বলেন, ৩৯ বছর ধরে তামাক চাষ করছেন। এ বছরের মতো ব্যাপক জমিতে তামাক চাষ আগে
কখনো দেখেননি। চলতি মৌসুমে অনেক কৃষক নতুন করে তামাক চাষ করেছেন। তামাক
কো¤পানি থেকেই বীজ, সার, কীটনাশক ও সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হয়। গত বছর তামাকের বাজারদর বেশি
ছিল। তাই এ বছর কৃষকরা তামাক চাষে আরও বেশি ঝুঁকেছেন। রংপুর নগরীর হাজিরহাট এলাকার
কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, ৪ বিঘা জমি আলু চাষের জন্য প্রস্তুত করেন তিনি। কিন্তু বীজের
দাম, সার সংকটসহ এবার আলুর দাম নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা ভেবে তিনি তামাক চাষ করতে বাধ্য
হয়েছেন। রংপুরের অভিরাম এলাকার কৃষক দ¤পতি আকবর আলী বলেন, গত ১০ বছর ধরে তামাক চাষ
করেন। তামাকের বিকল্প নানা ফসল রয়েছে। তবে তামাকে কখনই লোকসান হয় না, চাহিদাও ভালো। এ
জন্য তামাক চাষ করা হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে তামাক চাষে যুক্ত থাকায় কৃষকরা স্কিন ডিজিস,
শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেসরকারিসংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট এর গবেষণা বলছে, তামাকজনিত ব্যাধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে
বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
তামাক এবং বিড়ি, সিগারেটের ধোয়ায় ৭ হাজারের বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। যার
মধ্যে ৭০টি সরাসরি ক্যানসারে আক্রান্তে প্রভাব ফেলে। গ্যাটস এর প্রতিবেদন বলছে, দেশে প্রতি
বছর এক লক্ষ ৬১ হাজার মানুষ তামাক জনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. তাপস বোস বলেন, তামাকের
বহুল ব্যবহার হৃদরোগ, ক্যানসার, বক্ষব্যাধি এবং অন্যান্য অনেক অপ্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যুর
অন্যতম প্রধান কারণ। কৃষি বিভাগের তথ্যে জানা যায়, গত ১০ বছরে রংপুর অঞ্চলে তামাক উৎপাদন
ঊর্ধ্বমুখী। চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে তামাক চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে, অথচ
আগের মৌসুমে ছিল ১৩ হাজার ৩৪৯ হেক্টর। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক
শফিকুল ইসলাম বলেন, তামাকে বেশি লাভের আশায় কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছে। তবে এই
বিষপাতা চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে উঠান বৈঠক, সচেতনতা সভা করা হচ্ছে। গবেষকদের
মতে, শস্য বিন্যাস, উৎপাদন এবং বিপণনে কৃষকদের সহায়তার পাশাপাশি তামাকের ক্ষতিকর
দিকগুলো তুলে ধরতে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।