পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রংপুরে কেনাকাটা জমে উঠেছে। মার্কেট ও
শপিংমলগুলোর ত্রেতাদের ভিড়ে যেন পা রাখার জায়গা নেই। ব্যবসায়ীরা কয়েকশ কোটি টাকার
বেচাকেনার আশা করছেন। নগরীর অভিজাত শপিংমল থেকে ফুটপাত সব জায়গায় ক্রেতাদের
উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। জাহাজ কোম্পানি শপিং কমপ্লেক্স, জেলা পরিষদ মার্কেট, সুপার
মার্কেট, আরএমসি মার্কেট, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, রজনীগন্ধা মার্কেটসহ
ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে বিক্রেতাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত
প্রচুর লোকের সমাগম হচ্ছে। বর্তমান ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিটি শোরুমে পোশাকের
পসরা সাজানো হয়েছে। ভিন্ন ডিজাইনের নতুন কালেকশন এসেছে, বিশেষ করে পাঞ্জাবি, লন-
সালওয়ার-কামিজ ও কুর্তিতে দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা। নামিদামি শপিংমলের শোরুমে শোভা পাচ্ছে
হাজার থেকে লক্ষ টাকা মূল্যের পোশাক। এবার ঈদে জামদানি ৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা,
মেয়েদের পাগলু, বিপাশা বসু, জান্নাত-টু, আশিকী-২, জিপসি ৩৫০ থেকে ২৮ হাজার ৫০০
টাকা, ছেলেদের কার্গো জিন্স, থাই, ডিসকার্ড-২, সিম ফিট, ফরমাল টি-শার্ট ৭৫০ থেকে ৩
হাজার ৫শ টাকা, ছোটদের লেহেঙ্গা, মাসাক্কালী, সিঙ্গেল টপ, টপসেট, গেঞ্জিসেট ১ হাজার ২০০
থেকে ৬ হাজার টাকা, পাঞ্জাবির মধ্যে বড়দের ছোটদের ধুতি কাতান ৩৫০ টাকা থেকে ৫ হাজার
এবং আকর্ষণীয় শেরওয়ানি ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। জেলা পরিষদ সুপার
মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব রশিদুজ্জামান জামান বুলবুল বলেন,
ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়। ফলে ঈদ অর্থনীতির আকারও বড় হচ্ছে। তবে মানুষের
আয়ের বেশির ভাগ খরচ হয়ে যায় দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে। সে কারণে ঈদে বিক্রি বাড়লেও তার হার
গতরারের তুলনায় কম। উচ্চ মূল্যস্ফীতিই তার অন্যতম কারণ। তবে ঈদ ঘিরে কয়েকশ কোটি টাকার ঈদের
দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কেনাকাটার ব্যস্ততা। নগরীর বিভিন্ন ব্যস্ততম মোড়ের
ফুটপাত থেকে অভিজাত শপিংমলে চলছে বেচাকেনা। নানা রঙের আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে
অভিজাত শপিংমল, মার্কেট ও দোকানগুলো। ভাসমান হকাররাও অস্থায়ী টেবিল বসিয়ে বিভিন্ন ধরনের
পোশাকের পসরা সাজিয়েছেন। অনেকে আবার ভ্যানে করে বিক্রি করছেন বিভিন্ন ধরনের পোশাক।
নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও ছুটছেন ফুটপাতের এসব দোকানগুলোতে। নগরীর গ্রান্ড
হোটেল মোড় থেকে ঢাউনহল চত্বর পর্যন্ত সড়কের দুইধারে কাপড়, স্যান্ডেল, জুতা, প্যান্ট-শার্ট,
থ্রি পিস, শাড়ি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, বাচ্চাদের কাপড়, টুপি, আতরসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের
পসরা সাজিয়ে বসেছেন হকাররা। এছাড়াও নগরীর স্টেশন রোড, মেডিকেল মোড়, হাঁড়িপট্টি
রোড, সিও বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের দোকানগুলোতে জমে উঠেছে ঈদবাজার। এসব
দোকানে চলছে জমজমাট বেচাকেনা। সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার সামনে ফুটপাতে ভ্যানে
করে কাপড় বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, অনেকে মনে করেন ফুটপাতে মানহীন কাপড় বিক্রি হয়।
এ ধারণা একেবারে ঠিক নয়। এখানে ভালো মানের কাপড়ও পাওয়া যায়। আমাদের লাইটিং বিল নেই,
দোকান ভাড়া নেই। সামান্য কিছু লাভে কাপড় বিক্রি করলেও চলে। এ কারণে আমাদের ক্রেতা শুধু
নিম্নবিত্তরাই না, অনেক মধ্যবিত্তরাও কাপড় কিনতে আসেন। নগরীর সিটি বাজারের সামনে
ফুটপাতে কাপড় বিক্রেতা আব্দুল হালিম বলেন, কয়েকদিন ধরে বেচাবিক্রি ভালো হচ্ছে। অভিজাত
শপিংমল ও মার্কেটের তুলনায় আমাদের ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় অনেক কম। এ কারণে অনেক ভালো
মানের পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করতে পারি। এতে ক্রেতারাও সন্তুষ্ট হয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
শ্রেণির মানুষ ফুটপাত ও হকারদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনতে আগ্রহী হয়। একাধিক সুত্রে
জানা যায়, এবারের ঈদে মেয়েদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানি পোশাক সারারা-গারারা। তবে
শাড়ি প্রেমীদের কাছে ভারতীয় শাড়িই পছন্দ। আরএমসি মার্কেটে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্র্যান্ড,
নন-ব্র্যান্ড ও চায়না থেকে আমদানি করা জুতা কসমেটিকস ও জুয়েলারির দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন
ক্রেতারা। ছেলে ও মেয়েদের নন ব্র্যান্ডের জামাকাপড় ও শাড়িসহ বিভিন্ন তৈরি পোশাকের দোকানেও
ভিড়। এসব দোকানে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সামর্থ্যের মধ্যে সব জিনিস
পাওয়া যায়। এজন্য ভিড়ও বেশি। সেন্ট্রাল রোড কাপড় পট্টি এলাকার জনতা ট্রেডিং, মদিনা
গার্মেন্টস, ব্রাদার্স ট্রেডিংসহ বিভিন্ন বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর সরকার
পরিবর্তনের পর বেচাকেনা কমেছে অনেকটা। তারা বলেন, দুর্নীতিবাজ ও আগের সময়ের নেতারা
যাদের বেতনের বাইরেও ইনকাম ছিল তাদের অবস্থা নড়বড়ে হওয়ায় এখন বাজারে কম আসছেন। এছাড়া
মানুষ খুব হিসাব করে খরচ করছেন। শপিংমলগুলোতে অফা আর অফার। বিক্রেতারা বলেন, এ বছর বাজারে
পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা বেশি। সিল্ক, জর্জেট ও অরগ্যাঞ্জা কাজের বিভিন্ন পোশাকের দাম
৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। পাশাপাশি পাকিস্তানি এসব পোশাকের মাস্টার কপিও পাওয়া
যাচ্ছে। যার মূল্য আড়াই থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। সেঁজুতি শাড়ি ঘরের বিক্রেতা মুসলিম
মিয়া বলেন, ভারতীয় তানা বানা কাতান শাড়ি ও পাকিস্তানি থ্রি-পিস, সারারা-গারারা ও লাক্সারি
শিপনসহ অন্যান্য পোশাকের চাহিদা বেশি। এসব পোশাকের দাম ৫ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে।
ফুটপাতে এক থেকে দেড়শো বা তার একটু বেশি দরে পাওয়া যাচ্ছে বাচ্চাদের জামা কাপড়। তরুণ-
তরুণীদের সব ধরনের পোশাক মিলছে ৫০০ থেকে হাজার টাকায়। নগরীর সালেক মার্কেটে ঈদ বাজার
করতে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, সব ধরনের কাপড়ের দাম অনেক বেশি। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও
চাহিদামতো ছেলে মেয়েদের কাপড় কিনতে পারছি না। শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, মেয়ের জন্য
জামা কিনলাম। পছন্দ তেমন হয়নি, দাম ২৭০০ টাকা। ছেলের জামা কাপড় এখনও কিনতেই পারি নাই।
যে দাম তাতে আমাদের মত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদ যেন ফিকে হয়ে গেছে। দিনের চেয়ে রাতে
ঈদের বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। বাড়ছে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি। রংপুর
মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী বলেন, ঈদ সামনে রেখে নগরীর সব মার্কেট ও বিপণি
বিতানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঈদ কেনাকাটা স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্বিঘ্ন
করতে প্রতিটি মার্কেটের সামনে পুলিশ রয়েছে। সেইসঙ্গে সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারি
রয়েছে। এছাড়াও নগরীতে যাতে কেনাকাটা শেষে নির্বিঘ্নে মানুষ বাসায় পৌঁছতে পারে
সেজন্য পুলিশি টহল ও চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
























